সুরাইয়া রাফা
সুরাইয়া রাফা

প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ আগস্ট ২০২৫

সঙ্গীন প্রণয়াসক্তি | শেষ রাতের অঙ্গীকার

সমাপ্ত

সঙ্গীন প্রণয়াসক্তি | সিজন ১ | পর্ব - ৩৩

৬২ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

একটি অপার্থিব সকাল, সেই শুরুর দিন গুলোর মতোই নিরিবিলি, নিস্তব্ধ,শুনশান পরিবেশ, দীর্ঘ ঝড়ের তান্ডব আর ঝুম বর্ষাকে সর্বেসর্বা বিদায় জানিয়ে, খুব ভোরেই সূর্য কীরন উঁকি দিয়েছে পূব আকাশে। দক্ষিণ জানালার কাঁচ গলিয়ে সেই একফালি মিঠে রোদ এসে আঁচড়ে পরছে অত্যাধুনিক ধাঁচের রুমটিতে। অরুর কাছে এই পরিবেশ, এই আবহাওয়া নতুন কিছু নয়, বরঞ্চ অনেকদিনের অভ্যেস।

তবে আজ এই নিস্তব্ধতার সাথে প্রথমবার নতুন করে যা যোগ হয়েছে,তা হলো চন্দন কাঠের মন মাতানো সুঘ্রাণ। রুমের আনাচে-কানাচেতে ম ম করছে এই চেনা পরিচিত পুরুষালী সুঘ্রাণ। বিছানা, বালিশ, কুশন,কম্ফোর্টার সব কিছুই বেশ স্নিগ্ধ লাগছে চনমনে এই স্যন্ডল উড পারফিউম আর মাস্কি সৌরভে। অরুর মনে হচ্ছে গত পনেরোটা দিনের নির্ঘুম রাতের কাছে আজকের এই আড়ামদায়ক ঘুমটুকু অমৃত সম। আর ও এই অমৃত সম ঘুমটুকু পুরোপুরি আহরন করতে চায় নির্বিগ্নে, তাইতো ঘুমের মাঝেই অরুর হৃদয়ে গিয়ে ঠেকছে নিদারুন এই সুগন্ধ,বারংবার মনে হচ্ছে এতোটা আরামের ঘুম কোনোদিন ঘুমায়নি ও। ব্যথাতুর শরীরটাকে একটুখানি নাড়িয়ে চারিয়ে আরও খানিকটা সময়ধরে নতুন এই অনুভূতির সাথে পরিচিত হবে বলে ভেলভেটের মতো মসৃন কুশনের মাঝে মুখ দাবিয়ে, মিঠে রোদটুকু পিঠে পিছলে দিয়ে অন্য দিকে ঘুরে শুলো অরু। এলোমেলো হয়ে ঘুমানোর দরুন ওর রেসমের মতো সিল্কি চুল গুলো ছড়িয়ে পরে আছে পুরো বিছানা জুড়ে। সেগুলোকে গোছানোর কোনোরূপ প্রয়াস না চালিয়েই আবারও ঘুমের দেশে পারি জমালো অরু। তবে অরুর এই অমৃতসম আরামদায়ক ঘুম গাঢ় হতে পারলো না খুব একটা, তার আগেই কানে ভেসে এলো ইলেকট্রনিক্স মেশিনের ভসস ভসস আওয়াজ।

এহেন আওয়াজে ঘুমের মাঝেই বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে গেলো অরুর।কোথা থেকে এই আওয়াজের উৎস তা ঠাওর করার জন্য খানিকটা চোখ ও খুললো বটে। ঘুমের রেশ কাটিয়ে আড়মোড়া ভে’ঙে চোখের পাতা খুলতেই সফেদ রঙা সিলিং এর দিকে চোখ গিয়ে ঠেকলো ওর, যা দেখে হুট করেই বড্ড অপরিচিত লাগছে অরুর। কিন্তু চারপাশের স্নিগ্ধ সুঘ্রাণটা বড়োই পরিচিত। অগত্যাই ঘুমের ঘোর কাটিয়ে চারিদিকে চোখ ঘোরালো ও, সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে পরে যায় ঝড় আর বৃষ্টিস্নাত নির্ঘুম বিগত রাতের কথা। কিছু ঘোর লাগানো মূহুর্ত আর তারপর জায়ান ক্রীতিকের অনেকটা কাছে চলে আসা। সব কিছুই সুস্পষ্ট অরুর মস্তিষ্কে এখন। সেসব কথা মাথায় আসতেই তীব্র লজ্জায় চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে নিলো অরু। অরু যখন ঘনিষ্ঠ মূহুর্তের কথাই ভাবছিল, ততক্ষনে ছক্কা লাগার মতো আরও একটা প্রশ্ন এসে মাথায় লাগলো ওর, মনেমনে ভাবলো,

— তখন তো গাড়িতে ছিলাম, তাহলে এখন কোথায়? কথাটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় কানে ভেসে এলো সেই বিরক্তিকর ভসস ভসস আওয়াজ। আওয়াজের উৎস খোজার জন্য অরু এবার চোখ ঘুরিয়ে চাইলো ওয়াল মিরর এর দিকে, দেখলো ওর থেকে খানিকটা দূরত্বে আয়নার সামনে দাড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে করে চুল শোকাচ্ছ ক্রীতিক, পরনে তার ট্রাউজার সেট। ক্রীতিককে দেখার সঙ্গে সঙ্গে অরু তরিৎ গতিতে কম্ফোর্টারের মধ্যে মুখ লুকালো,মুখ ঢাকা দিতে দিতেই নিচু স্বরে বিড়বিড়ালো, — নির্লজ্জ,নির্দয় লোক। ওদিকে অরুর নড়নচড়ন টের পেয়ে ক্রীতিক হাতের কাজ চালাতে চালাতেই ডাকলো,

— মিসেস অরোরা জায়ান! ক্রীতিকের এহেন সম্মোধনে, কম্ফোর্টারের মাঝে বসেই উষ্ণতায় ছেয়ে গেলো অরুর সর্বাঙ্গ। লজ্জারা র’ক্তিম হয়ে ঘীরে ধরেছে মুখ মন্ডলের আনাচে কানাচে, সেই সাথে যোগ হয়েছে তলপেটের উড়ন্ত প্রজাপতি। লজ্জায় রাঙা হয়ে অরু যখন ঠোঁট কামড়ে মটকা মে’রে পরেছিল, তখনই পুনরায় ডেকে ওঠে ক্রীতিক,আয়নার দিকে তাকিয়েই বলে, — এটা আপনার বাপের বাড়ি নয় মিসেস জায়ান, এটা আপনার স্বামীর বাড়ি, তাই বারোটা পর্যন্ত ঘুমানোর বদ অভ্যেস দূর করতে হবে, কজ আপনার হাসবেন্ডকে সকাল সকাল ভার্সিটি যেতে হয়।

ক্রীতিকের এহেন খোঁচামা’রা কথায় অরু আর শুয়ে থাকতে পারলো না, অগত্যাই মুখ কাচুমাচু করে উঠে বসে পিঠ ঠেকিয়ে দিলো খাটের ব্যাক স্ট্যান্ডে। ওর পরনে এখনো ক্রীতিকের সফেদ রঙা শার্ট। সামনের দিকে শার্টের দুটো বোতাম খোলা, অরু নিজের অপটু হাতে বোতাম দুটো লাগিয়ে, একটু একটু চোখ উঁচিয়ে ক্রীতিককে দেখলো অতঃপর মিনমিনিয়ে শুধালো, — বাসায় কি করে এলাম? ক্রীতিক এদিকে না ঘুরেই জবাব দিল, — ভুতে নিয়ে এসেছে তোকে।

অরু জানে ক্রীতিক মজা করছে, কিন্তু ওর কেন যেন কথা বলতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে, কথা তো দূরে থাক ক্রীতিকের চোখের দিকে তাকাতেও লজ্জা লাগছে এই মূহুর্তে । শান্ত,সাবলীল চোখ দুটোর দিকে তাকালেই বারংবার মনে পরে যাচ্ছে কাল রাতের অশান্ত, আর ঘোর লাগানো দৃষ্টিপাতের কথা, যা অরু উপেক্ষা করতে পারেনি,নিজের অজান্তেই আপন করে নিয়েছিল সেই মিষ্টি যন্ত্রনাটুকু। অথচ এখন সেসব কথা মনে পরলেই লজ্জায় ম’রে যেতে ইচ্ছে করছে অরুর। অরু চুপ হয়ে আছে দেখে ক্রীতিক বললো, — ঘুম না হলে,ঘুমাতে পারিস, ডিস্টার্ব করবো না। অরু না সূচক মাথা নাড়িয়ে মিনমিনিয়ে বললো, — আপনার মাথার ব্যন্ডেজ কোথায়? ক্রীতিক বললো,

— ফ্রেশ হওয়ার ছিল তাই খুলে ফেলেছি। অরু ভ্রু কুঁচকে বললো, — তাই বলে পুরো ব্যন্ডেজ খুলে ফেলতে হবে? আপনি এতো ছন্নছাড়া কেন বলুন তো? অরুর কথায় ক্রীতিক এবার ঘুরে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বললো, — কাল পুরোপুরি স্বামীর অধিকার দিয়েছিস, আর আজই শাসন করার স্টার্ট? ক্রীতিকের কথা গায়ে না মেখে অরু ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, ক্রীতিকের শার্টটা ওর হাঁটুতে গিয়ে ঠেকেছে, অরু সেটাকে টেনে হিঁচড়ে আরও খানিকটা নিচে নামাতে নামাতে বললো, — এখানে তো আমার কোনো জামা কাপড় নেই কি পরবো? ক্রীতিক বললো,

— ক্লজেট ভর্তি জামাকাপড় আছে যা খুশি পর গিয়ে। — ওগুলো তো আপনার, আমি কিভাবে পরবো? ক্রীতিক এবার ম্যাকবুক নিয়ে ডিভানের উপর বসতে বসতে বললো, — আমার যা, তাই তোর। এখন থেকে আমার ড্রেসই পরবি তুই,সব তোর। ক্রীতিকের কথায় অরু দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বিড়বিড়িয়ে বললো, — আশ্চর্য লোক, এমনভাবে বলছে যেন সে ইনার ও পরে। — পরার দরকার নেই। ক্রীতিকের রাশভারি আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই, অরু হকচকিয়ে বললো, — কিহহ! ক্রীতিক এবার ম্যাকবুক থেকে চোখ সরিয়ে অরুর দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট আওয়াজে বললো,

— আমার সামনে ইনার পরার দরকার নেই।তোকে এসব ছাড়াই সুন্দর লাগে। ওর এহেন কথায় অরু দ্রুত মাথা নিচু করে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বললো, — নির্লজ্জ, বেহায়া লোক মুখে লাগাম নেই কোনো। ওনার লজ্জা নাই থাকতে পারে, তাই বলে কি আমারও নেই? তবে ওয়াশরুমে আর ঢোকা হলো না অরুর, তার আগেই ওর চোখ আটকালো পায়ের নুপুরে, পা দুটো এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নুপুরজোড়া ভালোমতো পরখ করে অস্ফুটেই অরু বললো, — অদ্ভুত তো আমার নুপুর গুলো এমন সোনালী রঙের হয়ে গেলো কেন? অরুর কথায় ক্রীতিক ডিভান ছেড়ে উঠে এসে ওর সামনে দাড়িয়ে দু’পকেটে হাত গুঁজে বললো, — আর কবে বড় হবি অরু? তুই বড় হতে-হতে তো আমি বুড়ো হয়ে যাবো। অরু মাথা তুলে করুন সুরে বললো,

— কেন কি হয়েছে? ক্রীতিক ঠোঁট কামড়ে বললো, — না কিছু না,আমার পিচ্চি বউ সোনা আর রূপার পার্থক্য বোঝেনা তাই বললাম আর কি। অবশ্য দোষটা আমারই। মনেমনে বললো, — যখন পরিয়েছিলাম তখন তুই ঘুমের ঘোরে ছিলি, জানার কথাও নয়। ক্রীতিকের কথায় মন খারাপ হয়ে গেলো অরুর,ও মুখ কালো করে শুধালো, — এভাবে কেন বলছেন কি করেছি আমি? অরুর কথায় ক্রীতিক বললো, — কিছু করিস নি, হেটে যেতে পারবি নাকি হেল্প করবো? আবার সেই লাগাম ছাড়া কথাবার্তা, ক্রীতিকের কথায় অরু দ্রুত ওই যায়গা থেকে প্রস্থান করতে করতে দাঁত কিরমিরিয়ে বলে, — পারবো আমি, সরুন তো।

দিনের দ্বিপ্রহর চলমান। সকালের মিঠে রোদ টুকু মিয়িয়ে গিয়ে কালো মেঘের আড়ালে ঠায় নিয়েছে সূয্যি মামা। যার দরুন অত্যাধুনিক হলরুমটা অন্ধকারে ছেয়ে আছে। একটা লম্বা হট শাওয়ার শেষে অন্ধকারের মাঝেই পা টিপে টিপে হলরুমে এসেছে অরু। নিচে নেমে কোনোকিছু না ভেবেই সবার আগে স্ফটিকের সবগুলো আলো জ্বালিয়েছে ও। এবার সবকিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ফিকে হয়ে যাওয়া নিরিবিলি রুমে উপস্থিতি মাত্র দুজনার, অরু পাশ ঘুরে কাউচের দিকে তাকিয়ে দেখলো ক্রীতিক কাউচে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে বসে বাইক রেচিং গেইম খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অরু ক্রীতিককে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,অযাচিত মনটা লাফিয়ে উঠে শুধালো , — আপনি কি করে থাকেন এতোটা একা একা? কষ্ট হয়না বুঝি? অরু সেই তখন থেকে করুন চাহনিতে তাকিয়ে আছে দেখে গেইমটা পজ করে কানের হেডফোন নামিয়ে, ক্রীতিক বললো,

— এভাবে ডিস্ট্রাক্ট করতে মন চাইলে রুমে চল,আমিও একটু মন ভরে দেখি তোকে। কাল রাতে মন ভরেনি। ক্রীতিকের কথা গায়ে না মেখে অরু কিচেনের দিকে যেতে যেতে বললো, — খিদে পেয়েছে, কি রান্না করা যায় বলুন তো? অরু কিচেনের দিকে দু’কদম এগিয়ে যেতেই কঠিন সুরে বাধ সাধে ক্রীতিক, ওকে আর এক পাও বাড়াতে না দিয়ে ক্রীতিক বলে, — খবরদার কিচেনে যাবি না তুই। ক্রীতিকের কথায় অরু ভ্রু কুঞ্চিত করে পেছনে তাকিয়ে শুধালো, — কিচেনে না গেলে রান্না কিভাবে করবো? ক্রীতিক মনিটরের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, — ফ্রীজে স্যালাড, আর পাস্তা রাখা আছে গরম করে খেয়ে নে। অরু নাক সিকোয় তুলে বললো,

— আমি এসব খেতে পারিনা, তাছাড়া রান্না করলে সমস্যাটা কোথায়?আগেও তো রান্না করতাম, আর আপনি খেতেনও। তাহলে এখন কিসের অসুবিধা আপনার? ক্রীতিক চোয়াল শক্ত করে বললো, — আগের কথা ভুলে যা,এখানে তোকে রান্না করার জন্য আনিনি আমি। অরু কিচেন কাউন্টারে হেলান দিয়ে, দুহাত বুকে ভাজ করে বললো, — তাহলে কেন এনেছেন শুনি? অরুর শেষ কথাতে ক্রীতিক মনিটরের গেইমটা পজ করে রিমোট কন্ট্রোলটা কাউচের উপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাড়ালো, অতঃপর ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে অন্যহাত দিয়ে লম্বা ঘাড় ছুঁই ছুঁই চুল গুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে অরুর দিকে এগিয়ে এসে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি আওয়াজে বললো, — দুটো রিজন, এক ইচ্ছে মতো আদর করার জন্য, আর দুই আমাকে অভ্যেসে পরিনত করার জন্য। ক্রীতিকের কথায়, অরু খানিকটা ভরকে যায়, অযাচিত লজ্জায় মিয়িয়ে যাওয়া মুখখানা হুট করেই আড়াল করে দাড়িয়ে পরে উল্টো দিকে।

ক্রীতিক সেভাবেই দাড়িয়ে অরুর আগাগোড়া পরখ করতে থাকে। ক্রীতিকের ক্লজেটে কালোর সমাহার, সেখান থেকেই বেছে নিয়ে একটা একটা ব্ল্যাক ওভারসাইজ টিশার্ট, আর একটা থ্রী কোয়ার্টার পরেছে অরু। ক্রীতিকের থ্রী কোয়ার্টার অরুর ফুল প্যান্টে পরিনত হয়েছে। দেখতেও বেশ কিউট লাগছে ওকে। অরুকে ভালোমতো পরখ করে ওর কনের কাছে মুখ নিয়ে ক্রীতিক হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,

— আমার ড্রেসে তোকে মারাত্মক লাগছে হার্টবিট।এখন থেকে আমার সামনে অন্যকিছু পরার দরকার নেই। অন্য কিছু পরার দরকার নেই মানে? এ আবার কেমন কথা?অরু কি এখন সারাজীবন এসব দানবীয় সাইজের পোশাক আশাক পরে ঘুরে বেড়াবে নাকি আশ্চর্য? মানুষ কি বলবে? কথাটা ভেবেই বিরক্ত হলো অরু, বিরক্তিতে চিড়বিড়িয়ে পেছনে ঘুরে ক্রীতিককে হালকা ধাক্কা মে’রে সরিয়ে কাউচে গিয়ে বসতে বসতে বললো, — খিদে পেয়েছেতো আমার,সালাদ খেতে পারবোনা, অন্যকিছুর ব্যবস্থা করুন। ক্রীতিক পকেট থেকে ফোন বের করে, সেটা স্ক্রল করতে করতে বললো, — আমি রান্না টান্না করতে পারিনা, কি খাবি বল অর্ডার করে দিচ্ছি। অরু একঝলক ক্রীতিককে পরখ করে কিছু একটা ভেবে বললো, — বলছি তার আগে এদিকে আসুন।

ওর অকস্মাৎ সম্মোধনে ক্রীতিক ফোন থেকে নজর সরিয়ে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, — সিরিয়াসলি তুই আমাকে কাছে ডাকছিস? তাহলে কাল এতো কান্নাকা’টি করার কি মানে ছিল অরু? আবার সেই ভুলভাল কথা টানছে ক্রীতিক, এই লোকের মাথায় আর কিছু নেই নাকি? ভেবে পায়না অরু, এমনকি ভাবার জন্য খুচরো সময় নষ্ট ও করেনা, বরং উঠে এসে কোনোরূপ কসরত না দেখিয়েই অনেকটা অধিকার নিয়ে নিজের হাত দিয়ে ক্রীতিকের খরখরে পুরুষালি হাতটা ধরে ওকে টেনে এনে কাউচে বসালো। অরুর কান্ডে ক্রীতিক আর বাঁধ সাধলো না, উল্টে কাউচে গা এলিয়ে দিয়ে অরুকে নিজের কোলে বসিয়ে নরম সুরে শুধালো, — এখানে কেন?

অরু পেছনে ঘুরে ক্রীতিকের ক্ষতস্থানে আলতো হাত বুলিয়ে বললো, — আপনার এখন হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে ফ্রুটস খাওয়া উচিৎ, তা না করে আমাকে কথা দিয়ে পিষ্ট করছেন।কতটা গভীর ক্ষত হয়েছে একবারও খেয়াল করেছেন? ক্রীতিক অরুর কথার দু’পয়সা তোয়াক্কা না করে নিজ হাত দিয়ে ওর গালদুটো চেপে ধরে বললো, — কতবার বলেছি আমাকে তুমি করে বলবি, কথা শুনিস না কেন? অরু ক্রীতিকের চোখ থেকে অন্য দিকে চোখ সরিয়ে অস্পষ্ট সুরে বললো, — পারবোনা,আমার লজ্জা লাগে ভীষন। ক্রীতিক ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো,

— এখনো লজ্জা? অরু ক্রীতিককে কিভাবে বোঝাবে কাল রাতের কথা উঠলেই কান দিয়ে ধোয়া বের হয় ওর, ভীষণ লজ্জায় শিহরণ জেগে ওঠে ক্ষুদ্র নারীদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সেই শিহরণে কেঁপে ওঠে অষ্টাদশীর হৃদয়,মন সবকিছু। হৃদয়ের সাথে কম্পিত হয় ধনুকের মতো বাঁকানো নারী শরীরটাও। পরমূহুর্তেই নিজেকে সামলে নেয় অরু, শখের পুরুষের সেই শিহরণ জাগানো প্রথম ছোঁয়াকে পুরোপুরি মাথা থেকে সরিয়ে, মনের মাঝে জেঁকে বসে তার প্রতি একটুকরো ব্যাথাতুর ভালোবাসা, বারবার মনে হতে থাকে, —- কেন আপনি এতো একা জায়ান ক্রীতিক? আপনার জীবনটা অন্যসবার মতো সাভাবিক নয় কেন? এতোগুলা বছর কি করেই বা একা একা বেঁচে আছেন আপনি? আমি কি আপনার জীবনের এই একাকিত্ব আদৌও দূর করতে পারবো কোনোদিন? অরু চুপচাপ বসে আছে দেখে ক্রীতিক আগ বারিয়ে শুধালো,

— কি ভাবছিস? অরু এদিক ওদিক মাথা নাড়িয়ে টি টেবিল থেকে ফাস্ট এইড বক্স হাতরিয়ে, ক্রীতিকের কোল থেকে নেমে গিয়ে পাশে বসে বললো, — এ্যা’ক্সিডেন্ট কিভাবে করলেন? ক্রীতিক কাউচের ব্যাকসিটে গা এলিয়ে দিয়ে বললো, —- সেদিন তোর মায়ের বাসা থেকে বেরিয়ে বাইকে রাইডিং এ গিয়েছিলাম, ইম্পর্টেন্ট ম্যাচ ছিল তাই না করতে পারিনি,হয়তো মেন্টালি ডিস্ট্রাক্ট ছিলাম, তাই নিজের উপর কন্ট্রোল ছিলনা। ক্রীতিকের কথায় ভয়ের চোটে অরুর শরীরের লোমকূপ দাড়িয়ে গেলো। কোনোমতে ওর মাথায় সফেদ ব্যান্ডেজের আস্তর লাগাতে লাগাতে অরু বললো,

— আপনার রা’গটাকে ভীষন ভয় করে আমার। কোনোদিন যদি.. অরু কথা শেষ করতে পারলো আর,তার আগেই ওকে টান মে’রে নিজ বুকের উপর ফেলে দিয়ে ক্রীতিক আগের মতো করেই হিসহিসিয়ে বললো, — নিজের হার্টবিটকে কেউ আ’ঘাত করে? অরু ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, — তাহলে নিজেকে কেন করছেন? আপনি একটুখানি ব্যাথা পেলে আমারও তো কষ্ট হয়। অরুর কথায় ক্রীতিক চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলো, শেষ কবে, কোথায়,কখন ওকে কেউ এভাবে বলেছে। ওর ক্ষত,ওর ব্যাথা এসব নিয়ে চিন্তা করেছে, ওকে একটু আপন করে আগলে ধরেছে, ক্রীতিকের মনে নেই, তাই বোধ হয় অরুই জীবনে প্রথম যে ক্রীতিককে অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে বেধেছে। আজ ক্রীতিকের অশান্ত হৃদয়টা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলছে,

— এতো বছরের অপেক্ষা খুব একটা কষ্টের ছিলনা অরু, এখন তো সেসব শুধুই স্মৃতি মাত্র, আমার অরু এখন আমার বুকেই আছে, আর কক্ষনো কেউ এই দূরত্ব বাড়াতে পারবে না, তোর আমার মাঝে যদি কেউ দুঃসপ্নেও চলে আসে, তবে তারাও বাকিদের মতোই আমার আসল পৈচাশিক রূপটা স্ব চোখে দেখতে পাবে। অর মেইবি লাইফটাও দিয়ে দিতে হতে পারে হু নোজ?

ইজি চেয়ারের নরম গদিতে বসে বারবার গা দোলাচ্ছেন গভীর চিন্তাগ্রস্থ আজমেরী শেখ।মনেমনে কষছেন একের পর এক ছক। তার ছোট মেয়েকে যে জায়ান ক্রীতিক নিয়ে গিয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই সুকৌশলি মস্তিষ্কের আজমেরী শেখের। তার এতো কড়া শাসন, এতোটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, এতোটা দাম্ভিকতা সবকিছুকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে গেলো তারই সৎ ছেলে। যে সবসময় আজমেরী শেখের সাথে টেক্কা দিয়ে চলতে পছন্দ করে, কিন্তু আজমেরী নিজেও তো চুপচাপ বসে থাকার মানুষ নয়, কৌশলে কিভাবে চেক মেট দিতে হয় সেটা তারও জানা। তাছাড়া সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মান সম্মান, জায়ান ক্রীতিকের মতো বে’য়াদব, বেহায়া ছেলে যে সমাজের ধার ধারে না কোনোকালেই তার দ্বারা সবই সম্ভব, নিজের সৎ বোনকে বিয়ে করাও সম্ভব। কিন্তু আজমেরী শেখের চরিত্র পুরোপুরি ক্রীতিকের বিপরীত,সে সব কিছুতে সবার আগে সমাজকে প্রাধান্য দেয়, সে মতোই প্রতিটা কাজ করে ,ওই জন্যই হয়তো তাদের মাঝে এই দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধ।

—আমেরিকায় তোমাদের রেজিষ্ট্রি হয়েছে, বাংলাদেশে তো নয়। এখন আমিও যদি তোমার মতো কৌশলে চালি তাহলে কি করবে তুমি জায়ান ক্রীতিক চৌধুরী? বেশ অনেকক্ষন ধরে ভাবতে ভাবতে কিঞ্চিৎ ক্রুর হেসে বিড়বিড়ালেন আজমেরী শেখ।

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!