স্বর্ণালী তালুকদার
স্বর্ণালী তালুকদার

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ মার্চ ২০২৫

অগোচরে তুমি | গাঙিনীর পাড়ে প্রথম প্রেম

সমাপ্ত

অগোচরে তুমি | সিজন ১ | পর্ব - ২৪

২৬ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

এয়ারপোর্টে দু’জোড়া কাপলকে বিদায় দিয়ে ফিরতি পথে মেহেনূর,তনিমা,অর্ক আর অয়ন।রাওনাফরা এবং দিহাদরা একসাথেই কক্সবাজার যাচ্ছে,হানিমুনে।এয়ারপোর্টে আসার পর আরেক দফায় সারপ্রাইজড হয় দিহাদ কলি সাথে রাওনাফ রোশনিও।ওদের একসাথে কক্সবাজার যাওয়ার বিষয়টা একে অপরের কেউই জানতো না।রাওনাফ আর রোশনিকে মেহেনূরই কক্সবাজার পাঠাচ্ছে।ওদের এই ট্রিপে রাওনাফ দিহাদ দুজনেই খুব খুশিই হয়।দুই বন্ধু একসাথে হানিমুনে যাচ্ছে ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগছে ওদের কাছে।ওদেরকে বিদায় দিয়ে মেহেনূর আর তনিমা মেহেনূরদের গাড়ি করে আসছে।অর্ক আর অয়ন ওদের গাড়ি করে চলে যায়।

মেহেনূর ড্রাইভ করছে আর তনিমা ওর পাশে বসে রাজ্যের আলাপ করে।আগে ওদের ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে কি হতো,এখনো কি হয় এই বিষয় গুলোই ওর আলাপের মূল টপিক।মেহেনূর চুপচাপ তনিমার কথা শুনছে।মাঝে মধ্যে শব্দ করে হেসে উঠছে।তনিমাকে ওর খুব ভালো লাগে।মেয়েটা একটু ছটফটে স্বভাবের হলেও মনের দিক থেকে একদম খাঁটি।মন খোলা, কোনো কিছু চেপে রাখতে পারে না।সব বলে ফেলে।

মেহেনূরের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তনিমা।মেয়েটা কি সুন্দর!একদম সাদামাটা।ছোটবেলা থেকে বিদেশী আবহাওয়ায় বেড়ে উঠলেও ওর মধ্যে বিদেশীদের আদব কায়দার ছিটেফোঁটা নেই।নেই কোনো অহংকার।সবার সাথে অনায়াসেই মিশে যায়,কার্পণ্য করে না।মেয়েটার চতুর দিকে দৃষ্টি।সবদিক কত সুন্দর করে সামলে ফেলে মুহূর্তেই।মেহেনূর বয়সে ওর থেকে কত ছোট।তাও তনিমার মনে হয়, মেহেনূরের কাছ থেকে ওর কত কিছু শেখার আছে।মুখে কি সুন্দর মিষ্টি একটা হাসি বরাবর লেগেই থাকে।

হঠাৎ করেই তনিমা কথা বলা বন্ধ করে দিতেই মেহেনূর এক পলক তাকায় তনিমার দিকে।পলকহীনভাবে তনিমা ওর দিকে তাকিয়ে আছে।মেহেনূর স্মিত হেসে বললো,

– কি হয়েছে তনিমা আপু?

ঘোর কাটে তনিমার।মৃদু হেসে চোখ সড়িয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে বুঝালো” কিছু হয় নি।”সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে মেহেনূর ফের বললো,

– তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

চকিত দৃষ্টিতে তাকায় তনিমা।অবাক স্বরে বললো,

– তুমি কি করে বুঝলে?

– তোমাকে দেখে মনে হলো।সকাল থেকেই দেখছি তুমি অন্যমনস্ক হয়ে আছো।বলো কি বলতে চাও।

– এখানে না।চলো না কোথাও গিয়ে বসে কথা বলি।

– কোথায় যাবো?

মুহূর্তেই তনিমার চোখ চকচক করে উঠলো।খুশিতে আপ্লুত হয়ে বলল,

– গাঙিনীপাড়!

_______________________

শনশন বাতাসে ঢেউয়ের তালে তালে দুলতে থাকা জলরাশিতে মনে হচ্ছে অজস্র মুক্তা ছড়ানো।নদীর পানিতে সূর্যের কিরণ পড়তেই ঢেউয়ের ভাঁজে বার বার চিলিক দিয়ে উঠছে।বাতাসের তোড়ে পানিতে তীব্র কলকল আওয়াজ তুলছে।মাঝে মধ্যেই দমকা হাওয়ায় কিছু পানি আঁচড়ে পড়ছে পাড়ে।অদূরেই হয়তো স্টিমারঘাট।ক্ষনে ক্ষনেই লঞ্চ স্টিমারের হুইসেলের শব্দ শুনা যাচ্ছে।নদীর শীতল হওয়ায় শরীরে গাঢ়তর শিহরণ জাগাচ্ছে।গাঙিনীর তীর ঘেঁষে পেতে রাখা কাঠের সারি সারি বেঞ্চগুলোয় বসে থাকা মানুষগুলো নদীর এই অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করছে খুব আগ্রহের সহিত।নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতাও চলছে বিরামহীনভাবে।তবে কলরর হচ্ছে না।মৃদুস্বরে কথা বলছে তাঁরা।হাওয়ায় মুড়িয়ে আসা গুনগুন শব্দ শোনা যাচ্ছে শুধু।মেহেনূর আর তনিমাও তাঁদেরই দলে।তবে ওদের মধ্যে এখনো কোনো কথপোকথন শুরু হয় নি।এতক্ষণ মেহেনূরের দৃষ্টি স্থির ছিল গাঙিনীর জলে। তনিমাও চুপচাপ বসে আছে।গাঙিনীপাড় জায়গাটাই এমন।নিঃসঙ্গতায়ও এখানে বসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে অনেকটা সময়।কোনো সঙ্গের প্রয়োজনই হবে না।এইবার মেহেনূর তনিমার দিকে তাকিয়েছে।তনিমা উদাস হয়ে বসে আছে।হয়তো ও কোনো কিছু নিয়ে ভীষণভাবে চিন্তিত।মেহেনূর ক্ষুদ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলে ধীর কন্ঠে বললো,

– কি হয়েছে তোমার?

– আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছি।

মেহেনূর ভ্রুকুটি করে তাকায় তনিমার দিকে।তনিমার দৃষ্টি স্থির সামনে থাকা গাঙিনীর উন্মুক্ত বুকে।মেয়ের হাবভাব দেখে বুঝা যাচ্ছে এই চিন্তায় সে বিরহিত, নিঃস্ব।মেহেনূর মুখ টিপে হেসে তনিমাকে কয়েক সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করে শীতল কণ্ঠে বললো,

– মানুষ প্রেমে পড়ে।কারণে অকারণে যখন তখন প্রেমে পড়ে।হয়তো প্রকৃতির নয়তো প্রাণীর।তুমি কোনটির প্রেমে পড়েছো?

মেহেনূরের কথাটায় যেমন গভীরতা আছে ঠিক শেষের কথাটায় হালকা রসিকতাও রয়েছে।মেহেনূরের প্রশ্নে তনিমার মস্তিষ্ক সচল হয়।চট করে বেঞ্চের উপর পা তুলে আসন পেতে বসলো।আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললো,

– প্রাণীর!আই মিন মানুষের।

এক মুহূর্তেই তনিমার আচারণের এত দ্রুত পরিবর্তন দেখে মেহেনূর হা হয়ে আছে।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলো,

– তা কার প্রেমে পড়লে শুনি?

– কাজীর!

তনিমার মুখটা এমন করে কথাটা বললো যে,চোর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে।মেহেনূর তনিমার কথা শুনে একটু অবাক হয়।বললো,

– ভালোবাসা বলেকয়ে আসে না।যেকোনো সময় যে কাউকে ভালো লেগে যেতেই পারে।কিন্তু ভালো লাগা আর ভালোবাসার মধ্যে একটু ফারাক আছে।কাজী অফিসে আমরা কতক্ষণ ছিলাম?এই ঘন্টা দেড়েক হবে।ওইটুকু সময়ের মধ্যে ভালোবাসা হয়ে যায় না।যেটা হয় সেটা মোহ,ভালো লাগা।

– প্রথম দেখাতেই আমি তাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছি।কাল সারাটা রাত আমি ঘুমাতে পারি নি।কাজীর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই আমার বুকের ভেতরটায় কেমন যেনো ধুকপুক ধুকপুক করে।সারারাত ভেবেছি আমি,এটা হয়তো আমার ক্ষনিকের ভালো লাগা।কিন্তু না,তাঁর কথা ভাবতেই নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে।মনে হয় সে যেন আমার খুব কাছেই আছে।এটা মোহ বা ভালো লাগা নয় মেহেনূর।এটাই ভালোবাসা।আমি ওইটুকু সময়ের মধ্যেই ওই কাজীকে ভালোবেসে ফেলেছি।

তনিমা থমথমে মুখ করে একদমে কথাগুলো বলে শেষ করে।মেহেনূর হতভম্ব হয়ে গেছে তনিমার কথা শুনে।কেসটা জটিল মনে হচ্ছে মেহেনূরের কাছে।তনিমা ফের বললো,

– আমার প্রথম প্রেম যদি একজন কাজী হয় তাহলে আমার কি করার থাকতে পারে বলো তো?

মেহেনূর স্মিত হেসে বললো,

– কোনো ব্যাপার না।উনি কাজী বলে তাকে কেউ পছন্দ করবে না এটা কোনো কথা।এটা তো উনার পেশা।

– উনি পেশায় কাজী না।

– তুমি কি করে জানলে?

মেহেনূর প্রশ্নটা করে সন্দিহান চোখে তাকায় তনিমার দিকে।তনিমা মেকি হেসে বললো,

– ফেইসবুক,ফেইসবুক থেকে জেনেছি।উনার নাম রবিউল ইসলাম শান্ত।পেশায় একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।কালকে কাজী অফিসে কেন উনি ছিলেন সেটা তো উনার মুখ থেকেই শুনতে হবে।

মেহেনূর পূর্বের ভঙ্গিমায় বললো,

– উনার নাম তুমি কি করে জানলে?

– আসলে কালকে আমি উনাকে ইচ্ছা করেই বিরক্ত করছিলাম।ইচ্ছা করেই আবোলতাবোল প্রশ্ন করছিলাম।তখন উনার নামটাও জিজ্ঞাস করেছিলাম।মেহেনূর তুমি কিছু একটা করো না প্লীজ।আমি কিন্তু কলির মতো না যে,বুক ফাটবে তবু মুখ খুলবে না।আমি মনের কথা চেপে রাখতে পারি না।মনে যা থাকে মুখেও তাই বলি।আমার অশান্ত মনকে শান্ত করতে ওই শান্তকেই চাই হু।

মেহেনূর অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েই আছে।এই মেয়ে তো শুধু প্রেমেই পড়ে নি।এমন পড়াই পড়েছে যে আর উঠতেই পারছে না।মেহেনূর ধীর কন্ঠে বলল,

– এইভাবে বললেই তো আর হয় না।উনারও তো পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে বা কোনো রিলেশন…..

– উনি সিঙ্গেল।ফেইসবুকে দেখেছি।

মেহেনূরের কথার মাঝেই তনিমা ফোকলা হেসে বললো কথাটা।মেহেনূর তনিমার এহেন কান্ডে ফিক করে হেসে দেয়।তনিমা একটু লজ্জা পায়।মেহেনূর মুখে হাসি রেখেই বললো,

– আচ্ছা দেখি কি করা যায়।এখন বাসায় চলো।

___________________

মেহেনূরের বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে।ঠিক সাতটায় বাসায় ঢুকে ও।গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে বাসায় ঢুকতেই চমকে উঠলো মেহেনূর।কয়েক জোড়া চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে।থতমত খেয়ে যায় মেহেনূর।সবাইকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু বিব্রতবোধও করলো।পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিলো মেহেনূর।সালামের জবাবে অপরিচিত পুরুষালী কন্ঠস্বর শুনে মেহেনূর মুখ তোলে তাকায়।আগন্তুকের বয়স ষাটোর্ধ হবে।স্বাস্থ্য স্বাভাবিক,গায়ের উজ্জ্বল শ্যামলা।উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি হবে। দু’গাল ভর্তি ধবধবে সাদা চাপ দাঁড়িতে।পরনে সাদা ফতোয়া আর লুঙ্গি।হাতে মোটা চেইনের সোনালী ঘড়ি।জাবর খাটছেন,মুখে হয়তো পান আছে।মেহেনূর উনাকে চিনতে না পেরে কপাল কুঁচকে মায়ের দিকে তাকায়।রেনুফা বেগম এক গাল হেসে বললেন,

– উনি রাশেদ সাহেব,অর্কের মামা।

মায়ের কথা শুনে মেহেনূর আবার রাশেদ সাহেবের দিকে তাকায়।ভাবে,নির্ঘাত মায়ের কাছ থেকেই এই পান খাওয়ার গুণ আয়ত্ত্ব করেছেন।পর পরেই মেহেনূর স্মিত হেসে বললো,

– কেমন আছেন মামা?

– আমি ভালো আছি মা।তুমি কেমন আছো?

– আলহামদুলিল্লাহ্ আমিও ভালো আছি মামা।আপনারা কথা বলুন আমি আসছি।

– ঠিক আছে।

মেহেনূর ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে।সাড়ে সাতটায় ওর ক্লাস আছে।ওয়াই-ফাই কানেক্ট করতেই টুংটাং শব্দে নোটিফিকেশন আসতে শুরু করে।ওই গুলো চেক করতে করতেই ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।ক্লাস প্রায় শেষের দিকে এমন সময় মেহেনূর ঘরে আসেন মেহরাব সাহেব।মেয়েকে ক্লাস করতে দেখে উনি একটু বসলেন।মেহেনূর ক্লাস শেষ করে ল্যাপটপ সাইডে রেখে বললো,

– কিছু বলবে বাবা?

মেহরাব সাহেব উঠে এসে মেয়ের কাছে বসেন।ধীর কন্ঠে বললেন,

– তখন নিচে তোর বিয়ের কথা হচ্ছিলো।কিন্তু আমি তোর মতামত না নিয়ে কোনো কিছু করবো না।তবে আমি এবার তোর বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই।তুই কি বিয়ের জন্য রাজি?

মেহেনূর বাবার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।বিয়ে?বিয়ে করা তো দূর বিয়ের কথা কখনো চিন্তাও করে নি।পড়াশোনা শেষ করে নিজের একটা আলাদা সত্তা তৈরী করতে চাওয়া প্রত্যেকটা মানুষেরই স্বপ্ন থাকে।ওরো ছিল,এখনো আছে।নিজের একটা প্লাটফর্ম তৈরী করেছেও।তবে সেটা শখের বশে।ছেলে মেয়ে বড় হলে তাদেরকে বিয়ে দিতে হবে।এটা বাবা মায়ের বহুমুখী দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি।পড়াশোনা তো বিয়ের পরেও করা যাবে।ওর বাবা ওর উপরে কোনোদিনও জোর খাটায় নি,আজও খাটাবে না।মেহেনূর যদি একবার বলে ও বিয়ে করবে না, তাহলে ওর কথাই শেষ কথা।সেটাও জানে মেহেনূর।তবে ও এটা করতে চায় না।একদিন না একদিন বিয়ে তো করতেই হবে।হয়তো দুইদিন আগে নয়তো পরে।

মেহেনূরকে চুপ থাকতে দেখে মেহেনূর সাহেব ফের বললেন,

– তুই কি কাউকে পছন্দ করিস?পছন্দ থাকলে বলতে পারিস।

অভিভাবক হিসেবে এই প্রশ্নগুলো করাটা খুবই স্বাভাবিক।মেহেনূর স্মিত হেসে বললো,

– আমার কোনো পছন্দ নেই বাবা।তোমরা যা বলবে তাই হবে।

চলবে…

বি.দ্র. ঃগাঙিনী(নদীর নাম)আমার কল্পনার নদী।বাস্তবে এই নামে কোনো নদী আছে কিনা আমার জানা নেই।কারো জানা থাকতে বলিয়েন।

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!