শেষ রাতের কান্না ও ভালোবাসার আত্মসমর্পণ

লেখক: মৌসুমী আক্তার 1 মিনিট পড়া 117 শব্দ
শেষ রাতের কান্না ও ভালোবাসার আত্মসমর্পণ

Saari raat aahein bharta..

Pal pal yaadon me marta..

Maane na meri mann mera..

Thode thode hosh madhoshi si hai

Neend behoshi si hai.

Jaane kuch bhi na man mera..

Kabhi mera tha par ab begana hai ye

Deewana deewana samjhe na ho…

Kabhi chup chup rahe

Kabhi gaaya yeh kare

Bin poochhe teri taarife sunaya yeh kare

Hai koi Haqiqat tu ya koi fasana hai

Kuch jaane agar to itna ke

Yeh tera deewana hai re

Mann mera, maane na mann mera

Deewana deewana samjhe na ho…

--দূর দূরন্ত থেকে ভেষে আসছে গানটা কোথাও থেকে হয়তো।হয়তো কেউ বক্সে গান চালাচ্ছে।গানের সুর কেমন যেনো মন কেড়ে নিচ্ছে।গানের এই সুরটা কানে যেতেই মস্তিষ্ক নাড়া দিয়ে উঠলো।চোখে পাতা মেলে তাকালাম।আমার এক হাতে স্যালাইন চলছে, অন্য হাত ধরে বিহান আমার হাতের উপর কখন কাত হয়ে পড়েছে।মনে হচ্ছে সারারাত ঘুম হয়নি বিহানের।আমি হাত একটুও নাড়াচাড়া দিলাম না কারণ যদি ওর ঘুম ভেঙে যায়।দুইদিন হসপিটালে এডমিট আছি,প্রেসার বেড়ে যাওয়াতে অপারেশন করে নি।বিহানের মধ্যআঙুলে হঠাত তাকিয়ে অন্যরকম এক ভাললাগার অনুভূতি সৃষ্টি হলো মনে।ইংলিশ অক্ষরে বেশ মোটা করে কালো কালি দিয়ে Diya লেখা।ফর্সা আঙুলে কালো কালির লেখাটা বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে।আমি বিহানের হাত ধরে খানিক টা এগিয়ে এনে চুমু দিলাম।এটা বোধহয় কাল রাতে করেছে বসে বসে।কেবিনের অন্য পাশের বেডে বিভোর ভাই আর বড় মামি ঘুমোচ্ছে।আম্মু আর মামি বোধ হয় দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছে।আমার ঠোঁটের স্পর্শ নিজের আঙুলে পেয়ে বিহান সাথে সাথে চোখ মেলে তাকালো।তাকিয়েই নির্মল হাসি দিলো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।ঘুমহীন ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছি আমি।শার্টের দুইটা বোতাম খোলা ক্লান্ত চাহনি আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।

বিহান আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

"কষ্ট হচ্ছে? "কথাটার মাঝে কত কেয়ার।

আমার গালে বিহানের হাত চেপে ধরে বললাম,

"অনেক কষ্ট হচ্ছে।"

বিহান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

"সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি না।কি জুনিয়র তোমার মাম্মা কে কষ্ট দিচ্ছো কেনো?তুমি হাত পা ছোড়াছুড়ি করলে মাম্মা কষ্ট পাচ্ছে তো বাবা।তুমি কি জানো তোমার মাম্মা ইজ দ্যা বেষ্ট মাম্মা।তোমার জন্য কত যুদ্ধ করছে দেখো।আমার থেকেও তোমাকে বেশী ভালবাসে।"

সহসায় চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো দু'ফোঁটা পানি।কাঁন্না চেপে বললাম,

"আমার তো আমার জন্য কষ্ট হচ্ছে না।কষ্ট হচ্ছে আপনার জন্য।নিজের সব থেকে প্রিয় মানুষ টা কে কেউ মৃত্যুপথযাত্রী দেখলে তার কতটা কষ্ট হয় আমি বুঝি।"

"তুমি আমাকে কত বোঝো দিয়া।আমার এই জীবনের সব থেকে বড় প্রাপ্তি তুমি।"

এরই মাঝে রিয়া, তিয়াস ভাইয়া খাবার নিয়ে এলো বাসা থেকে।সবাই খাবার খাচ্ছে।

--আর আমি সুয়ে সুয়ে ভাবছি আমি কত লাকি।চারদিক থেকে পরিপূর্ণ আমার জীবন।আমার পেটে আমার সন্তানের অস্তিত্ব আমি সম্পূর্ণ বুঝতে পারছি।ও বাইরে আসার জন্য ছটফট করছে, হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে, ওর হাত পা ছোড়াছুড়িতে আমার পেইন ক্রমশ বাড়ছিলো।মাস পুরার আগেই লেবার পেইন শুরু হলো আমার।এমন টায় হওয়ার কথা ছিলো, ডাক্তার আগে থেকেই বলে রেখেছিলো সাত মাসের পরে যেকোনো সময়ে খারাপ কিছু হতে পারে।আমি শুধু প্রার্থনা করছি আমার সন্তান যেনো সুস্থ ভাবে পৃথিবীতে আসতে পারে।এত কষ্ট সহ্য করেও ওকে আমার ভেতরে ক্যারি করলাম আমার এই কষ্ট যেনো বিফলে না যায়।জানিনা আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে হয়তো আমার সন্তানের মুখ আমার দেখা হবে না,বিহানের হাতে হাত রেখে হয়তো পথ চলাও আর হবে না।আমি না থাকলে কি হবে বিহানের।যেখানে সবাইকে বুঝাচ্ছি আমার কোনো চিন্তা হচ্ছে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে চিন্তায় দূর্বল হয়ে যাচ্ছি আমি।আমাকে ঘিরে আমার পরিবারের সবাই বসে আছে।চোখে কাঁন্না নিয়েও হাসার চেষ্টা করছে সবাই।সবাই আমাকে বলছে আমার কিছু হবে না সাহস রাখতে মনে।আমিও সবার কথায় মাথা নাড়িয়ে বললাম হুম।

আম্মুর থেকে আমার বাবা যেনো বেশী ভেঙে পড়েছেন।আমার ফ্যামিলির সবাই এখন হসপিটালে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে।বিভোর ভাই এর মা বাবা,বিভা আপু তাদের বেবি দুলাভাই।রিয়ার মা বাবা আয়রা,তোহা আপুর মা বাবা তিয়াস ভাইয়া, রুশা আপু,মেহু আপুর মা বাবা সবাই ই উপস্হিত।বিহান ভীষণ বিজি ডাক্তার দের নিয়ে মিটিং করেই যাচ্ছে।ওটি রেডি করা হয়ে গিয়েছে।আমাকে এখন ওটির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।আম্মু মামা-মামি দোয়া পড়ে আমার গায়ে ফু দিয়ে দিলেন।বিহান গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে আছে,ভেঙে পড়েছে পুরাপুরি।মামাকে বলছে,বাবা আমি কিভাবে দিয়ার সার্জারী করবো এত কঠিন কাজ আমি কিভাবে করবো।এই প্রথমবার ডাক্তার বিহান ভয় পাচ্ছে বাবা।মামা হেসে বললেন,ডোন্ট ওরি বেটা কিচ্ছু হবে না।আমরা আছি আমাদের দোয়া আছে সৃষ্টিকর্তা ভালো করবে বাবা।

স্ট্রেচারে করে আমাকে ওটির দিকে যখন নেওয়া হচ্ছে তখন ভীষণ কাঁন্না পাচ্ছিলো আমার।আমার আম্মু বাবা আর মামির হাত ধরে কেঁদে দিলাম।মামি আর আম্মুকে বললাম,আমার কিছু হলে আমার সন্তান কে তোমরা দেখো প্লিজ।আম্মু তখন খুব জোরে উচ্চস্বরে কেঁদে দিলো।কাঁদতে কাঁদতে বললো,আমার মেয়ের জন্য আমি চিন্তায় ঘুমোতে পারিনা আর আমার মেয়ে তার সন্তানের জন্য নিজের জীবনের কথা ভাবলো না।ফুপ্পি বললো,নারীরা এমন ই ভাবি।নিজের সন্তান ই তাদের কাছে সব প্রাণের থেকে প্রিয়।একসাথে দুই দুইটা সার্জারী হবে।সিজার অপর দিকে হার্ট সার্জারী।হার্ট সার্জারী বিহানের থেকে বেষ্ট কেউ পারে না যেখানে সব ডাক্তার দের ভরসা বিহানের উপর সেখানে বিহান ভেঙে পড়েছিলো। বিহান বলছিলো আমার স্ত্রীর শরীরে অস্ত্রোপচার আমি করতে পারবো না।আমার হাত কাঁপবে।ওর শরীরের র*ক্ত আমি দেখতে পারবো না।আসলেই এটা অনেকটায় অসম্ভব ব্যাপার ছিলো বিহানের পক্ষে।তখন বিহানের প্রফেসর বললো,তুমি না পারলে কেউ পারবেনা।তুমিই পারবে।ওটিতে তোমার স্ত্রী নয় একজন অনাগত সন্তানের মা যাকে তোমার বাঁচাতে হবে।একজন স্ত্রী যার স্বামী তাকে ছাড়া বাকিটা পথ চলতে পারবে না।এতগুলা মানুষের মুখে হাসি তোমাকে ফোটাতেই হবে।বি স্ট্রং ইয়াং ম্যান।ওটিতে আমাকে যখন রাখা হলো তখন কেউ ছিলো না রুমে।শুধুমাত্র বিহান ছিলো এপ্রোণ পরে দাঁড়িয়ে।বিহান ওটির জন্য প্রস্তুত ওর পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে।ওটিতে প্রবেশ করার পর আমার মাথা কেমন চক্কর দিচ্ছিলো।চিন্তায় মাথা পাগল হয়ে যাচ্ছিলো বিহানের ওই অসহায় মুখ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।বিহান আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

বিহান আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো

'কি হয়েছে শ্যামাপাখি।'

'আমার খুব ভয় করছে বিহান।'

'কিসের ভয়।'

'তোমাকে ছেড়ে যাবার ভয়।'

'ভয় তো আমি পাচ্ছি পাগলি।আমি কিভাবে তোমার শরীরে।আগে যদি জানতাম এমন কঠিন দিন আসবে আমার জীবনে আমি কখনো ডাক্তারি পড়তাম না।আমি পারবো না দিয়া, কিছুতেই না।'

'এভাবে পেশেন্ট এর সামনে কাঁদতে নেই ডাক্তার।তুমি না ডাক্তার।কিসের ভয় পাচ্ছো?আমাদের সন্তানের জন্য পারতেই হবে।'

'তুমি বুঝছো না আমি কিসের ভয় পাচ্ছি।'

'আমি সব বুঝছি,তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো?যদি আমি মরেই যায় আমাদের যখন আবার জন্ম হবে আমরা তখন আবার এক হবো।যতবার জন্ম হবে তোমার আর আমার ই দেখা হবে বুঝেছো।তাই আমি হারাবো না।'

'আমাকে কি বাচ্চা পেয়েছো।সিনেমার কয়েক লাইন বলে বোঝাচ্ছো।আমরা একটায় জনম পায় দিয়া,পরজন্ম বলে কিছু নেই।আমাকে তাই এসব বুঝ দিও না প্লিজ।এই জনমেই আমার তোমাকে চাই।'

'ওকে তাহলে আরেক টা বিয়ে করে নিয়েন।'

'এমন সিরিয়াস জায়গা এসে তুমি মজা করছো দিয়া।বুঝতে পারছো আমার মনের অবস্থা। '

'আপনি না ভীষণ পাগল জানেন।মানুষ একসাথে কত গুলা বিয়ে করে প্রেম করে তাদের কি খারাপ লাগেনা।আপনি আমার সামান্য কিছু হলেই চিন্তা করেন।'

অধ্যায় 77 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!