রাওনাফ সোজা ওদের বাড়ির সামনে এনে গাড়ি থামায়।গাড়ি থামতেই মেহেনূর তাড়াতাড়ি করে নেমে দৌঁড়ে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।অর্ক মেহেনূরের দিকে এক পলক তাকিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়।রাওনাফ সিট বেল্ট খুলতে খুলতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে রোশনি এখনো ল্যাপটপেই মুখ গুজে বসে আছে।নিজের কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে আছে গাড়িটা যে এখন আর চলছে না এটাও টের পায় নি।রাওনাফ ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– হ্যালো মিস!শ্বশুর বাড়ি দেখবেন না?
……
রাওনাফ গাড়ির চাবিটা হাতে নিতে নিতে বললো,
– গাড়ি থেকে নামেন এবার।চলে এসেছি আমরা।
……..
রোশনির কোনো রেসপন্স না পেয়ে কপাল কুঁচকে আসে রাওনাফের।পিছনে তাকিয়ে দেখে রোশনির কোনো হেলদোল নেই।ও আগের মতোই বসে কাজ করছে।এতক্ষণে রাওনাফ খেয়াল করে দেখলো রোশনির কানে হেডফোন গুঁজে বসে আছে।নিজের বোকামি দেখে নিজে নিজেই হাসলো।তারপর গাড়ি থেকে নেমে এসে এবার রোশনির পাশে বসে।একটা মানুষ যে ওর পাশে এসে বসেছে এতেও রোশনির ভাবাবেগের কোনো পরিবর্তনই হয় নি।রাওনাফ উঁকি দিয়ে দেখলো রোশনি এত মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কি করে?পর মুহূর্তেই ফট করে রোশনির গালে শব্দ করে একটা চুমো দিয়ে দেয়।চোখ বন্ধ করে নেয় রোশনি।বেশ খানিকটা শব্দ করেই ল্যাপটপটা বন্ধ করলো ও।ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে রাওনাফের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো,
– এটা কি হলো?
রাওনাফ ওর দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসছিল।রোশনির কথার প্রত্যুত্তরে বললো,
– ওয়েলকাম কিস!চলো নামো এবার, তাড়াতাড়ি।
রোশনিকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওর হাত ধরে গাড়ি থেকে নেমে আসে রাওনাফ।ওরা নেমে দাঁড়াতেই সামনে তাকিয়ে দেখে মেহেনূর দৌঁড়ে ওদের দিকে আসছে।মেহেনূর ওদের কাছে এসে বললো,
– ভাইয়া,ভাবী চলো।
রাওনাফ আর রোশনিকে ধান দুব্বো দিয়ে বরণ করে ঘরে তুললেন রেনুফা বেগম।রোশনিকে নিয়ে উপরে চলে গেলো মেহেনূর।অর্ক রাওনাফের মুখোমুখি হতে চায় না বলে ওদের বাসার ভিতরে যায় নি।ও ওদের বাসায় চলে যায়।হঠাৎ করেই রাওনাফের মনে পড়লো অর্ককে গাড়ির চাবিটা ফেরত দেওয়া হয় নি।রাওনাফ চাবিটা দিতে অর্কদের বাসার সামনে অব্দি যায় কিন্তু বাসার ভেতরে গেলো না।দারোয়ানকে দিয়ে চাবিটা পাঠিয়েছে ও।
– অর্ক বাবা গাড়ির চাবিটা।
দারোয়ানের কন্ঠ শুনে সিঁড়ির মধ্যেই থমকে দাঁড়ায় অর্ক।ভ্রু কুচকে তাকায় দারোয়ান দিকে।দারোয়ান স্মিত হেসে ধীর কন্ঠে বললো,
– ওই বাসার রাওনাফ দিয়ে পাঠালো।
– ওহ!
অস্পষ্ট স্বরে বললো অর্ক।পর পরেই দারোয়ানের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললো,
– তুমি গিয়েছিলে ওদের বাসায়?
দারোয়ান হেসে বললো,
– আরে না না।ওই তো এসেছিল গেইট অব্দি।
– আচ্ছা তুমি যাও।
একসময় তো বাসায় খেয়ে এই বাসায় এসে দম না ছাড়লে পেটের ভাত হজম হতো না।আর এখন দারোয়ানকে দিয়ে চাবি পাঠাচ্ছে।কথাগুলো ভেবেই ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় অর্ক।
_______________
সকালে অর্ক খেয়ে দেয়ে চলে যাওয়ার পর আয়েশা বেগমও একটু বেড়িয়েছিলেন।রাওনাফকেও নিজের আরেকটা ছেলে মনে করেন তিনি।আর সেই ছেলের বউয়ের মুখ দেখবেন খালি হাতে?এটা একটু কেমন দেখায় না?তাই আয়েশা বেগম একটু বেড়িয়েছিলেন আশীর্বাদ সরূপ রোশনির জন্য কিছু কিনার জন্য।একটু আগেই বাড়িতে ফিরেছেন।বাসায় এসে দেখতে পায় অর্ক ড্রয়িং রুমে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে।উনি একটু উঁকি দিয়ে দেখলেন অর্ক ভিডিও কলে আছে।তাই অর্কের কল শেষ হওয়া অব্দি উনি একটু অপেক্ষা করছেন।কারণ অর্ককে সাথে নিয়েই উনি মেহেনূরদের বাসায় যাবেন।অর্ক কথা বলা শেষ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে বললো,
– কি বলবে?
– হুম,চল মেহেনূরদের বাসায় যাবো।
অর্ক মায়ের কথায় কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে বললো,
– তো তুমি যাও না।আমাকে কেন যেতে হবে?
আয়েশা বেগম চোখ রাঙিয়ে ভারী কন্ঠে বললো,
– আমি বলেছি তাই।
অর্ক মায়ের দিকে শান্ত দৃষ্টি স্থির রেখে ধীর কন্ঠে বললো,
– না মা আমি এখন যেতে পারবো না।আমার অনেক কাজ জমে গেছে এই কয়েকদিনে।আজকে শুক্রবার তাই সবাই বাসায় আছে।এই সুযোগে আমি কাজ গুলো করে নিতে পারবো।আর ওদের সাথে তো আমার দেখা হয়েছেই।এখন তুমিই যাও না।
আয়েশা বেগম অর্কের দিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে উঠে যেতে নিলেই অর্ক উনার হাত ধরে থামিয়ে দেয়।মুখের উপর না করে দেওয়ায় যদি উনি কষ্ট পেয়ে থাকেন।না না বাবা মাকে কষ্ট দিতে চায় না ও।ওর কাজ না হয় পরেই করবে।অর্ক উঠে দাঁড়ায়।আয়েশা বেগম অর্কের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছেন।মায়ের প্রশ্নসূচক দৃষ্টি দেখে অর্ক ফোঁস করে একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিষ্পাপ কণ্ঠে বললো,
– চলো যাচ্ছি!
ছেলের কথার বিনিময়ে এক টুকরো হাসি ফেরত দিলেন আয়েশা বেগম।কলিং বেল বাজতেই মেহেনূর এসে দরজা খুলে দেয়।আয়েশা বেগমকে দেখে মিষ্টি একটা হাসি দেয়।আয়েশা বেগম ভেতরে ঢুকতেই মেহেনূর দরজা বন্ধ করতে গেলেই আয়েশা বেগম বললেন,
– বাহিরে অর্ক আছে।
– সরি আন্টি, আমি খেয়াল করি নি।
মেহেনূর একটু ইতস্ততভাবে বললো।আয়েশা বেগম মেহেনূরের গালে হাত রেখে স্মিত হেসে বললো,
– ইটস ওকে,তাঁরা কোথায়?
– আন্টি আপনি বসুন।আমি ভাবীকে নিয়ে আসছি।
মেহেনূর চলে গেলো রোশনিকে আনার জন্য।রেনুফা বেগম রান্নাঘর থেকে আয়েশা বেগমের কাছে এসে গল্পগুজব করতে থাকেন।রোশনি খুব সুন্দর একটা বেবি পিংক কালারের জামদানী শাড়ি পড়েছে।দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।রাওনাফ কিছু একটা নেওয়ার জন্য মেহেনূরের ঘরে এসেছিল।দরজার কাছে আসতেই রোশনিকে দেখে তো ওর মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।কিছুক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে নিজেকে সামলে গলা খাঁকারি দিয়ে এগোয় রুমের দিকে।রাওনাফের গলার আওয়াজ শুনতে মেহেনূর আর রোশনি দুজনেই চমকে উঠে।রোশনি শাড়ির আঁচল ঠিক করে মুখ ভেংচি দিয়ে বললো,
– কারো রুমে ঢুকতে হলে পারমিশন নিতে হয় জানো না?
রাওনাফ মেহেনূরকে চোখে ইশারায় বললো রুম থেকে চলে যেতে।মেহেনূর ঠোঁট টিপে হেসে বললো,
– একটু তাড়াতাড়ি আসিস।নিচে আয়েশা আন্টি অপেক্ষা করছে।
মেহেনূর চলে যাওয়ার আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যায়।রাওনাফ স্মিত হাসে।ওর বোনটা বরাবরই একটু বেশিই ম্যাচিউর!মেহেনূর চলে যেতেই রাওনাফ এগোলো রোশনির দিকে।পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রোশনি ঘাড়ে মুখ গুজে দেয়।কানের লতিতে আলতো করে চুমো দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
– আমাকে পাগল করার পারমিশন কে দিলো শুনি?
রোশনি এবার ঘুরে রাওনাফের কাধের উপর হাত রাখে।রাওনাফ রোশনির কোমড় ধরে টেনে আরেকটু কাছে নিয়ে আসে।রোশনি একটু চমকে উঠে।তবে পরমুহূর্তেই রাওনাফের নাকে ঠোঁট ছুইঁয়ে দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,
– তুমি!
রাওনাফ একটা তৃপ্তির শব্দহীন হাসি দিয়ে সবে রোশনির দুগাল ধরেছে ওমনি নিচ থেকে মেহেনূরের ডাক শুনতে পেয়ে রোশনিকে এক ঝটকায় ছেড়ে দেয়।রোশনি রাওনাফের কান্ড দেখে ফিক করে হেসে দেয়।রাওনাফও কিছুটা লজ্জা পেয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে।তারপর দুজনেই নিচে চলে আসে।রাওনাফ এসে আয়েশা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো।আয়েশা বেগমও রাওনাফকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিলেন।রোশনি এসে উনাকে সালাম করলো।আয়েশা বেগম রোশনির হাত ধরে উনার পাশে নিয়ে বসিয়ে এক জোড়া ডায়মন্ডের বালা পড়িয়ে দিলেন।এটা দেখে রেনুফা বেগম বললো,
– ভাবী এটার কি খুব দরকার ছিল?
– আমার ছেলের বউয়ের মুখ কি আমি খালি হাতে দেখবো নাকি!
আয়েশা বেগম জোর গলায় কথাটা বলেন।উনার কথার প্রত্যুত্তরে রেনুফা বেগম এক গাল হাসি দেওয়া ছাড়া আর কোনো কথাই বলতে পারলেন না।রোশনি আয়েশা বেগমের কথায় বেশ বিস্মিত চোখে রেনুফা বেগমের দিকে তাকালে উনি বলেন,
– উনিই হচ্ছে অর্কের মা।আর ওকে তো চিনোই।সকালেই পরিচয় হয়েছে তোমার সাথে।
অর্ককে দেখিয়ে বললেন রেনুফা বেগম।রোশনি এতক্ষণ অর্ককে খেয়াল করে নি।কারণ অর্ক ওর ঠিক পিছনে বসে আছে।অর্ক টিভিতে গোপাল ভাঁড় দেখছে আর ক্ষনে ক্ষনেই খিলখিল করে হেসে উঠছে।রোশনি এক পলক অর্ককে দেখে বললো,
– হ্যাঁ,কিন্তু আমাদের রিসিভ করতে অর্ক না গিয়ে ড্রাইভারকে কেন পাঠালো?
রোশনির কথা শুনে টাশকি খেয়ে যায় আয়েশা আর রেনুফা বেগম।দুইজনেই নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আবার রোশনির দিকে তাকায়।রোশনি ওর উত্তর না পেয়ে রেনুফা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।হবু বউমার মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে আয়েশা বেগমের সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন রেনুফা বেগম।এইদিকে আয়েশা বেগম রেগে আগুন।ছেলেটা এত অবাধ্য হয়ে গেছে?ও না গিয়ে ড্রাইভারকে পাঠিয়ে ওদেরকে আনার জন্য?আয়েশা বেগম আঁড়চোখে অর্কের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন,
– ওদের রিসিভ করতে তুই যাস নি?
অর্ক মায়ের কথায় পিছনে না ফিরেই নরম গলায় বললো,
– গিয়েছিলাম মা!
আয়েশা বেগম একটু অবাক হন।অর্ক বলছে গিয়েছিল আর রোশনি বলছে যায় নি।আয়েশা বেগম সন্দিহান চোখে অর্কের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার কড়া গলায় বললেন,
– তাহলে কি বউমা মিথ্যা বলছে নাকি?
অর্ক উঠে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে করুন গলায় বললো,
– তোমার ছেলেকে যদি দেখতে ড্রাইভার মনে হয় তাহলে এখানে আমার কি করার আছে বলো তো মা!
অর্কের কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় রোশনি।মুখ কিঞ্চিৎ হা করে আছে।আর চোখ তো কোটর থেকে প্রায় বেড়িয়েই আসে আসে।ওই অর্ক!
আয়েশা বেগম ছেলের কথা বুঝতে না পেড়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। রোশনির সবটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো।নিজের বোকামির জন্য কিছুটা লজ্জাও পেয়েছে।রোশনি ধীর কন্ঠে বললো,
– সরি অর্ক।
– ইটস ওকে।
– কিন্তু তুমি বলো নি কেন যে তুমিই অর্ক?
– বলার আর সুযোগ পেলাম কই?তার আগেই তো আমাকে ড্রাইভার বানিয়ে দিলেন।
রোশনি লজ্জা মাখা মুখে আরো একবার সরি বলে অর্ককে।কিন্তু রোশনি আর অর্কের কথার মানে আয়েশা বেগম বা রেনুফা বেগম কেউই বুঝতে পারছেন না।আয়েশা বেগম বললেন,
– তোমরা কি বলছো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
– আন্টি আমি বলছি!
মেহেনূর এসে রোশনির পাশে বসে।আয়েশা বেগম কৌতূহলী চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেনূর সকালের ঘটনা খুলে বলে।মেহেনূরের কথা শুনে সবাই হাসতে হাসতে শেষ।তারপর রেনুফা বেগম আর মেহেনূর গিয়ে সবার জন্য দুপুরে খাবার নিয়ে আসে।আয়েশা বেগম খেতে না চাইলেও অর্ক ঠিকই সবার আগে গিয়ে টেবিলে বসে পড়ে।ছেলের এমন হেংলামো মোটেও উনার পছন্দ না উনার।তারপর সবাই একসাথে লাঞ্চ করে অর্ক আর আয়েশা বেগম মেহেনূরদের বাড়ি থেকে চলে আসেন।

চলবে…

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।