পাথরের বুকে ফুল | পর্ব – ২২

ওয়াসেনাত প্রচণ্ড বিস্মিত চোখে তার বাবার কথা শুনছে আর ভাবছে তার বাবার মাঝে হঠাৎ রণচণ্ডী রানী কিভাবে ভর করেছে?তার ধারনা মতে রণচণ্ডী মেয়ে তাই এটা মেয়েদের মধ্যে বেশি ভর করে কিন্তু তার বাবার মধ্যে যে কিভাবে এল সে বুঝে উঠতে পারছে না।ওয়াসেনাতের বাবা এবার রিতিমত ঘর কাপাঁনো চিৎকার করে বলে উঠে……
__এই মুহুর্তে তুই আমার বাসা থেকে বাহির হ।হারামজাদা। তোর সাহস দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না? ইমান তুই কিভাবে ভাবলি আমি তোর মত লোকের ছেলের কাছে নিজের একমাএ কলিজার টুকরা মেয়েকে বিয়ে দিবো?ভুলে গেছিস সব??পুরো দিনের কথা কি তোর বিন্দু মাএ মনে নেই?? তুই ভুলে গেলেও যেতে পারছ কিন্তু আমি না।বের হ আমার ঘর থেকে আর তোর এই পোলারেও নিয়ে যা।

ইহানের বাবাও চুপ যওয়ার মানুষ না তিনিও উঁচু গলায় বলে উঠে…..
__মুখ সামনিয়ে কথা বল?তা না হলে আমিও ভুলে যাবো তুই আমার কি ছিলি? আর এখন তোকে আমি কি বানাতে চাচ্ছি?
__আরে যা যা তোর এত মনে রাখতে হবে না।আর বানাবি? কি বানাবি?তুই এখনও ভাবছিস আমি তোর সাথে সম্পর্ক করবো?হাসালি!!আমার বড্ড হাসি পাচ্ছে। কিন্তু এখন হাসতে ইচ্ছে করছে না তোর মত লোকের সামনে হাসি আসে না তোরা তো হাসি কড়ে নিতে জানছ। যেমন আশিকের নিয়ে ছিলি।মনে পরে আশিকের কথা?নাকি বুহু বছর হয়েছে বলে ভুলে গেলি?না কি ওর সাথে সাথে ওর স্মৃতিও গিলে খেয়ে পেলেছিস?

কথাটা শুনার সাথে সাথে ইহানের বাবা মা এক মুহুর্তও আর দাঁড়ালো না তারা গটগট করে বাহিরে চলে গেল ইহানও তাদের সাথে যেতে যেতে একবার মায়া ভরা দৃষ্টিতে ওয়াসেনাতের দিকে তাকালো তবে এ দৃষ্টিতে হার ছিল না ছিলো পাবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।

ওয়াসেনাতের বাবা তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে….
__তোমার কি ছেলেটা পছন্দ??

ওয়াসেনাত প্রবল বেগে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে যার অর্থ তার মোটেও পছন্দ না।ওয়াসেনাতের মনে হাজারো প্রশ্ন জেগেছে।তার ইচ্ছে করছে বাবাকে জিগ্যেস করতে তিনি কেন এমন করলেন? আর এই আশিক নামের লোকটাই বা কে? আর বহু বছর মানে কি বুঝতে চাচ্ছে? এমন হাজারো প্রশ্ন তার নিজের বাবাকে করতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু তার বাবার লাল চোখ দেখে সে নিজেই ভয়ে কাঁচুমাচু করছে।তার মনে হচ্ছে তার বাবাকে কোন প্রেত আত্তা ধরেছে তা না হলে তিনি তো এমন করার মানুষ না।আচ্ছা তিনিও কি অরিএানের মত ইহানকে পছন্দ করে না বলে এমন করেছে?না তাতো মনে হয় না।যাই হোক এই পাগলকে তো আর বিয়ে করতে হয় নাই আল্লাহ বাচাইছে।কথাগুলো ভেবেই সস্তির নিঃশ্বাস নেয় ওয়াসেনাত।

ইহানরা বাহিরে যেতেই ওয়াসেনাতের বাবা দরজাটা বন্ধ করতে গেলেই বাহিরে অরিএান আর রিমনকে কঠর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলে উঠে………
__স্যার আপনারা এখানে কেন??

অরিএান আজকে সবার সামনে ইহানের বারোটা বাজাতেই এসে ছিল কিন্তু ওয়াসেনাতের বাবার কথা শুনে থমকে গেছে।রিমনও অরিএানের পিছনে পিছনে এসে ছিল তাই সেও দাড়িয়ে পরে।ওয়াসেনাতের মত তাদের মনেও হাজারো প্রশ্ন?কিন্তু উওর নেই??ওয়াসেনাতের বাবার কথায় অরিএান হকচোটিয়ে গেছে।সে কাচুমাচু করে এদিক ওদিক তাকাছে।কিন্তু ওয়াসেনাতকে দেখে যেতে পারলে ভাল হত তাই বলে উঠে……………………….
__ওই দিনও আপনি বাসায় ডুকতে বলেন নি আজও কি বলবেন না?
__না না স্যার এমন হতে যাবে কেন?আসেন ভিতরে।

অরিএান নিজের রক্তাক্ত হাত পিছনে নিয়ে ভিতরে ডুকে পরে তার সাথে রিমনও।ওয়াসেনাত এদের দেখে একটা ঝাটকা খায়।যাকে বলে জোরকা ঝাটকা হয় জোড়োছে লাগা🤣
ওয়াসেনাত চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।ওয়াসেনাতের বাবা বলে উঠে………….
__ওয়াসেনাতের মা ওনারা আমার কোম্পানির বস। ওই দিন ওয়াসেনাতকে নিয়ে এসেছিল মনে আছে??
__হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি বসতে দেও আমি নাস্তা নিয়ে আসি।

অরিএান আজই ওয়াসেনাতের মাকে খেয়াল করেছে তার মাথায় এটা ডুকছে না ওনি এভাবে হাতরাতে হাতরাতে কেন হাটছে?ওয়াসেনাত তো সারা দিন ওর মাকে নিয়ে অনেক কিছু বলেছে কিন্তু এমন কিছু তো বলে নি?? অরিএানের মন বলছে ওনি দেখতে পায় না কিন্তু আবার ভাবছে এমন কিছু হবে না। হয় তো এমনেই।ওয়াসেনাত অরিএানের দিকে তাকাতে তাকাতেই নিচের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠে।কারন ফ্লোরে প্রচুর রক্ত।কিন্তু রক্ত কোথা থেকে আসবে এটাই ভেবে পাচ্ছে না।

অরিএান ওয়াসেনাতকে দেখছে। তার চাহনি দেখে মনে হবে আজ শতবৎসর পরে সে ওয়াসেনাতকে দেখছে।কিন্তু সে মাঝে মাঝেই সুযোগ পেলে ওয়াসেনাতকে বারান্দায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে যেত।

ওয়াসেনাত বুঝতে পেরেছে অরিএানের হাত থেকেই রক্ত পরছে তাই সামনে গিয়ে অরিএানের পিছনের হাতটা টেনে সামনে নিয়ে আসে।অরিএান প্রচণ্ড অবাক হয় কিন্তু কিছু বলতে পারে না।ওয়াসেনাতের বাবা বলে উঠে……
__আল্লাহ আপনার হাতে এত রক্ত কিভাবে??হাত কেটেঁছে??রূপালী ফাস্টএইড বক্স নিয়ে আয়??

ওয়াসেনাত অরিএানের দিকে দাতঁ কটমট করে তাকিয়ে আছে।পাড়ছেনা এখনই চিবিয়ে খাবে। তার মনে হচ্ছে লোকটাকে একমাস পাগলাগারদে রেখলে ভাল হত।কেমন পাগলের মত কার্যকর্ম?? অশহ্য কর ব্যাপার।

ওয়াসেনাতের বাবা কিছু বুঝতে পারছে না?কেনো অরিএান তাদের বাড়িতে এভাবে আসে? আর আজই বা কেন এসেছে?ওয়াসেনাত অতি যত্নে অরিএানের হাত ব্যান্ডেজ করে দেয়।ব্যাপারটাও তার বাবার চোখ এড়ালো না।আর অরিএানের চাহনি এটা তার পূর্ব পরিচিত। এই চাহনি কোনো এক সময় তার চোখেও ছিল যখন ওয়াসেনাতের মাকে তিনি লুকিয়ে দেখতে যেতেন।ওও এটাতো বলাই হয় নি ওয়াসেনাতের বাবা আর তার মায়ের লাভ ম্যারেজ ছিল।তারা মামাতো বোন আর ফুফাতো ভাই ছিল।ওয়াসেনাতের বাবার এখন মনে হচ্ছে তিনি অরিএানের মাঝে নিজেকে দেখছে।কিন্তু এটা কি করে হতে পারে?অরিএান তো সাধারন ছেলেদের মত না।আর কোন মেয়েই তার কাছে দীর্ঘস্থায়ী না।যেকোন মেয়েকে নিয়েই সে একরাতের বেশী ভাবে না।তবে কেনো আজ এমন মনে হচ্ছে?? এই কেনোর উওর তার কাছে নেই।
__আপনি বললেন না তো কেনো এসেছেন?

অরিএান একবার রিমনের দিকে তো একবার ওয়াসেনাতের বাবার দিকে তাকাচ্ছে। সে যে কারনে এসেছে তা তো আপনিই ফিনিষ্ড করে ফেলেছেন এখন আর সে কি করবে বা বলবে নিজেই ভেবে পাচ্ছে না অরিএান।তার কেমন যেন ঘাম ছুটা টাইপের অবস্থা হচ্ছে।এতটা টেনশন তো পরীক্ষার হল বা মিটিং রুমেও করেনি সে।তার কেমন যেন ভয় করছে।অরিএান খান ভয় পায় ব্যাপারটা ভাবতেই অরিএানের কেমন যেন লাগছে।রিমন চট করে বলে উঠে……..
__আসলে অরিএান কালকে একটা বড় পার্টি দিবে ওখানে সবাইকে ইনভাইট করতেই এখানে আসা আসলে আপনিও আমাদের কোম্পানিতে চাকরি করেন তাই আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে ইনভাই করতে এসেছি।আশাকরি আসবেন ??
__অফিসের ব্যাপারে পরিবার কেন?
__সবারই পরিবারকে ইনভাইটেশন দেওয়া হবে।আসা করি আপনি বুঝতে পারছেন??
__জি স্যার। দেখি আসতে পারি কি না।
__দেখি মানে কি ভাই আমরা সবাই আসবো আপনারা চিন্তা করবেন না।আমার মেয়ে লামিয়াকেও নিয়ে আসবো।কিরে বল ভাই?যাই না সবাই এক সাথে? (ওয়াসেনাতের ফুফু চেঁচিয়ে বলে উঠে)
__হুম যাব।(ওয়াসেনাতের বাবা গম্ভীর মুখে বলে উঠে।তার যাওয়ার আগ্রহ শূন্যের পর্যায়ে তবুও হ্যাঁ বলতে হয়েছে।তার বোনের প্যান প্যানানির কারনে)
__তবে আমরা এবার যাই। উঠ অরিএান? (অরিএানের পিঠে হাত দিয়ে বারি দিতে দিতে।কিন্তু অরিএান অন্যদিকে তাকিয়ে অন্য নেশায় মগ্ন। যাকে বলে ওয়াসেনাতের নেশা।এটা এত তাড়াতাড়ি কাটার নয় তবুও রিমনের ঝাঁকানিতে অরিএান উঠে দাড়িয়ে ওয়াসেনাতের উদ্যেশে বলে উঠে)……..
__থ্যাংকিউ ইয়ং লেডি।আশা করি আপনিও আসবেন?
__ওয়েলকাম (চাপা সরে বলে উঠে)

অরিএান বাহিরে গিয়ে রিমনকে রাগী ভাবে বলে উঠে……
__ওই শালা পার্টি কথাই পেলি? আমি তো কোন পার্টির অর্গানাইজেশন করি নি তবে কেন বললি?তুইকি আমাকে ফাশানের প্লানিং করে রেখেছিস? ড্রাফার কোথাকার??
__ওই এখন আমি ড্রাফার হয়ে গেলাম?আর আমি যে এতক্ষণ তোকে হোবু হিটলার শ্বশুর থেকে বাঁচালাম?শুধু শ্বশুর কেন পুরা সিনিয়ার সিটিজেন থেকে বাঁচিয়েছি। তোর তো আমার কপালে চুমু খাওয়া উচিত।হুম।আর তুই কিনা? তুই যানস ওই ডাইনির মত মহিলা কি যেন হবে ওও লামিয়ার মা কেমন কেমন করে তাকিয়ে ছিল মনে হয় লবন মরিচ ছাড়াই গিলে খেয়ে ফেলবে।ভাগিস মেয়ের নাম বলে ছিল তা না হলে কি বলে যে সম্মোদন করতাম কে যানে?আর ঠিক টাইমে বুদ্ধি না খুললে তো আজ তুই শেষ।তোকে এত কিছু থেকে বাঁচালাম আবার ওয়াসেনাতকে কালকে দেখার সুযোগও করে দিলাম আর তুই কিনা আমাকে ড্রাফার বললি!তোর বিচার আল্লাহ করবে।
__এই সব তো বুঝলাম কিন্তু একটা কথা বুঝলাম না?
__আবার কি??
__তুই যে আমার চুমু খেতে এত আগ্রহি আগে বলবি না(বলেই রিমনের পেটে গুতা মারে। রিমন তো রেগে মেগে ফায়ার)
__আর ফায়ার হতে হবে না সরি এবার চল আর গার্ডসদের বল সবাইকে ইনভাইটেশন এবং সব অর্গানাইজ করতে।সময় কম।(বলেই গাড়ি স্টাট দেয়)

ওয়াসেনাত বুঝতে পারছে না আজ সে কি জামা পরবে? আজ সন্ধ্যায় পার্টি আর এখন প্রায় বিকাল আর সে জামাই খুঁজে পাচ্ছেনা। শুধু আম্মু আম্মু করেই চলেছে।ওয়াসেনাতের এই এক সমস্যা কিছু না পেলে তার আম্মুকে প্রয়োজন। তার আম্মুুুু এসে ঠিক করে দিবে তবেই হবে। তার আম্মুকে আসতে দেখে সে তার সব জামার বর্ণনা শুরু করে। বর্ণনা শুনে তিনি ওয়াসেনাতকে একটা নীল রং এর গাউন পরতে বলে। রিমি তখন থেকে তাকে কল দিয়ে যাচ্ছে তাই বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করে বলে উঠে……..
__ওই ছাগলের দুই নাম্বার বাচ্চা এত মে মে করছ কা?বল কি হইছে?
__ওই আমি ছাগল? তোরে তো পরে দেখমু আগে বল কি রং এর জামা পড়বি?
__কেন তুই যেনে কি করবি?
__দুলাভাইরে কোমু(বলেই জিহ্বায় কামড় দেয়)
__কি(চিৎকার করে)
__আরে তুই কি একা যাবি না কি?আমিও তো যাবো। তাই বলছিলা আমাদের রং যাতে মিলে না যায় তাই তোরটা বল??
__নীল
__আচ্ছা তাড়াতাড়ি রেডিহ। আন্টিকেও করা সবাই একসাথে যাবো তোরা আর আমরা।
__ ok

ওয়াসেনাত যানে অরিএানই রিমিকে এটা জিগ্যেস করতে বলেছে।ম্যাচিং করে পরার জন্যে।ওয়াসেনাত কথাটা ভেবেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়।ইশশ আজ কি অরিএানও তার সাথে মিলিয়ে একই রং এর জামা পড়বে??কেমন লাগবে তাকে??বরাবরের মতই কি সে ঘায়েল করা লুকে থাকবে নাকি এবার ঘায়েলের উপড়ও কিছু করে ফেলবে?কথাগুলো মনে মনে আওলাতে থাকে আবার নিজে নিজেই বলে উঠে…..
__ছি.. ওয়াসেনাত তোর চিন্তা ধারনা দিন দিন লো লেভেলে নেমে যাচ্ছে। একটা ছেলের সম্পর্কে এগুলো কি ভাবছিস?লজ্জা করে না??কি খারাপ মেয়েরে তুই?? ছি…শেম অন ইউ…….

কথাগুলো বলে নিজে নিজে খিলখিল করে হেসে উঠে ওয়াসেনাতের মা পাশের রুম থেকে বলে উঠে…..
__পাগলের মত হাসছিস কেন??
_পাগল হয়েছি তাই(বলেই আবার হেসে জিব কাটে)

মানুষের নিয়তি কখন কি করে কেউ বলতে পারে না।দেখা যাক ওয়াসেনাতের নিয়তিতে কি আছে?তার এই হাসি কি হাসিই থাকবে নাকি…

চলবে…

ভুলগুলো আল্লাহর দেওয়া মহান গুন ক্ষমার চোখে দেখবেন…

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।