উঠোনের দক্ষিন কোনে বড় হাড়িতে রান্না চাপানো হয়েছে। এলাকার বিখ্যাত বাবুর্চি মজনু মিয়া রান্নার তদারকি করছেন। ডেকোরেটরের লোকজন বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত। ছোট বাচ্চাগুলো রঙিন কাগজের ফুল গুলো আঠা দিয়ে লাগানো হচ্ছে। বৈঠকখানা পেরিয়ে মূল দরজার উপরে কাগজ কেটে লেখা হয়েছে,
‘জরীর বিয়ে।’
আমার নাম জেরিন জাহান জরী। বয়স বিশ। তবে আমার মা কারো কাছে বলার সময় দুই বছর কম করে বলেন। মেয়েদের নাকি সঠিক বয়স বলতে নেই। আমি এইবার পলাশবাড়ী কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেছি। কলেজের গন্ডি এক বছর আগেই পাড় হবার কথা থাকলেও হয় নি। ঠিক পরীক্ষার আগে টাইফয়েড বাঁধিয়ে হাসপাতাল ঘুরে আসতে হলো।
ঘরের পরিবেশ ভীষণ থমথমে। চাচাজানে’র সামনে এক থালা পেপে রাখা, কিন্তু তিনি ছুঁয়েও দেখছেন না। আমাদের বাড়িতে সকালে সবাই চা খায় শুধু চাচাজান বাদে। তার পাশে ভাবলেশহীন মুখে বসে আছেন বাবা। খানিক দূরে বেতের চেয়ারে বসে আছেন আমার দুই ফুপা। বিয়ে উপলক্ষ্যে সবাই এসেছেন। রান্নাঘরে একটু আগে হাসাহাসি, গল্প গুজবের শব্দ ছিলো। এখন কেমন সব ঠান্ডা। আমি ঘড়িতে সময় দেখলাম। সাতটা বেজে বিশ মিনিট। বারান্দায় পাতা বিছানাগুলো এখনো তোলা হয় নি। সবার চা খাওয়া হয়ে গেছে। বিয়েবাড়ি বলে সবাই সকাল সকাল ই উঠে পড়েছে। শুধু আমাকেই কেউ ডাকে নি।
“ও জরী উঠছস? দুই পিস পিঠা খাবি? গরম গরম খা ভাল্লাগবে।”
“আপা কিছু কী হইছে? কেমন যেন লাগতেছে! ”
পরী আপা একটু থতমত খেয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন,
“কি হইবে? তোর ঘুম কেমন হইছে? দেখি, তোর মেহেদীর রঙ কেমন হইছে?”
পরী আপা আমার হাত উল্টে পাল্টে দেখে পিঠা আনতে ছুটে গেলেন। আপা আমার নিজের ই বোন। আমরা তিন বোন। পরী আপা, আমি আর অরু। অরু ক্লাস নাইনে পড়ে। পড়াশোনায় মোটামুটি টাইপ হলেও পড়ায় আগ্রহ নেই। গম্ভীর মুখ করে বলে,
“এতো কষ্ট করে, উপপাদ্য সম্পাদ্য গুলো পড়ে কি লাভ গো মেজপা। এগুলো তো আর সংসারের কাজে লাগবে না। ”
অরুর এইসব বোকা বোকা কথায় চাচিমা আর নাজু ফুপু সায় দেন। মা ভীষণ হতাশ হয়।
***
পরী আপা পিঠা আনতে গিয়ে কোথায় হারালেন কে জানে! বেশ ভালো শীত পড়েছে। গায়ে চাদর চাপিয়ে পুকুর পাড়ের দিকে গেলাম। বর্ষায় এই পুকুরে জল থই থই করলেও এখন পানি নেই বললেই চলে।
চিরচেনা জগত ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে আজ। পলাশবাড়ীতে আমার অনেক সুন্দর সুখকর স্মৃতি আছে। এরপর বছরান্তে হয়তো পলাশবাড়ীতে আসা হবে পরী আপার মতো।
“মেজপা চাচাজান ডাকছেন। শিগগিরই আয়।”
আমাদের ঘরের প্রধান হলেন চাচাজান। আমার বাবার বড় ভাই। চাচাজানের দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। বড় আপার বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে৷ বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলেন। সেই দুলাভাই এর সঙ্গেই নিরু আপার বিয়ে হলো। কী বিশ্রী ব্যাপার! নিরু আপা কত কান্নাকাটি করলো। এক রাতে আমাকে উঠিয়ে বলল,
“এই জরী শোন, আমি গলায় ফাঁস দিবো। ওই দাড়িওয়ালা মুশকো ব্যটাকে আমি জীবনেও বিয়ে করব না। ”
নিরু আপা ফাঁস নিলো না। কাঁদতে কাঁদতে শ্বশুর বাড়ি চলে গেল। নাইওর যখন এলো তখন বেশ হাসিখুশি। সবাই কে ডেকে গল্প করছে। কে কি গয়না দিলো সেসবের গল্প।
**
চাচাজান কে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। তার আশেপাশে এখন কেউ নেই। আমাকে দেখে বলল,
“এতো শীতে বাইরে গেছ ক্যান? বাইরে যাওয়া ঠিক হয়নাই। ”
আমি চুপ করে থাকি।
“একটা ঘটনা ঘটছে। পাত্রপক্ষের একটা সমস্যা হয়ে গেছে। ”
আমি চাচাজানের দিকে তাকালাম। তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সে বললেন,
“তোমার শ্বশুর জানিয়েছেন যে তাদের একটু সমস্যা হইছে। কিছু একটা ঝামেলায় আছে। তাদের আসতে দেরি হইতে পারে। আজকে না আসাও হইতে পারে। তবে ভয়ের কিছু নাই, বিয়া এইখানেই হবে ইনশাআল্লাহ। ”
আমি জানালা দিয়ে উঠোনের দিকে তাকালাম। মজনু মিয়া বড় হাড়িতে গরুর মাংস কষাতে ব্যস্ত। ঝাঝ, গন্ধে খিদে পেয়ে গেল। গরম এক প্লেট ভাত, আর ঝোল ঝোল গরুর মাংস সঙ্গে একটা কাঁচামরিচ!
চাচাজান আমার মাথার উপর হাত রাখলেন। আমি চমকে উঠলাম। আমার কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। না কোনো দু:খবোধ আর না কোনো ভয়। আমি হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে আছি। মেহেদীর রঙটা দারুণ হয়েছে।
***
আমার মায়ের নাম হাসিনা বেগম। বাপের বাড়িতে তার আদুরে ডাকনাম হাসু। মায়ের ভাইয়েরা তাকে হাসু আপা বলে ডাকেন। মামাবাড়ির অবস্থা মোটামুটি ধরনের। তবে ভাইদের সঙ্গে মায়ের বনিবনা তেমন হয় না। আমার মা তার ভাইদের আঙুলের এক কড় পরিমান ছাড় দেন না। তার ভাষ্যমতে বাপের বাড়িতে বাপ, মা না থাকলে সব পর। এই পৃথিবীতে যত দু:খী মানুষজন আছে তাদের মধ্যে একজন আমার মা। প্রথম কারন হলো তার তিনটি মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। আর দ্বিতীয় কারণ হলো আমাদের বাবা।
আমার বাবার নাম আজিজ শিকদার। দাদার আমলে চালের আড়ত ছিলো। চাচাজান সেটার দেখাশুনা করা। বাবা এককালে ক্যাশবাক্সে ছিলেন। এখন সেখানে দখল দিয়েছে অন্য লোক। চাচিমা’র ছোট ভাই মনা মামা। বাবার তেমন কাজ নেই। হাটবারে বাজার করা আর টুকটাক ফরমায়েশ খাটা ছাড়া। মায়ের সাথে এই নিয়ে অশান্তির শেষ নেই। বাবা গো বেচারা মানুষ। সংসারের সাত পাঁচে সে মাথা ঘামায় না। ডাল ভাত,লেবু আর একটা তরকারি মিশিয়ে মহা আনন্দে এক থালা ভাত শেষ করেন। মাছের লেজের কাছের টুকরো টা কেন তার জন্য রাখা হলো এই নিয়ে কখনো অভিযোগ করেন না। বরং সেই মাছের টুকরোটা ছোট মেয়ের জন্য রেখে দেন। বাবা আমাদের তিন বোনের মধ্যে পরী আপাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আর মা অরুকে।
***
বাড়ির থমথমে পরিবেশ ঘন্টাখানেকের বেশী থাকলো না। তারপর সবাই আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কে কী সাজবে, বাচ্চাগুলোর হুটোপুটি, পিঠে বানানোর তোড়জোড়। নিরু আপা আমার বিয়েতে আসে নি। আপার বাচ্চা হবে। এই অবস্থায় নদী পাড় হওয়া অমঙ্গল বলে আপার শাশুড়ী আসতে দেন নি৷
মা আর পরী আপা ভীষণ টেনশন করছেন। তারা ধরেই নিয়েছেন যে পাত্রপক্ষ আসবে না। চাচাজান ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে ভুলিয়ে রাখছেন। শেষমেস একজন কে ধরে এনে বিয়ে দেবে।
এই ভাবনা হলে হতেও পারে সেটা আমিও বুঝি। চাচাজানের কাছে মান সম্মানের কাছে আর কোনো কিছুই বড় নয়। তাছাড়া সংসারে বাবার জোরও খানিকটা কম। এই নিয়ে মা আর পরী আপার চিন্তার শেষ নেই।
***
পাত্র পক্ষ এলেন সন্ধ্যেবেলা। একুশ জন আসার কথা ছিলো সেখানে তেত্রিশ জন এসেছে। চাচিমা আর ফুপু ফিসফিস করে কিছুক্ষন গালমন্দ করলেন। আমার দুই ফুপু চাচিমাকে খুব তোয়াজ করে চলেন। চাচিমা সংসারের কর্ত্রী বলে কথা। আমার বিয়েতে চাচিমা তেমন খুশি নয়। শুনেছি চাচাজান কে বলেছেন,
‘নিজের মেয়েরে কোথায় বিয়া দিলেন! আর পরের মেয়েরে ঢাকায় বিয়া দিতাছেন!”
চাচাজান হুংকার দিয়ে বলেছেন,
“নিজের, পরের আবার কিসের সব শিকদার বাড়ির মেয়ে।”
***
টুকটুকে লাল রঙের বেনারশী শাড়ি আনা হয়েছে আমার জন্য। সেই সঙ্গে কিছু বনেদি গয়না। মা আর পরী আপা ভীষণ খুশি। বড়ফুপু উল্টেপাল্টে গয়না দেখছেন। চাচিমা সবকিছু ভালো করে দেখতে লাগলেন। যা দিয়েছে মন্দ দেয় নি। তবুও গুজগুজ ফিসফিস চলতে লাগলো। কানের দুলটা পুরোনো আমলের। চকচক করে না। হাতের চুড়ি দুটো ভীষণ হালকা স্বর্ন কম।
পরী আপা আমাকে সাজালেন। নিজেই বারবার বলছে,
“কী সুন্দর লাগতেছে রে জরী! কী সুন্দর! ”
আমার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। ভয়,শঙ্কা, লজ্জা সব মিলিয়ে মিশ্র অনুভূতি।
অবশেষে বিয়ে পর্ব সমাপ্ত হলো। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। কাল ঢাকার উদ্দেশ্যে আমাকে নিয়ে রওনা হবে। বিয়ে শেষ হবার পর আমার কেমন খালি খালি লাগতে শুরু করলো। না! এই ঘর, ঘরের মানুষের জন্য আমার খারাপ লাগছে না। কিন্তু কেমন একটা হাহাকার করা অনুভূতি।
***
পরী আপা আমাকে বলেছিল,
“রাজপুত্তুরের মতো বর খুঁজে এনেছেন চাচাজান। তোর কপালে রানি হওয়া ছিলো যে!”
স্বামীর সঙ্গে আমার দেখা হলো বাসরঘরে। আমার চাচাতো, ফুপাতো ছোট ভাই, বোনগুলো মিলে কতো যত্নে ঘর সাজিয়েছিল! কিন্তু ওনার তা পছন্দ হয় নি। বললেন,
“এর মধ্যে ঘুমাবো কিভাবে? ”
আমি খাট থেকে নেমে বললাম,
“পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
“দ্রুত করো।”
শুতে গিয়ে বললেন,
“আমি কম্বল তোমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারব না কিন্তু। ”
“আচ্ছা।”
আর কোনো কথা হলো না। মিনিট দশেকের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো। এই সুযোগে আমিও সাহস করে রাজপুত্তুর কে দেখে ফেললাম!

চলবে….

(দীর্ঘদিন রাইটিং ব্লকে থাকার পর খানিকটা জোর করে মূলস্রোতে ফেরার চেষ্টা। পাঠকদের সাড়া চাইছি।)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।