
অফিডিয়ান | পর্ব – ১
উত্তরের ঘন জঙ্গল এর পাশের আলিশান বাড়িটার লিভিং রুমে সোফায় বসে আছেন শামসুল কাদের, পাশেই বসে আছে, তার ছোট মেয়ে রুমাইশা কাদের।
উত্তরের ঘন জঙ্গল এর পাশের আলিশান বাড়িটার লিভিং রুমে সোফায় বসে আছেন শামসুল কাদের, পাশেই বসে আছে, তার ছোট মেয়ে রুমাইশা কাদের।
লিভিং রুমে ঢোকার আগ মুহুর্তে বাবা আর ফুপ্পার কিছু কথা কানে এলো রুমাইশার৷ ফুপ্পা থেমে থেমে বলছেন, —দেখ শামসুল, ছেলে আমার আজ ও অপরাধ বোধে ভোগে৷ ওই ঘটনার পর থেকে ও নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিয়েছে৷
রুমের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। রুমাইশা উঠে ঘড়ি দেখলো, তিন টা বাজে। এই সময়ে কিসের শব্দ হলো, আর রুমের ভেতর এত অন্ধকার কেন? ঘুমানোর সময়ে তো রুমে আবছা আলো ছিল।
বিকেলের দিকে রুমাইশা আর শাফিন বেরোলো জঙ্গলের ভেতর ঘুরতে। দুপুরের একটু আগে এসে শামসুল কাদের রুমাইশার বই খাতা, কিছু জামা কাপড়, আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস এনে দিয়ে গেছে৷ সেগুলো গোছ গাছ করে গোসল সেরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ওরা ভাবলো জঙ্গল টা একটু ঘুরে আসা যাক৷
আজ ও রুমের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরের আলোটা কেউ অফ করে দিয়েছে, শাফিন বলেছিল সাফওয়ান ভাইয়া বন্ধ করতে পারে। কিন্তু ও তো থাকে চিলেকোঠায়৷ ও কেন এত রাতে এসে লাইট বন্ধ করবে?
—সা—সাফওয়ান ভাইয়া! তুমি! রুমাইশা অবাক হলো। সাফওয়ান যে এত্ত লম্বা হবে ও ভাবতেই পারেনি! সাফওয়ান এর দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে রুমাইশা বলল, —ক্ষিদে পেয়েছে তোমার? কিছু করে দেবো?
এক্সাম শুরু হতে আর ১ দিন আছে, ধুমছে পড়াশোনা করছে রুমাইশা। সাথে শাফিন ও। সেই দিনের পর থেকে সাফওয়ান এর সাথে রুমির আর দেখা হয়নি। শেষ রাতের সেই অদ্ভুত শব্দটাও আর হয়নি। সেটাকে নিছকই মনের ভুল ভেবে নিয়েছে রুমাইশা, হয়তো মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ছিলো অনেক তাই ভুলভাল দেখেছে৷ ওসব নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি ও৷
সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে স্পুনে লেগে থাকা আইসক্রিম চেটে খাওয়ার জন্য মুখটা খুললো সাফওয়ান। আর এরপর মুখ হা করতেই সাফওয়ানের কুচকুচে কালো মুখগহ্বরের ভেতর ক্যানাইন দাঁতের জায়গায় রুমাইশা দেখতে পেলো দুইটা ঝকঝকে সাদা, তীক্ষ্ণ, ধারালো, লম্বা আর সরু দাঁত।
রুমাইশা শোয়া থেকে উঠে বসল। চোখ দুটো মুছে নিলো ভালোভাবে৷ এই অসময়ে কে আসবে? ফুপ্পি? না শাফিন! ভাবতে ভাবতে উঠে দরজা খুলে দিলো রুমাইশা। কিন্তু কাউকেই সামনে পেলো না৷ মনে মনে শাফিনের ওপর খুব বিরক্ত হলো।
সাদা ওড়নাটা বিছিয়ে আছে বিছানার ওপর, নিতম্ব ছাড়ানো চুল গুলো ডানপেশে হয়ে ছড়িয়ে আছে। নরম হাত দুইটা দিয়ে মোবাইল ফোন টা ধরে উপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ভাবছে রুমাইশা বাক্যটা কিভাবে সাজালে সাফওয়ান ভাইয়ের মনপুত হবে।
রুনিয়া খাবার নিয়ে ছাদে এলেন। কারো পায়ের শব্দ শুনে সাফওয়ান সতর্ক হয়ে উঠলো। ফুল স্লিভ শার্ট পরে গলার কাছের স্কেলি আবরণ টাকে মেকআপ দিয়ে সুচারুতার সাথে ঢেকে দিয়ে, চোখে ডার্ক গগলস, মুখে মাস্ক পরে, চুল গুলো হাত দিয়ে মাথার পেছন এর দিকে সরিয়ে দিলো।
নামাজ শেষে ইশতিয়াক, সাফওয়ান আর শাফিন বাড়ি ফরে এলো। সৌভাগ্যের বিষয় এটাই যে কোনো অসুবিধা হয়নি। শাফিন আর সাফওয়ান দুজনেই শেষের কাতারে দাড়িয়েছিলো।
আজ জানালায় গ্লাস লাগাতে একদমই ভুলে গেছে রুমাইশা। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই৷ এখন গ্লাস লাগাতে গিয়ে শব্দ হলেই ও পুরাই শেষ। আপাতত গ্লাসের ভাবনা মাথা থেকে তাড়াতাড়ি সরিয়ে সামনের দিকে মনযোগ দিল ও৷
দেড়টার দিকে একবার জেগে গেলো ও, কিন্তু পুরোপুরি জাগলো না, শুধু কান দুটো সজাগ হলো। কিন্তু তুমুল বৃষ্টির শব্দ ছাড়া কিছুই শুনলো না, পরক্ষণেই আবার ঘুমিয়ে পড়লো। বৃষ্টির বেগ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করছে।
বিছানায় চিত হয়ে , লম্বা চুল গুলো এক পাশে করে রেখে কোলবালিশে ডান পায়ের হাটু ঠেকিয়ে বুকের ওপর হাত রেখে শুয়ে আছে রুমাইশা। ঘুম নেই ওর চোখে। আর যা হয়েছে আজ রাতে তাতে ওর ঘুম আসলেই বরং আশ্চর্যের ব্যাপার হতো।
দু বার রিং হওয়ার পর ফোন ধরলো শাফিন৷ ফোন ধরেই শাফিন বলল, —এদিকে সব ক্লিয়ার ভাইয়া। মা একটু আগে রান্না ঘরে এলো। বাবা রুমে আছে। কাজের খালা এখনো আসেনি।” সাফওয়ান প্রতিউত্তরে শুধু হুম বলে ফোন রেখে দিলো।
অনেক গুলো দিন পর নিজের রুমে এসে রুমাইশার কেমন জানি ফাকা ফাকা ঠেকলো। কিন্তু জ্বরের ঘোরে এসব নিয়ে ভাবার সময় পেলো না ও। বিছানায় যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো ও।
হকচকিয়ে গেলো রুমাইশা। ভয়ে হাতে ভর দিয়ে বিছানার এক কোণায় সরে গিয়ে আয়েশা কে কল দেওয়ার জন্য ফোনের সুইচ টিপলো ও, ‘এ কি! ফোনের নেটওয়ার্ক নেই কেন! কি হলো নেটওয়ার্কের, একটু আগেও তো ছিলো!”
রুমাইশা কে এইভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ান বিছানা থেকে নামতে নামতে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, —দ্বিতীয়ত তোকে আমার চাই। তারপর একটু বিরতি দিয়ে বলল, —এখনই উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই, সময় নিয়ে ভেবে চিনতে উত্তর দিস।
রুমাইশাদের বাড়ির পাশ থেকে বিশ পচিশ হাত দুরত্ব রেখে মেইন রোড চলে গেছে। ভেজা জামা কাপড় গুলো হাতে নিয়ে শামসুলের সাথে রাস্তা থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকলো রুমাইশা। আয়েশা ওদের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
কাজের চক্করে পড়ে রুমাইশা ফোন টা চেক করার সময় পেলো না৷ কিন্তু কাজ করতে গিয়ে ভুল করতে লাগলো শুধু। মন টা ওর এদিকে নেই৷ মাথায় অনেক অনেক চিন্তা কিলবিল করছে। কোনো কাজ ঠিক মতো হচ্ছে না।
আত্মহত্যা করার আগে ল্যাব টা কে সাফওয়ানের ব্যাবহার উপযোগী করে রেখে গেছেন তিনি। ল্যাবটিতে অসংখ্য প্রাণির দেহাবশেষ কেমিক্যালে চুবানো ছিলো, সেগুলো সব অপসারণ করে রেখেছিলেন মোস্তফা।
মেসেজ পড়ে আঁতকে উঠল রুমাইশা। সাফওয়ান আজ আবার এসেছে নাকি! তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে দরজার সামনে দাড়ালো, তারপর কান পাতলো দরজায়। নাহ কোনো শব্দ আসছে না তো!
সাফওয়ান গভীর ঘুমে আছে, নিঃশ্বাস পড়ছে ওর ঘন ঘন। রুমাইশা মনোযোগ দিয়ে শুনছে সাফওয়ানের নিঃশ্বাস এর শব্দ। আর ওর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। এই খুব বড়সড় ব্যাক্তি টাকে নিজের বুকের ওপর রাখতে পেরে ওর যেন অন্যরকম অনুভূতি বয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। প্রচণ্ড রকম ভালো লাগছে ওর৷
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের চোখের কোণা থেকে পানি মুছে রুনিয়া সাফওয়ানের দিকে তাকয়ে বললেন, — তুই যে বিয়ে করবি, আর রুমি কে বিয়ে করবি এতে আমি প্রচন্ড খুশি, আর রুমি কে আমারও খুব পছন্দ! কিন্তু রুমি কিভাবে রাজি হবে?
আয়েশা ভেতরে ভেতরে রাগে ফুসতে লাগলেন। রুমাইশা প্রচুর প্রচুর জেদি। তবে সেটা খুব কম দেখায় ও। কিন্তু একবার দেখাইলে আর ওকে ঠেকানো যায় না।
বর্তমানে ফোন টা সাফওয়ানের কাছে৷ চিলেকোঠার বাইরে টি টেবিল টার পাশে বসে মা ছেলে দুজনে মিলে মিস্ত্রী গীরি করছে। সাফওয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে ফোনের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করছে। ফোন টাকে দেখতে দেখতেই সাফওয়ান কঠিন গলায় বলে উঠলো, — মামার কাছে কল দিয়েছিলে? তো মামা কি বলল?
গতকাল ও আয়েশার সাথে কয়েক বার কথা বলতে গেছে। কিন্তু আয়েশা গুটিকয়েক কথা ছাড়া আর কিছুই বলেননি। তাছাড়া আজ সকালে রাফসানের সাথে আয়েশা এই সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাফওয়ানের এমন কাজে রাফসান ও প্রচন্ড রেগে আছে।
সমস্ত রাত টা ল্যাবে কাটিয়েছে সাফওয়ান৷ রুমাইশার থেকে নেওয়া সমস্ত ফ্লুউড গুলোর টেস্ট করেছে ও৷ রুমাইশার ব্লাড টেস্ট করার পর সাফওয়ান পুরোপুরি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। শামসুল বাসায় এসেছেন কিছুক্ষন আগে, খাওয়া দাওয়া করে নিজের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি। রুমাইশা ঘুমাচ্ছে ওর ঘরে৷ সারাদিনের কাজের পর ক্লান্তি লাগছিলো ওর অনেক৷
মেসেজ টি পড়ে দ্বিধান্বিত হয়ে গেলো রুমাইশা। কি লুকাবে সাফওয়ান ওর থেকে? আবার সেটা নাকি গুরুতর কিছু! কিন্তু সাফওয়ান তো ওর খারাপ চাইবে না কখনো, তাই কিছু যদি লুকিয়েই থাকে তাহলে অবশ্যই সেটা ভালোর জন্যই।
রুমাইশা চরম ঘৃণার চোখে তাকিয়ে এক ঝটকায় হাত টা ছাড়িয়ে নিলো, তারপর কড়া গলায় বলল, — দেখুন ভাইয়া, আমি আপনাকে সারাজীবন ভাইয়ার চোখেই দেখেছি, তাই আপনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কোনো ভাবেই সম্ভব নয়
গ্রামের রাস্তা এখন পুরোপুরি ফাকা। সেই ফাকা রাস্তাতেই বুলেটের গতিতে নিজের মার্সিডিজ বেঞ্জ টা হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাফওয়ান। শাফিন বসে আছে ভাইয়ের পাশের সিটে চুপচাপ। ওর মাথায় ঘুরছে একটু আগের সাফওয়ান আর রাফসান ভাইয়ের ভেতর কার আক্রমনাত্মক সংলাপ গুলো।
ক্রোধান্বিত চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে জুবায়েরের দিকে এগোলো সাফওয়ান। সাফওয়ান কে এভাবে আগাতে দেখে জুবায়ের ঠাই দাঁড়িয়ে গেছে, ভয়ে ওর পা সরছে না। জুবায়েরের গা কাপা শুরু হলো ওর নিজের অজান্তেই! ঢোক গিলল একটা বড় করে।
রাফসানের এত গুলো মিসডকল দেখে আয়েশা ভড়কালেন, ছেলেটার কোনো বিপদ আপদ হলো কিনা ভেবে দ্রুত কল ব্যাক দিলেন আয়েশা। প্রথম বার রিং হয়ে কেটে গেলো, আবার কল দিলেন। দুঃশ্চিন্তায় ওনার বুকের ভেতর দুরু দুরু করে কাপতে লাগলো!
শাফিন ও একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছে৷ উঠতো না, যদি সাফওয়ান ওকে সকাল সকাল তলব না করতো তাহলে। সাফওয়ান কল দিয়েছিলো খানিক আগে৷
রুনিয়া ফিতা টা দিয়ে রুমাইশার বক্ষের মাপ নিতে নিতে বলল, তোর তো এইখানে আর কোনো জামাকাপড় নেই, কয়েক টা না বানালে পরবি কি? মাপ নিয়ে রাখছি, সাফওয়ান নয়তো শাফিন, নয়তো তোর ফুপ্পা; যে কেউ বাইরে গেলেই নিয়ে আসতে বলেছি।
চকিতে পেছন ফিরে তাকালো রুমাইশা। উদভ্রান্তের মতো দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। ঘামে গায়ের সাদা রঙের আন্ডার শার্ট টা ভিজে জব জবে হয়ে গেছে। গায়ের সাথে লেপ্টে আছে সেটা। হাপাচ্ছে ও। হাতে ওর এক গুচ্ছ ধবধবে সাদা রঙের অর্ধ প্রস্ফুটিত গোলাপ।
রাফসান আসায় রুনিয়া খুশি হলেন অনেক। হলরুমে সোফায় রাফসান কে বসতে দিয়ে তিনি শাফিন কে বললেন রুমাইশা কে গিয়ে ডাকতে৷ শাফিন ওর রুমে পড়ছিলো। মায়ের আদেশ পালন করে সে গেলো রুমাইশা কে ডাকতে।
রাফসান আর শাফিন ঘুরতে গেলো জঙ্গলের ভেতর। বহু বছর আসা হয়নি এখানে, ছোটবেলার কত শত স্মৃতি ওদের এইখানে। স্মৃতি গুলো আবার তাজা করতে ধীর গতিতে ওরা জঙ্গলের দিকে এগোলো।
সাফওয়ান সোজা হয়ে বসে গলা খাকারি দিয়ে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, — সে কথা পরে বলছি, আগে বল তুই আমার ল্যাবের খোজ পেলি কিভাবে, আর ল্যাবের ভেতরে প্রবেশ করলি কিভাবে?
সাফওয়ান অদ্ভুত কিন্তু ভয়ঙ্কর হাসি হেসে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকলো রুমাইশার দিকে৷ ওর ওই চোখ দুটোর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। প্রচন্ডরকম হিংস্রতায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে সেগুলো। ভয়ঙ্কর ওই চেহারার দিকে তাকালেই রুমাইশার গলা শুকিয়ে আসছে!
কাপা হাতটা রুমাইশার সারা মুখে বুলিয়ে দিয়ে, শরীর টা ঝুকিয়ে রুমাইশার কপালে চুমু খেলো ও। আর তখনই রুমাইশার মুখের ওপর টুপ করে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো সাফওয়ানের চোখ থেকে। রুমাইশার চোয়াল বেয়ে সেটা গড়িয়ে পড়লো বিছানার ওপর৷
আর এদিকে পুরো একদিন কিছুই না খাওয়া সাফওয়ান আর রুমাইশা ডাইনিং টেবিলে বসে গান্ডে পিন্ডে এক গাদা খাবার খেয়ে শেষ করে টলতে টলতে নিজেদের রুমে চলে গেলো। আর বাকিরা হা হয়ে শুধু দেখলো ওদের খাওয়া৷
ছাই রঙা বোরখার ওপর মিশমিশে কালো রঙা হিজাব আর নেকাব পরে গাড়ির জানালা দিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে সাফওয়ানের পাশের সিটে বসে আছে রুমাইশা। সাফওয়ান ড্রাইভিং করছে।
রুমাইশা গিয়ে বেঞ্চে বসতেই ওর বান্ধবী সালিমা আর আফিয়া এসে বসলো ওর দুই পাশে৷ আর বাকি মেয়ে গুলো ওকে আশপাশ থেকে ঘিরে ধরলো। আর ছেলে গুলো উৎসুক হয়ে ওদের পাশের সারিতে বসে রইলো, মেয়েরা রুমাইশাকে কি প্রশ্ন করে আর রুমি কি উত্তর দেয় সেটা শোনার জন্য৷
হঠাৎ কারো গমগমে কন্ঠস্বর শুনে ভড়কে গেলো মারুফ লোকটা। চমকে উঠে দরজা দিয়ে বাইরে তাকালো ও। ওর চ্যালাব্যালা দের মাথার ওপর দিয়ে সাফওয়ানের মুখ টা স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান।
সাফওয়ানের হঠাৎ করেই চোখ গেলো ওর গাড়ির দিকে। দূর থেকে ও গাড়ির ভেতরে বসা রুমাইশা কে ভীতসন্ত্রস্ত, হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখলো ওর দিকে৷ সাফওয়ানের এতক্ষনের ক্রুর হাসি মাখা মুখ টা নিমিষেই নিভে গেলো।
জঙ্গলের ভেতর টা আজ কেমন জানি নিশ্চুপ। বেলা হয়েছে অনেক খানি, কিন্তু অন্যান্য দিনের মতো আজ পাখিদের কলরব নেই তেমন৷ মাঝে মাঝে বাতাসের কারণে গাছের শুকনা পাতা গুলো মরমর ধ্বনি করছে, আর সেই সাথে বাতাসের শন শন শব্দ শোনা যাচ্ছে থেকে থেকে।
সাফওয়ান বিছানা থেকে নেমে দাড়ানোর পর রুমাইশা সহাস্যে ওর থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দাড়ালো। আর এরপর নিজের ডান দিকে চোখ পড়তেই চমকে গেলো রুমাইশা। হাস্যজ্বল মুখখানায় অমানিশা নেমে এলো ওর মুহুর্তেই।
ও সাফওয়ানের জন্য নেহাত একটা মেডিসিন! শুধু মাত্র মেডিসিন! এর বাইরে আর কিছুই না! ওই ডায়েরি টা তে কোথাও লেখা নেই যে সাফওয়ান ওকে ভালোবাসে, কোথাও না! তাহলে কি ও সাফওয়ান কে চিনতে পারেনি?
গত দুদিন ধরে সাফওয়ান বাড়ির বাইরে। ফোন বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় আছে ও কাউকে বলেনি। রুমাইশা চলে যাওয়ার পর থেকে ও কিছুই খায়নি৷ রুনিয়া আর আয়েশা সব রকমের জোর জবরদস্তি করেও কিছুই খাওয়াতে পারেনি ওকে৷
গাড়ি গুলো এসে থামলো একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। তিনটা গাড়ির মাঝের সাদা গাড়িটার, মাঝখানের সিটে সাদা রঙা কোট প্যান্ট পরে বসে আছে লুকাস।
রুনিয়া হলরুমের মেঝেতে বসে বুক চাপড়ে হাহাকার করে কাদছেন। তার সাফওয়ান, তার নাড়িছেড়া ধন, তার প্রথম সন্তান সাফওয়ান নেই! তাকে কারা জানি মেরে ধরে নিয়ে চলে গিয়েছে কোথায়!
কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। শাফিন ভ্রু কুচকে দেখার চেষ্টা করলো, আসলেই সেখানে কিছু আছে, নাকি তার চোখের ভুল! আর ও কিছুক্ষন খেয়াল করে দেখার পর শাফিন বুঝলো যে এটা তার চোখের ভুল নয়, সত্যি সেখানে কিছু একটা, বা কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে৷
সাফওয়ান গর্জে উঠলো আবার ও। হিসহিসিয়ে বলল, — রাখ তোদের উপায়, আমি মরি আর বাচি তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না৷ তবে, আমি যদি এইখান থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারি, তবে তোদের বাচার আর কোনো উপায় থাকবে না৷
দরজা খুলতেই সারা শরীর কালো পোশাকে আবৃত কেউ একজন ঝাপিয়ে পড়লো ওর বুকে৷ থতমত খেয়ে গেলো সাফওয়ান, টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলো, তাড়াতাড়ি দরজার হাতল ধরে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে বাচালো ও।
ওর কণ্ঠে বিস্ময়ের সুর৷ রুমাইশা নিজের মুখ টা কালো কাপড়ে কায়দা করে বাধতে বাধতে মৃদু স্বরে বলল — এই পৃথিবীতে যদি আমার সবচেয়ে বেশি চেনা কোনো ঘ্রাণ থাকে, তবে সেটা আপনার শরীরের ঘ্রাণ৷
পুরো ভার্সিটি টা জুড়েই যেন সাজসাজ রব৷ সবাই এদিক ওদিক তাড়াহুড়ো করে ছুটছে। স্টুডেন্ট সহ অন্যান্য টিচার আর স্টাফরা নিজেদের ভেতর ল্যাবরেটরির বিষয় টা নিয়ে নিচু গলায় আলোচনা করছে৷ বিশালদেহী গার্ড গুলো কঠিন চোখে আশপাশ টা পর্যবেক্ষণ করছে আর অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে৷
ভার্সিটির স্টুডেন্ট রা সব যত্রতত্র ছোটাছুটি করে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। পুলিশ ফোর্স এসে দাঁড়িয়ে আছে ভার্সিটির মুখে, কিন্তু তাদের কে হারবার্টের গার্ড গুলো আটকে রেখেছে ভেতরে যেতে দিচ্ছে না, যার কারণে দুই পক্ষের ভেতরে ঝামেলা শুরু হয়ে বেশ বড় আকার ধারণ করতে চলেছে৷
হঠাৎ তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় নক পড়লো। লোক টা খাওয়া থামিয়ে দরজায় নক দেওয়া ব্যাক্তি টাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলো। আর তখনি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো দুজন যুবক। ঢুকেই তাদের ভেতর থেকে একজন লাঞ্চরত ব্যাক্তি টার উদ্দ্যেশ্যে ইংরেজিতে বলে উঠলো, — ম্যাথিউ আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বস।
সাফওয়ান প্রথমে নিজের হাত দিয়ে কয়েকবার ধাক্কা দিলো ঢাকনা টায়, কিন্তু কাজ হলো না। এদিকে নোংরা পানির সংস্পর্শে এসে রুমাইশা বার বার হাচি দিচ্ছে। সাফওয়ান কে আগের থেকেও বেশি শক্ত করে আকড়ে ধরে রেখেছে ও। পানি টা থেকে গন্ধ আসছে বিচ্ছিরি, রুমাইশার গা গুলাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করার নেই।
টাল সামলাতে না পেরে সোফার ওপর থেকে সজোরে নিচে পড়ে গেলো সাফওয়ান। ওর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো রুমাইশা। পাইলটিং রুম থেকে জোনাস দৌড়ে এসে উত্তেজিত গলায় বলল, — কারা জানি ফাইটিং জেট থেকে আমাদের জেটের ওপর বুলেট ছুড়েছে।
পরমুহূর্তেই রুমাইশাকে ভয়ের চুড়ান্ত সীমায় নিয়ে গিয়ে গুহা গুলোর ভেতরের সবচেয়ে বড় গুহা টা থেকে নিজের মাথা বের করলো বিশাল এক পাইথন, যার আকার দেখে রুমাইশার চোখ উলটে যাওয়ার জোগাড়। দানবের মতো গুহার ভেতর থেকে একটু একটু করে বের হয়ে আসছে সেটা৷
মেহমান রা সব বাড়ির ছাদের দিকে এগোচ্ছে৷ সেখানে চিলেকোঠার রুমের পাশের ফাকা জায়গাটাতে স্টেজ তৈরি করা হচ্ছে, রাতের জন্য৷ গায়ে একটা সাদা রঙা পাঞ্জাবি পরে রাফসান সেসবের তদারকি করছে৷
রুমাইশা কে জড়িয়ে ধরে বসে আছে আয়েশা। তার চোখের কোণে পানির রেশ। মাঝে মাঝেই আচলের কোণা দিয়ে চোখের কোণ টা মুছে নিচ্ছেন তিনি। শামসুল আর ইশতিয়াক দুজনে এক জায়গায় বসে আছেন, ওনাদের কোলে সাদমান আর শাহমীর।
কাল রাতের ঘটনার পর কেউ আর ছাদে ঘুমায়নি। সবাই যার যার কামরায় গিয়ে ঘুমিয়েছে। ডাক্তার এসে আফসানা কে চেক আপ করে বলেছিলেন যে প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে তার। কিছু ওষুধ দিয়েছেন আর বলে গেছেন বেশি বেশি চিন্তা করে মাথায় চাপ প্রয়োগ না করতে।
বরপক্ষ কে স্টেজের সামনে রাখা চেয়ারে বসতে দেওয়া হলো। রুমাইশা, আফসানা আর বাচ্চারা গিয়ে প্রথমে এক জায়গাতে বসলো। আর ওদের পাশে এসে বসলো আন্টি মহল। শাফিনের কাজিন গুলা সব কনের সাথে ফট্যোশ্যুট করতে চলে গেছে।
সাফওয়ানের বাম হাতের মুঠিতে ধরে রাখা রুমাইশার দুই হাতের কবজি রুমাইশার মাথার ওপর দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরে রেখেছে সাফওয়ান। রুমাইশার রাগে লাল হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ও ফিচেল হাসি দিয়ে বলল, — আপনি কে? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম নাহ!
হলরুমে সোফায় বসে আছে সিনথিয়া, তার মা আর সাথে আর ও কিছু মহিলা। বিবাহ ম্যানেজমেন্ট আন্টিও সেখানেই আছেন৷ সিনথিয়ার মুখ খানা অন্ধকার। কারণ গতকাল সে সাদ্দাত হুসেইন নামের ব্যাক্তির সাথে বিয়ের কথা শুনে নিজের সব কাজিন মহল কে অতি আনন্দের সাথে জানিয়েছিলো, বিশেষ করে তার সেই খালাতো বোন কে, যে কিনা সাদ্দাত হুসেইনের ওপর ক্রাস খেয়ে বসে ছিলো।
আফসানা কে বই গুলো দিয়ে রুমাইশা যখন রুমে এলো তখন সাফওয়ান বিছানায় বসে বালিশে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে কিছু মেইল দেখছিলো। রাশা বিছনায় খেলছে। সাদমান আর শাহমীর সকাল থেকেই নিচ তলায়৷
ঘোর বিপদ টের পেয়ে রুমাইশা ঝড়ের গতিতে গাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। ব্লুটুথ ডিভাইসের ওপাশ থেকে সাফওয়ান চাপা সুরে জিজ্ঞেস করলো, — রিমু তুমি ঠিক আছো?
স্পেশাল ফোর্সের প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য আফতাব হোসেন কে জিজ্ঞেস করলো তাদেরকে সাহায্য করা লোকটার ব্যাপারে, কিন্তু আফতাব হোসেন কিছুই বলতে পারলো না, কোথাও সে লোকটার টিকি পাত্তাও পেলোনা ওরা।
পুলিশ সুপার কবিরের কথাতে সম্মতি জানিয়ে বললেন, — হ্যা, তুমি কালই একবার আফতাব কে নিয়ে গোপনে তাকে দেখে এসো, কিন্তু তিনি আছেন কোথায়?
আক্কাস কবিরের কথা টা ট্রান্সলেট করে অবু কে বলল। অবু উত্তরে কিছুই বলল না, দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে পড়ে রইলো। কবির কিছুক্ষণ চুপ করে অবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো উত্তরের আশায়। তারপর আবার আক্কাস কে দিয়ে তাগিদ দিলো অবু কে কথা বলার জন্য।
সাফওয়ান কে পুলিশ সুপার আর অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার কবির হোসেন এই প্রস্তাবই দিয়ে গেছেন। কিন্তু সাফওয়ান এখনো তাদের ডিসিশন দেয়নি যে সে কি চায়। পরিবারের সবার সাথে আলোচনা করে তবেই সে এই ব্যাপারে কথা বলতে চায়।
নিজের কেবিনে কাগজ পত্রের ভিড়ে বসে আছেন আহনাফ হাসান, তার বিপরীতে টেবিলের অন্য পাশে চেয়ারে বসে আছে কবির৷ সংবাদ সম্মেলনের জন্য সাংবাদিক দের সময় দেওয়া হয়েছে বেলা এগারোটা। এখন আট টা বেজে চল্লিশ মিনিট৷
স্তব্ধ হয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে আছেন আয়েশা, শামসুল আর রাফসানেরা। সাফওয়ান আহমেদ নাম টা শোনা মাত্রই বুক কেঁপে উঠেছে ওদের সবারই। হতচকিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে ওরা বার বার৷ রাফসানের যেন দম আটকে আসছে।
সাফওয়ান বাইরে বের হওয়া মাত্রই ক্যামেরার ক্লিকের শব্দে চারদিক ছেয়ে রইলো, কোনো জনমানুষের কন্ঠস্বর সেখানে শোনা গেলো না। এই অত্যান্ত সুপুরুষ ব্যাক্তিটাকে দেখেতেই লেগে গেলো সবাই৷