রান্নাঘরের দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের লিস্ট বানানোর দায়িত্বটাও আমি পেয়ে গেলাম। বাজার করেন শ্বশুর বাবা। উনি আমার সাথে কথা কম বলেন তবে আমার প্রতি তার স্নেহ, আন্তরিকতা টুকু আমি টের পাই। উনি আমাকে জরী কিংবা বউমা বলে ডাকেন না। মিষ্টি করে মা ডাকেন।
এই বাড়িতে সকালের নাস্তায় এখন আর প্রতিদিন ভাত হয় না। একদিন পাতলা খিচুড়ি, একদিন পরোটা, একদিন ভাত, ডাল, আলুভর্তা আর অন্যান্য দিনগুলোতে রুটি করা হয়। খাবারের এই নিয়মে সবাই ই খুশি। জামিল ভাই একদিন রুটি খেতে খেতে বললেন,
“থ্যাংক ইউ জরী। একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে মুখ পঁচে গেলেও কিছু বলতে পারি না। কামাই রোজগার নেই তো।”
আম্মা খানিকটা অসন্তুষ্ট হলেন বোধহয়। একদিন বললেন,
“এইগুলারে তো তুমি চেন না, একেকটা রাক্ষস বানাইতেছ।”
আমি শব্দ করে হেসে ফেললাম। আম্মা বিরক্ত গলায় বললেন,
“হাইসো না। আমি হাসার মতো কিছু বলিনাই। ”
পরী আপা একদিন আসলেন দুলাভাই কে নিয়ে। ফল, মিষ্টির দোকান টা উঠিয়ে আনতে বাকী রেখেছিলেন। পরী আপার আদর যত্নের কমতি রাখলো না। এই যে ছোট ছোট যে ব্যাপার গুলো এগুলোর জন্যই এই বাড়ির মানুষজনকে আমার এতো ভালো লাগছে।
আমার মনে আছে একবার বড় আপার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম। আমি, নিরু আপা আর অরু। বড় আপা পোলাও মাংসের আয়োজন করেছিলেন। খাবার সময় যখন মাংস তুলে দিচ্ছিলেন তখন আপার শাশুড়ী হায় হায় করে উঠলেন। বললেন,
“আরে, করো কি? ভালো মাংসের পিস গুলান তোমার স্বামী, ভাসুরের জন্য রাখো। ”
লজ্জায় অপমানে আমি আর কখনো ওই বাড়ি যাই নি। আসার সময় নিরু আপা বলছিল, খবিশ বুড়ি আমার পাল্লায় পড়লে বুঝতো। বড় আপা ভালো মানুষ বলে সহ্য করছে।
***
আমি পড়াশোনা করব এই ব্যাপারটায় বাড়ির কেউ তেমন আপত্তি করলো না। তবে আম্মার কপাল কুঁচকানো দেখে বুঝলাম যে উনি বোধহয় খুশি নন। বাবা বললেন,
“পড়তে চায় পড়ুক না। এখন কী আর সেই আগের যুগ আছে! এখন মেয়েরাও বিয়ের পর পড়তেছে। ”
নাবিদ আমাকে কোচিংএ ভর্তি করাতে চাইলো। আমি রাজি হলাম না। এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। কোচিং এর শিট গুলো কালেক্ট করে পড়তে শুরু করলাম। একা একাই পড়ছিলাম। নাবিদ অবশ্য বলেছিল একজন টিচার দেখবে কি না। আমি তাও রাজি হলাম না।
আমার পড়াশোনার খবর পেয়ে বাড়ি থেকে চাচাজান আর মা ফোন করলেন। বোঝালেন, পড়াশোনার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসার। সংসারে মন দেয়া উচিত। একসঙ্গে সব পাওয়া যায় না। পড়াশোনার চক্করে আমার সংসার টা ভেসে যেতে পারে।
আমি এসব কথা এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিলাম। পরী আপা ভীষণ খুশি হলেন। সেই সঙ্গে শুরু হলো আরেক উৎপাত। আপা ভোরবেলা মিসড কল দিয়ে জ্বালিয়ে মারেন। বাধ্য হয়ে আমাকেও উঠে পড়তে বসতে হয়।
***
নাবিদের সাথে আমার দূরত্ব কমে গেল আস্তে আস্তে। আমাকে অবশ্য পরী আপা আর মা যখনই জিজ্ঞেস করেন সব ঠিক আছে কি না, আমি উত্তর দেই হ্যাঁ সব ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক কিছুই ঠিক ছিলো না। নাবিদ দূরে দূরে থাকতো বলে আমিও দূরে থাকতাম। সূক্ষ্ম অহম বোধ আমার মধ্যেও ছিলো। ডানাকাটা পরী না হলেও সবাই আমাকে সুন্দর ই বলতো। আমার বড় মামার মেয়ে ফাইজা আপুর বিয়ের সময় ভাইয়ার এক কাজিন বলেছিল, এই জরী দিব্যা ভারতী কে চেন? তুমি দেখতে অনেক টা ওনার মতো।
তবুও নাবিদের দূরে থাকার কারণ হিসেবে ধরে নিলাম যে ওর হয়তো আগে কেউ ছিলো। কিন্তু আমার জটিলা ননদের কাছ থেকে সেরকম কোনো খবর পেলাম না। বলল, আরে না ভাবী। ছোট্ট ভাই অমনই ম্যুডি টাইপ। বড় ভাইয়ের মতো না।
এক ঝিমধরা শীতের সকালে টের পেলাম নাবিদ আমাকে ওর কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে৷ ঘুম ভাঙার পর নড়েচড়ে সরে আসতে গেলেই নাবিদ বলল,
“তোমার কম্বলে ঠান্ডা মানছিল না। ঠকঠক করে কাঁপছিলে। ”
আমি অস্ফুটস্বরে বললাম,
“হু। ”
“এখনো কাঁপছ কিন্তু! ”
নাবিদ আরও একটু কাছে এলো। ওর খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা গাল আমার গালের সঙ্গে ঘষলো৷ অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল সমস্ত শরীরে। নাবিদ আরও একটু ঘনিষ্ঠ হলো, প্রথমে নাকের পাশে চুমু খেল, তারপর গালে ও কপালে। আবেশে আমি চোখ বন্ধ করলাম। নাবিদ ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এতো দূরে দূরে থাকো কেন? আমি কী অন্য শিবিরের মানুষ! আগ বাড়িয়ে একটু কাছে আসা যায় না!”
আমি বললাম,
“তুমি বা কবে কাছে ডাকলে! তাছাড়া তুমি তো কম্বলও শেয়ার করতে পারো না। ”
নাবিদ হাসলো। বলল,
“ওহ এই ব্যাপার! শীত তো প্রায় চলেই যাচ্ছে। এখন কাছে আসবে তো?”
“ডাকলে আসব। ”
“আর না ডাকলে আসবে না?”
নাবিদ আমার জবাবের অপেক্ষা করলো না। আমিও ভালোবাসা টুকু উপভোগ করতে লাগলাম।
***
বিয়ে নিয়ে আমার রাজ্যের ভয় ছিলো। অচেনা, অজানা মানুষগুলো কেমন হবে! বিছানায় হাত বাড়ালেই যাকে ছুঁয়ে দেয়া যায় সে না জানি কেমন হবে! সব মিলিয়ে চিন্তার শেষ ছিলো না। আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর নাম পুতুল। পুতুলের বিয়ে হয়ে গেল কলেজে পড়ার সময়ে। এইচ এসসি পরীক্ষা দিতে পারলো না কারণ বাচ্চা পেটে এসেছিল। পুতুলের সঙ্গে শেষবার যখন দেখা হলো ভীষণ আক্ষেপ করে বলল,
“বিয়ে মানে হলো জীবন টা শেষ হয়ে যাওয়া জরী। নিজের জন্য তখন আর কিছু করা যায় না। ”
আমার কাছে বিয়ে মানে জীবন শেষ হওয়া মনে হয় নি। বিয়ের আগে কতশত পরিকল্পনা করেছিলাম, দূরে কোথাও পালিয়ে যাব। পড়াশোনা করে, চাকরি বাকরি করে ফিরে আসব।
এসব পরিকল্পনা আসলে ভাবনার জগৎ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমি আসলে কিছুই পারতাম না।
নাবিদের সঙ্গে দূরত্ব কমে যাবার পর দারুণ একটা বন্ধুত্বও জমে উঠেছে। আমরা দুজন দুজনের খেয়াল রাখি। আমার প্রতি আম্মার অভিযোগ নেই বলে বাড়ির সকলের কাছে লক্ষিমন্ত বউ। নাবিদও বলে,
“তুমি আসলেই লক্ষি জরী। ”
আমি লাজুক হাসি। নাবিদ আমাকে প্রশ্ন করে,
“তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?”
“হু। তোমাকে বাসলাম যে। ”
নাবিদ হাসে। বলে,
“এখন আর বাসো না?”
“কিজানি!”
“তুমি ভালো হেয়ালি করে কথা বলতে পারো। দেখে বোঝা যায় না?”
“দেখে কী বোঝা যায়?”
“ভীতুর ডিম, লজ্জাবতী। ”
“আমি শুধু তোমার সঙ্গেই এমন হেয়ালি করি। আর কারোর সঙ্গে করিনি। ”
নাবিদ খানিকটা শাসিয়ে বলে,
“আর কারোর সঙ্গে করার কথা ভাববেও না। ”
“যদি ভাবি?”
“খুন হয়ে যাবে তাহলে। ”
আমি শব্দ করে হাসি৷ আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ও হাসে।

চলবে…

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।