বধূ সাজের নির্মম পরিহাস ও ঘৃণার ঘোষণা

9 মিনিট পড়া 1,422 শব্দ
বধূ সাজের নির্মম পরিহাস ও ঘৃণার ঘোষণা

সিয়াম-মায়া অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। দু’জনেই গাড়িতে বেশ চুপচাপ বসে আছে…

কেউ কোনো কথা বলছে না। সিয়াম’ই নিরবতা ভেঙে মায়াকে প্রশ্ন করল__

” কিছু খাবে?!!!”

মায়া বেশ চুপচাপ। সিয়াম আবারো জিজ্ঞেস করল, কিছু খাবে?!!! মায়া এবারো বেশ চুপচাপ। সিয়াম এবার গাড়ি থামিয়ে প্রশ্ন করে, শুনতে পাচ্ছো কি?!!!

মায়ার ঘোর কাটে। জি,স্যার! আমাকে কিছু বলছেন?

সিয়াম রাগী লুক নিয়ে বলল, তারমানে তুমি কিচ্ছু শুনতে পাওনি?!!!

-‘আসলে আমি…..(….)….

~হয়ছে। আর অজুহাত দিতে হবে না….(সিয়াম)

,

,

,

-‘ গাড়ি এসে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে থামলো।মায়া এতক্ষণে ভাবনা জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। আর ওর দৃষ্টি এতক্ষণে বাহিরে গেল।

অবাক বিস্ময়ে মায়া সিয়ামের দিকে তাকাই। সিয়াম মায়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন_

” কি হলো? এভাবে হা করে তাকিয়ে আছ কেন? নামো…”

-‘ ইয়ে মানে স্যার! গাড়ি এখানে…কিছু বুঝলাম না…(মায়া)

~’ তোমার কিছু বুঝতে হবে না। আমি যা বলি তুমি বরং সেটাই করো। তুমি আগে গাড়ি থেকে নামো।(সিয়াম)

-‘ মায়া কিছু না বুঝেই গাড়ি থেকে নামল। তারপর সিয়ামের পিছুপিছু চলতে লাগল। সিয়াম রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকার সাথে সাথেই সিয়ামের তিনজন বন্ধু বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। মায়ার দিকে তাকিয়ে তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আতিক বলে উঠল,

এসেছিস তাহলে?!!! আমরা তো ভাবছি আসবি’ই না…

সিয়াম মুচকি হেসে বলল, তা কি হয় ইয়ার?!!! বিশেষ দিন বলে কথা…

সিয়াম মায়াকে পরিচয় করিয়ে দেয় বন্ধুদের সাথে। মায়া কুশল বিনিময় করে ওদের এবং সিয়ামের আহ্বানে খেতে বসে পরে। মায়া এমনিতেই খুব লাজুক স্বভাবের, তারউপর আবার আজকে এতগুলো মানুষের সামনে খেতে বসছে। মায়ার গলা দিয়ে যেন কিছু ঢুকছে না। খাবার সামনে নিয়ে শুধু হাতড়াচ্ছে। আতিক সিয়ামকে ইশারা দিয়ে সেটা দেখালো। সিয়াম আড়চোখে তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখে শুধু হাসছে। মায়ার কিছু’ই মুখে পরেনি তার আগেই সবার খাওয়া শেষ। সিয়াম মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘তোমার মনে হয় ক্ষিদে নেই, তুমি বরং হাত ধূয়ে নাও…’

মায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সিয়ামের মুখের দিকে তাকালো, তারপর হাতটা ধূয়ে খাবার টেবিল সেরে উঠে পরল।

সেদিন সিয়াম রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে মায়াকে নিয়ে শপিংয়ে যায়। সাথে বন্ধুরারা তো আছে’ই। মায়া অবশ্য প্রথমে ইতস্তত বোধ করছিল যেতে, পরে সিয়ামের রাগী লুক দেখে রাজি হয়ে গেল। অবাক হলো মায়া যখন দেখল সিয়াম বিয়ের সব কেনাকাটা করছে। মায়া সিয়ামের সাথে থেকে থেকে সবকিছু চয়েজ করে দিচ্ছে আর সিয়াম সেগুলোতে লাইক দিচ্ছে। হাসিমুখে শাড়ি গহনা সব বাছাই করে দিলেও মায়ার ভিতরটা তখন ফেটে যাচ্ছিল। বুকফেটে কান্না আসছিল। মায়া জানে, এগুলো সিয়াম ওর হবু বউয়ের জন্য কিনছে। মায়া আর পারছিল না। আসছি বলে দৌঁড় দিল দোকান থেকে। একদৌঁড়ে নিচে গাড়ির কাছে এসে হাপাচ্ছে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে। ঠিক তখন’ই কারো হাতের স্পর্শ টের পাই মায়া। ফিরে তাকাই সে। সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে ওর পিছনেই। ঘাবড়ে যায় মায়া। অশ্রু লুকিয়ে বলে, শপিং করা শেষ?!!!

-আর কান্না লুকাতে হবে না, আমি বুঝে গেছি। গাড়িতে উঠ।

-‘কি বুঝে গেছেন?'(মায়া)

~সিয়াম গম্ভীর হয়ে বলে, কিছু না। গাড়িতে উঠো। মায়া চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে। পিছনে সিয়ামের তিনজন বন্ধুও আছে। গাড়ি গিয়ে একটা বিরাট বাসার সামনে গিয়ে থামে। অবাক বিস্ময় চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে গাড়ি থেকে নামে মায়া। গাড়ি গেইটে থামার সাথে সাথে’ই তিনটা মেয়ে ছুটে আসে। এর মধ্যে একটা মেয়ে সিয়ামকে যখন তুই বলে হাসাহাসি করে কথা বলছে, তখন সিয়াম লক্ষ্য করে মায়ার চোখে অবাক বিস্ময়। হওয়ার’ই কথা। কারন, ও তো আর লিজাকে কখনো দেখে নি। যাকগে, লিজা মায়ার দিকে তাকিয়ে আঙুল বাকা করে মুচকি হাসি দিয়ে সিয়ামের দিকে তাকিয়ে যখন বলছে পারফেক্ট, তখন মায়া থ হয়ে যায়। কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারে সিয়ামের চেনাজানা কেউ ওরা। যারা ওদের রিলেশন সম্পর্কে জানে। যায় হোক!!!

এদিকে মায়ার ঘোর কাটতে না কাটতেই সিয়াম লিজাকে ইশারা করে কি যেন বলে…

মায়া কিছু বুঝে উঠার আগে’ই লিজা মায়াকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়…..

কিছুক্ষণ পর মায়াকে সদ্য কেনা শাড়ি আর গহনাগুলো পরিয়ে বিছানায় বসিয়ে বাইরে চলে যায় লিজা। মায়া থ হয়ে বসে আছে। ও বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে এসব? স্যার কেন এমন করছেন? আর কেন’ই বা এই শাড়ি গহনা কিনে জোর করে আমাকে পরালেন। আচ্ছা, এগুলো কি বসের কার্য ক্ষমতার মধ্যে পরে?!!!

হয়তো বা….

তাই মায়া আর জুরাজুরি করে নি। ক্ষাণিক বাদে’ই একটা কাশি দিয়ে রুমে সিয়াম প্রবেশ করে। মায়া তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। সিয়াম আসছে সেটা মায়া আয়নার ভেতর দিয়েই দেখতে পায়। জীবনে প্রথম শাড়ি পরিহিত অবস্থায় মায়া দাঁড়িয়ে, তার ঠিক একটু পিছনেই সিয়াম দাঁড়িয়ে। আয়নার ভিতর দিয়েই সিয়াম মুগ্ধ চোখে তার মায়াপরিটাকে দেখছে। নরমাল সাজ অথচ কি দারুণ লাগছে বলে বুঝানো যাবে না। মায়া লজ্জায় শাড়ির আঁচল টানছে আর পুরো শরীর ঢাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু মেয়েটি এমন ভাবে শাড়ি পরিয়েছে যে এতটুকুন আঁচল দিয়ে পুরো শরীর ঢাকা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে মায়ার খুব রাগ হচ্ছে মেয়েটির প্রতি। এভাবে কেউ শাড়ি পরায়? পেট ঢাকলে পিঠ খালি, পিঠ ঢাকতে গেলে পেট খালি…!!!??

মায়া আঁচল দিয়ে পেট ঢাকার বৃথা চেষ্টা করছে আর সিয়াম ওর দিকে’ই এগিয়ে আসছে। মায়া একবার আয়নায় তাকাচ্ছে আরেকবার পেট ঢাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সিয়াম গিয়ে পিছন থেকে মায়াকে ধরে ওর দিকে ফিরিয়ে দেই। মায়া লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে…..

সিয়াম মুগ্ধ দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,

অপূর্ব!অপূর্ব….

ইচ্ছে করছে আমার মায়াপরিটাকে একবার ছুঁয়ে দিতে….

-‘ ছুয়াছুয়ি পরে হবে, আগে তো বিয়েটা করে নে….

কথাটা বলতে বলতে লিজা রুমে প্রবেশ করে,তার সাথে অন্যরাও। মায়া হতবাক।

অবাক বিস্ময়ে লিজার দিকে তাকিয়ে বলল,

বিয়ে?!!!

-‘ হুম বিয়ে। আজকে তোমার আর এই বুদ্ধুটার বিয়ে। কেন? ও তোমায় কিছু বলে নি?!!! (কথাটা বলেই লিজা সিয়ামের দিকে তাকাই)

সিয়াম নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া সিয়ামের দিকে জিজ্ঞাসো দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। সিয়ামও মায়ার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। কারো মুখেই কোনো কথা নেই….

আতিক এসে সিয়ামের চোখের সামনে হাত ঘুরিয়ে বলল, আর কত?!!!

আর কত দেখবি? চল না এবার। অনেক বেলা হয়ে যাচ্ছে যে….

পরে গিয়ে যে কাজিকে পাবো না….

কথাটা বলতে বলতেই বাকি দু’জন এসে সিয়ামের হাত ধরে ওকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে আর মায়াকে নিয়ে গাড়িতে করে চলে যাওয়ার জন্য বলছে….

লিজা মায়ার হাত’টা ধরে বলে, চলো…..

মায়া লিজার হাতের মুঠো’ই থেকে ওর হাতটা হ্যাচকা টানে বের করে চিৎকার করে বলে উঠে_

” না…..”

সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় মায়ার চিৎকার শুনে। ওর দিকে ফিরে তাকাই সিয়ামসহ বাকিরা….

মায়ার আর বুঝতে বাকি নেই কি হতে যাচ্ছিল এখন। মায়া নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ওর সামনে সিয়াম দাঁড়িয়ে। আর সিয়াম ওর সাথে এমন করবে তা কল্পনাও করেনি মায়া। মায়া ভাবছে, শুধু ভাবছে, কি করে পারল সিয়াম ওর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে…?!!!

মায়ার ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহূর্তে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে কিন্তু সেটা পারছে না….

আতিক মায়ার সামনে এসে বলল, ‘না মানে?’

কি বলছ তুমি এসব মায়া?

তোমার মাথা ঠিক আছে?

কত কষ্ট করে আমরা এই প্ল্যান করলাম তোমাদের সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আর তুমি?!!!

কি বলছ এসব?!!!

মায়া চিৎকার করে__

আমি এ বিয়ে করতে চাই না ভাইয়া….

আমি এ বিয়ে করতে চাই না।

-লিজা মায়ার সামনে এসে বলে,

Are you crazy,Maya?

তুমি কি বলছ এসব?

বিয়ে করবে না মানে?!!!!

মায়া এবার আরো জোড়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

করব না, মানে করব না।

আমি বিয়ে করব না।

সিয়াম এতক্ষণ চুপ থেকে সবটা শুনছিল, অবস্থা বেগতিক দেখে এখন মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল। মায়া কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে গেল সিয়ামের দিকে তাকিয়ে। সিয়াম মায়ার হাত’টা ধরে ফেলে সবার সামনে। মায়া এখন একদম শান্ত….

সিয়াম মায়ার একটা হাত ওর দু’হাতের মুঠো’ই এনে বন্দি করে।

তারপর দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এভাবে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সিয়াম বলে উঠে_

” এমন করো না তুমি প্লিজ…

শান্ত হও আর ওরা যা বলছে তাতে রাজি হয়ে যাও….

যাও গাড়িতে গিয়ে বসো…

-‘ গাড়িতে যাব মানে?!!!(মায়া)

~’ মানে মানে করো না তো! গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি রেডি হয়ে আসছি।(সিয়াম)

-‘ মায়া এবার প্রচন্ড রেগে গেছে। রেগে গেলে ওর মাথা একদম ঠিক থাকে না। আজও তাই হলো….

চেঁচিয়ে বলে উঠল,

আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না….

হাতটা ছেড়ে চলে যাচ্ছিল সিয়াম, মায়ার চেঁচিয়ে উঠা দেখে পিছু ফিরে তাকালো….

কি বলছ তুমি?!!!

আবার বলো…..

-‘ আমি আপনাকে বিয়ে করব না, করতে চাই না।।(মায়া)

সিয়াম আবারও এসে মায়ার হাতটা ধরল….

মায়া চোখ তুলে তাকাল সিয়ামের দিকে। সিয়াম শান্ত গলায় বলল,

আবার বলো কি যেন বলছিলা?!!!

মায়ার এবার রাগ হলো। জোরে, আরো জোর গলায় মায়া বলে উঠল….

বুঝতে পারছেন না আপনি? সত্যি’ই কি বুঝতে পারছেন না আপনি?!!! আমি পরিষ্কার বাংলায় বলছি, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না….

– কারনটা কী?(সিয়াম)

~অকারন’ই কারন। আর সবকিছুর এত কারন খুঁজতে যাবেন না তো….

-‘ মায়া! সত্যি’ই কি তুমি আমায় বিয়ে করতে চাও না?!!!(সিয়াম)

~না, না, না….

আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না আর কতবার বলব….?!!!(মায়া)

–ওহ…..(সিয়াম)

,

,

,

,

-‘ এবার হাতটা ছাড়েন, প্লিজ?!!!'(মায়া)

-‘ মায়া! তুমি কি আমায় ভালোবাসো?!!!(সিয়াম)

,

~’ না…(মায়া)

,

-‘ কি?!!! কি বলছ? আবার বলো তো….(সিয়াম)

,

– আমি……আপনাকে…..

ভালো…..বাসি…..না…..(মায়া)

,

,

– ‘ মজা করতেছ না???(সিয়াম)

,

,

-আমি মজা করতেছি না।

আর যায় হোক মায়া কখনো ভালোবাসা নিয়ে মজা করে না….(মায়া)

,

,

-‘ তারমানে তুমি???(সিয়াম)

,

,

– আমি সত্যি’ই আপনাকে ভালোবাসি না….

,

ঘৃণা করি আমি আপনাকে

,

ঘৃণা করতেও আমার বড্ড ঘৃণা হয়

,

আপনি তো ঘৃণার অযোগ্য….(মায়া)

~সিয়াম ঠাস করে হাতটা ছেড়ে দিল….

তারপর দাঁড়ানো থেকে বসে পরল….

আর মায়া?!!!

মায়া দৌঁড়ে সেখান থেকে চলে গেল…

অধ্যায় 18 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!