প্রেমালিঙ্গণ | পর্ব – ১৮

#প্রেমালিঙ্গণ |১৮|
#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা

সকালে তন্দ্রার আগে স্বাক্ষরের ঘুম ভেঙে গেল৷ তন্দ্রা তাকে কোলবালিশের মতো করে জড়িয়ে ধরেছে। বুকে সাথে আষ্টেপৃষ্টে আছে। স্বাক্ষর এভাবেই তন্দ্রার চুলে মাঝে নিজের হাত ডুবিয়ে দেয়। কপালের ছোটো কা’টা চুলগুলো খুব বিরক্ত করছে তন্দ্রাকে। বার বার চোখমুখ কুঁচকে আসছে। স্বাক্ষর সন্তপর্ণে চুল গুলো কপালের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর উঠে ফ্রেশ হয়ে হসপিটালে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে৷ এরই মাঝে তন্দ্রার ঘুমও কিছুটা হালকা হয়ে আসে। চোখ মেলে স্বাক্ষরকে বিছানায় পেল না সে। আড়মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসল। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখল‚ স্বাক্ষর ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে। তন্দ্রা ধীর পায়ে বিছানা থেকে নেমে স্বাক্ষরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তন্দ্রার এমন কাজে স্বাক্ষর মুচকি হাসল।

“আজ এতো প্রেম কেন?”

“কে বলল এটা প্রেম?”

“তাহলে কী?”

“এটা হচ্ছে বৈবাহিক আলিঙ্গন।”

“তাই নাকি?”

“হুম তাই।

তন্দ্রা স্বাক্ষরের কাছে গিয়ে তাকে সামনে থেকে গাঢ় আলিঙ্গন করল। স্বাক্ষর মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর দিকে। তন্দ্রা শব্দ করে স্বাক্ষরের গালে একটা চুমু খেল; এরপর ওয়াশরুমে চলে গেল। স্বাক্ষর আলমারি থেকে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বের করে ব্যাগের ভেতর রাখল। ফোন আর ওয়ালেট প্যান্টের পকেটে রাখতে রাখতে তন্দ্রাকে ডাক দেয় স্বাক্ষর।

“তন্দ্রাবতী হলো তোমার?”

“এই তো আসছি।

তন্দ্রা ড্রেস চেঞ্জ করে নিয়েছে; ভার্সিটি যাবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে আজ। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজার সামনে পা পিছলে পড়ে গেল সে৷ স্বাক্ষর গিয়ে তুলে দাঁড় করাল তাকে৷ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল‚

“কোথাও লেগেছে?”

“পায়ের গোড়ালিতে আর হাতে।”

“হাঁটার সময় চোখ কোথায় থাকে?”

স্বাক্ষরের কণ্ঠে গম্ভীরতা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেও হাসছিল আর এখনই আবার তার সাথে রেগে আছে। এতে অবশ্য তারই দোষ।

“ঐ চোখ তো শুধু তোমারেই দেখিবার চায় গো।”

“স্টুপিড। মা’রবো এক চড়। প্রেমের ভুত নেমে যাবে৷”

স্বাক্ষর ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তন্দ্রাও রেডি হয়ে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো। ডাইনিং টেবিলের স্বাক্ষর নাস্তা খাচ্ছে। তন্দ্রাকে দেখেও যেন না দেখার ভান করল। সেও কোনো কথা বলল না‚ টেবিলে বসে নিজের মতো খেতে থাকে।

স্বাক্ষর আজ বাইক নিয়ে বের হয়েছে। তন্দ্রা বাইকের সামনে আসতেই, কোনো কথা ছাড়াই সে তার দিকে হেলমেট এগিয়ে দিল। তন্দ্রাও চুপ করে বাইকে উঠে বসল। তারও স্বাক্ষরের প্রতি অভিমান জমেছে। একটু পড়েই তো গিয়েছে; তার জন্য এভাবে বকতে হবে! ভার্সিটির সামনে এসে তন্দ্রা বাইক থেকে নামল।

”টিফিনটা সময় মতো খেয়ে নিও৷”

তন্দ্রা স্বাক্ষরের কথার কোনো উত্তর দেয় না। দ্রুত গতিতে পা ফেলে গেইট অতিক্রম করে ভার্সিটির ভিতরে চলে যায়। তার যাওয়ার পানে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে স্বাক্ষর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইক নিয়ে চলে গেল। এদিকে স্বাক্ষরের সাথে কথা বলতে না পারায় তন্দ্রার মনটা খুব আনচান করছে। কোনো ক্লাসই মন দিয়ে করতে পারল না। ক্যান্টিনে বসে কোনো রকমে‚ বাড়ি থেকে আনা খাবারটুকু খেয়ে নিল।

ভার্সিটি থেকে বাসায় আসার পর….

সবে মাত্র তন্দ্রা গোসল করে ভেজা জামা কাপড় গুলো বেলকনিতে মেলে দিয়ে এসেছে। আননোন নাম্বার থেকে অনবরত কল আসছেই। বিরক্ত হয়ে ভাবছে কলটা ধরবে কী ধরবে না। বিছানার উপর থেকে ফোনটা নিয়ে তার বাবার ঘরে গেল। আজ মি. ইউসুফ মাহমুদ অফিসে যাননি। মেয়েকে দেখে তিনি গাল এলিয়ে হাসলেন। এরই মাঝে আবারও কল এলো। তন্দ্রা তার বাবার দিকে তাকাল। মি. ইউসুফ মাহমুদ জিজ্ঞেস করলেন‚

“কী হয়েছে মা?”

“আব্বু! আননোন নাম্বার থেকে কল আসছে।”

“কই দাও তো দেখি।”

তন্দ্রা মি. ইউসুফ মাহমুদের কাছে ফোনটা দিল৷ মেয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে কানে ধরলেন। উনি কিছু বলার আগেই অপর প্রান্ত থেকে গানের সূর ভেসে আসছে। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে এলো মি. ইউসুফ মাহমুদের। গলার স্বর গম্ভীর করে তিনি বললেন‚

“লজ্জা করে না এভাবে একটা বিবাহিত মেয়েকে ফোন করে বিরক্ত করতে। এই শিক্ষা পেয়েছ ছেলে! ব’খা’টে।”

ফোনের ওপাশ থেকে স্বাক্ষর হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। এসেছিল বউয়ের রাগ ভাঙাতে। এখন দেখছে শ্বশুর মশাই তাকে ব’খা’টে বলে সম্বোধন করছেন। হসপিটালে বসে থেকে পেটে হাত দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসল৷ কোনো কিছুতেই যেন তার হাসি থামছে না। না জানি রাতে সামনা সামনি দেখা হলে কী করবে। শ্বশুরকে দেখে হাসি আটকে রাখতে পারবে তো! তার বউও হয়েছে এক ব’ল’দ। ওহ স্যরি ব’ল’দিরানী। আননোন নাম্বার হয়েছে দেখেই কী বাবার কাছে ফোন ধরিয়ে দিতে হবে।

রাতে স্বাক্ষর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরে৷ দুপুরে ঠিক ভাবে খাওয়া হয়নি। খুব ক্ষিধেও পেয়েছে তার৷ ঘরের ভেতর এসে দেখে তন্দ্রা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে বেনী করছে৷ মুহূর্তেই তার দুপুরের কথা মনে পড়ে গেল। গম্ভীরমুখে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল৷ এদিকে তন্দ্রা তার সাথে কথা বলবে না বলে পণ করেছে। সারাদিনে নিজ থেকে একটাবার কলও করেনি সে স্বাক্ষরকে। দ্রুত বেনী করা শেষ করল সে৷ স্বাক্ষর শার্টটা খুলে বিছানার উপর রেখে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। তন্দ্রা তার নীরবতা দেখে মনে মনে ভাবল‚

“তার আবার কী হলো? রাগ তো দেখানো উচিত আমার। আর সে কি-না মুখটাকে গম্ভীর করে রেখেছে।”

কিছুক্ষণ পর স্বাক্ষর ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। ক্লান্তি ভাবটা অনেকটাই কমে গেছে৷ ঘরের এসি আগে থেকেই অন করে রাখা৷ হাল্কা মাথা ব্যথা করছে তাই সে টাওয়ালটা একটা চেয়ারের উপর রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ রেখে স্বাক্ষর তন্দ্রাকে বলে‚

“মাথাটা একটু টিপে দিবে তন্দ্রাবতী?”

স্বাক্ষরের এমন আদুরে আবদার না রেখে কী কোনো উপায় আছে? তন্দ্রা তার মাথার কাছে গিয়ে বসে। স্বাক্ষর একবার তাকিয়ে‚ তন্দ্রার কোমড় জড়িয়ে শুয়ে থাকে। তন্দ্রা আলতো হাতে স্বাক্ষরের মাথার চুলগুলো আস্তে আস্তে টেনে দেয়৷ স্বাক্ষর এখনো চোখ বন্ধ করে আছে। একটু ভালো লাগছে এখন।

“তুমি খাবে না?”

“হুম।”

“উঠ তাহলে।”

“তার আগে আমাকে এটা বলো, দুপুরে যখন আমি কল দিয়েছিলাম তখন তুমি ফোনটা ছোট আব্বুর কাছে দিয়েছিলে কেন?”

“কই দুপুরে তো তুমি কল দাওনি।”

স্বাক্ষর মুখ তুলে তাকাল একবার। এরপর উঠে তন্দ্রার ফোনে সেই আননোন নাম্বারটা দেখায়।

“এটা তোমার নাম্বার?”

“হ্যাঁ।

“আমি তো ভাবছিলাম কে না কে?”

স্বাক্ষর তার কপাল চাপড়ে বলে‚

“আর ওমনি ধেইধেই করে ছোট আব্বুর হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিলে। আর আমার ভোলাভালা শ্বশুর আমাকে ব’খা’টে বলে সম্বোধন করলেন। গান গাওয়ার মুডটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আনরোমান্টিক বউ একটা।”

স্বাক্ষরকে আফসোস করতে দেখে তন্দ্রার তো হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হওয়ার উপক্রম। মানে হচ্ছে তার বাবা যাকে ব’খাটে বলে শাসিয়েছে সে আর কেউ না, তারই গুনধর “গম্ভীর মহারাজ” নিজেই। হাসি যেন পেট ফে’টে বের হতে চাইছে।

“এখন উঠ। সবাই হয়তো আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে।”

“যাচ্ছি।”

ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসেছেন৷ স্বাক্ষর‚ তুলি আর মি. ইলিয়াস মাহমুদ পাশাপাশি চেয়ারে বসেছে। উনাদের মুখ বরাবর তন্দ্রা আর মি. ইউসুফ মাহমুদ বসেছেন। তন্দ্রা চুপচাপ তার বাবার পাশে বসে থেকে স্বাক্ষরের দিকে তাকিয়ে আছে৷ মি. ইউসুফ মাহমুদকে দেখে স্বাক্ষর কিছুতেই দুপুরের কথাটা মন থেকে মুছতে পারছে না। হাড় ফে’টে যেন হাসি বের হয়ে আসতে চাইছে। তন্দ্রারও ঠিক একই অবস্থা৷ স্বাক্ষরের হাসি আটকাতে গিয়ে বারবার কাশি উঠে যাচ্ছে। খাওয়া ছেড়ে সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে হাসতে হাসতে তন্দ্রা বেচারির অবস্থা খারাপ৷ তাহেরা মাহমুদ কপট রাগ দেখিয়ে বলেন‚

“ছেলেটা কাশি উঠেছে। কই পানি দিবি তা না‚ গাধার মতো হাসছিস।”

মায়ের চোখ রাঙানো দেখে তন্দ্রা চুপ হয়ে যায়। তবুও যেন তার হাসি থামছে না। মুখ টিপে হাসছে অনবরত। স্বাক্ষর পানি খেতে খেতে তন্দ্রার দিকে তাকায়। ইশারায় যেন বুঝিয়ে দিল “একবার ভাগে পাই”। তন্দ্রা হাসা বন্ধ করে কোনো রকমে রাতের খাবারটুকু খাওয়া শেষ করল। স্বাক্ষরের আগে সে খাওয়া শেষ করে ঘরে এলো। তাড়াতাড়ি করে ঘরের লাইট অফ করে কম্বলের নিচে ঘাপটি মে’রে শুয়ে পড়ল তন্দ্রা। এমন একটা ভাব করে যেন‚ বুঝাচ্ছে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। স্বাক্ষর ঘরে এসে দেখল ঘরের লাইট অফ; তন্দ্রা বিছানায় শুয়ে পড়েছে আগেই। ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় কিছুটা বুঝা যাচ্ছে। সে দরজা আটকে বিছানায় এলো। এক টানে কম্বল সরিয়ে দেয়। তন্দ্রার এতে কোনো হেলদোল নেই। এই মুহুর্তে স্বাক্ষরকে বুঝতে দেওয়া যাবে না‚ সে যে জেগে আছে। তন্দ্রার অনেকটা কাছে এগিয়ে গিয়ে স্বাক্ষর‚ তার গলায় একটা লাভ বাইট দেয়।

“রাক্ষস আমাকে খেয়ে ফেলল গো।”

“খুব তো হাসা হচ্ছিল আমার উপর। এটাই তোমার শাস্তি। এখন সারারাত আমার পা টিপে দিবে।”

“পারবো না।”

“স্বামীর আদেশ অমান্য করবে?”

“হুহ।”

তন্দ্রা মুখ ভেংচি কে’টে স্বাক্ষরের পা টিপে দিতে শুরু করল। মিনিট পাঁচেক পর স্বাক্ষর তন্দ্রাকে নিজের কাছে টেনে নেয়৷ কপালে উষ্ণ ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিয়ে‚ গাঢ় আলিঙ্গনে লেপ্টে রইল দুজনে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।