কৃষ্ণকলি / অধ্যায় 2
সিজন 1 অধ্যায় 2 পারিবারিক ড্রামা #পারিবারিক মুহূর্ত #অসহায়ত্ব #আশ্রয় মায়া বাঁধন শাহনাজ বেগম অর্পিতা

সন্ধ্যা নামার অচেনা আশ্রয়

লেখক: অনামিকা ইসলাম অন্তরা 8 মিনিট পড়া 1,173 শব্দ
সন্ধ্যা নামার অচেনা আশ্রয়

বাঁধন চলে গেলে সেদিনের মত বাসায় ফিরে গেলাম। সারা রাত বাঁধনকে ভেবে ছটফট যন্ত্রণায় কাটল। ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে ঐ স্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে বাঁধন উন্মাদের মত হাঁটছিল গতকাল। সকাল থেকে দুপুর বাসা খুঁজার অজুহাতে ঘুরঘুর করেছি সে স্থান ও তার আশেপাশে। কিন্তু বাঁধনের দেখা আর মেলেনি।

একদিন, দু’দিন করে চলে যায় এক সপ্তাহ। বান্ধবী অর্পিতাকেও যে বিশাল বড় ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি সেটা ও মুখে না বললেও কাজে ঠিক টের পেতাম। বেশকিছুদিন আগে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরীর জন্য এপ্লাই করেছিলাম। রিটেনে ভালো’ই করেছিলাম। আল্লাহ, আল্লাহ করে যদি ভাইবাতে ভালো করতে পারি তাহলে চাকুরীটা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!

আর সে জন্য’ই অর্পিতার এখানে উঠেছিলাম। কিন্তু অর্পিতা বোধ হয় এই কয়দিনে’ই হাফিয়ে উঠেছে। আর তাই সেদিন ভাইবা দিয়ে এসে অর্পিতাকে বললাম,

আর একটা দিন অর্পি!

একটা দিন পর আমি বাসা পাই বা না পাই এখান থেকে চলে যাব। অর্পিতা করুণ স্বরে বলেছিল,

মায়া! আমি তোকে এভাবে যেতে দিতাম না। কিন্তু কিন্তু কি করব বল? আমার এত অল্প ইনকামে পরিবার চালিয়ে নিজেও চলা খুব কষ্টকর হয়ে যায়!!!

অর্পিতাকে আমার খরচ বাবদ কিছু টাকা দিয়ে পরদিন সকালে ওর বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। সেদিন সারাদিন হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও ভালো বাসার সন্ধান করতে পারিনি। ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বাসস্টপের ছোট্ট বেঞ্চে বসে যখন জীবন অংকের হিসাব মিলাচ্ছিলাম তখন’ই পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠে,

” শুনছেন___”

পিছনে ফিরে তাকালাম। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এ যে স্বয়ং বাঁধন দাঁড়িয়ে। চোখের জল লুকিয়ে বললাম, আপনি?!!!

কেমন আছেন?

এই তো আলহামদুলিল্লাহ! আপনি এখানে এভাবে!!!

— বাসা খু্ঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আজকে যেভাবে’ই হোক একটা বাসা ঠিক পেয়ে যাব, তাই বান্ধবীর বাসা থেকে একেবারে চলে আসছিলাম। কিন্তু____

পেলেন না’তো বাসা???

আমার নিরবতা দেখে বাঁধন বুঝে নিল বাসা খুঁজে পাওয়া যায় নি।

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল দেখে বাঁধন বলল, চলেন। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে চোখ’টা ফিরিয়ে নিলাম।

আমার পক্ষে আর ও বাসায় যাওয়া সম্ভব নয়।

কি করবেন তাহলে? এভাবে এখানে অসহায়ের মত বসে থাকবেন?(বাঁধন)

— থাকব।(আমি)

মিস ম্যাম! চারপাশ’টা দেখেছেন? সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আর আপনি দিনের শহর দেখেছেন, এখনো অবধি হয়ত রাতের শহর দেখেননি। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলে ফেললেন। সন্ধ্যা পর থেকে’ই এখানে বখাটেদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। আমি কি বুঝাতে চেয়েছি আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন!(বাঁধন)

বাঁধনের কথা শুনেও আমার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না দেখে বাঁধন বোধ হয় মনে মনে অবাক হয়েছিল। অবাক হওয়ার’ই কথা। আমি নির্বিকারচিত্তে সামনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছি,

আমি জানি বাঁধন! তুমি এই মুহূর্তে ঠিক ভাবছ? তুমি ভাবছ আমার কোনো ভয়-ডর নেই নাকি!

ভয় আমার ঠিক’ই আছে বাঁধন। কিন্তু তুমি পাশে থাকায় সেটা এখনো অবধি ভালো ভাবে ঝেকে বসতে পারেনি।

আমার দৃঢ়চিত্তে বসে থাকা দেখে বাঁধন আমায় কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল ঠিক তখনি ওর ফোন’টা বেজে উঠে। বাঁধন ওর ফোন রিসিভ করে।

এই তো মা রাস্তায়। ওকে, ওকে আসছি।

ফোন’টা রেখে বাঁধন আমার দিকে তাকালো।

কৃষ্ণকলি!!!

আমায় এখন যেতে হবে। বোন কোচিংয়ে। সেখান থেকে ওকে আনতে হবে। আপনি বরং আপনার বান্ধবীর বাসায় ফিরে যান।

বাঁধন মায়াকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে’ই ফোন কানে আসছি, আসছি বলে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মায়া দু’টানায় পরে যায়। কি করবে বুঝতে পারছিল না। বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াতে’ই ওর ফোন’টা বেজে উঠে।

ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল মায়া। তারপরে’ই মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে ওর। অবশেষে মায়ার চাকুরী’টা হয়ে গেছে। আর হাসি’টা সেই বিজয়ের’ই হাসি।

খুশিতে আত্মহারা হয়ে যখন আমি দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম তখন মনে হলো ওপাশ থেকে এক দোকানদার ডাক দিয়েছে আমায়। আশেপাশে কেউ ছিল না দেখে নিশ্চিত হলাম ওনি বোধ হয় আমায়’ই ডাক দিয়েছেন। আর তাই আমি টং দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানদার আমায় বেঞ্চে বসতে বলে আমার দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দিলেন। আমি চা খাই না বলে চুপচাপ বেঞ্চে বসে পরলাম। চায়ের কাপ পাশে রেখে দোকানদার আমার পাশে এসে বসলেন। তারপর বলতে লাগলেন__

” তুই বোধ হয় এই এলাকায় নতুন! তোর বোধ হয় এই এলাকা সম্পর্কে কোনো ধারনায় নেই। তাই এভাবে নির্ভয়ে এখানে হাঁটতে পারতেছিস।”

– দোকানদারের কথা শুনে এবার সত্যি সত্যি ভয় পাচ্ছি।

_ তোর বাড়ি কোথায়রে মা?

দোকানদারের আবেগী গলার কথা শুনে মনটা গলে গেল। সবটা খুলে বললাম ওনাকে। দোকানদার আমায় নির্ভয় দিয়ে বললেন, “তুই একদম চিন্তা করিস না মা। একদম কাঁদবি না। তুই শুধু এখানে ৫টা মিনিট বস। আমি তোকে বাসা খুঁজে দিব।”

কোনো কথা না বলে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলাম আমি। কিছুক্ষণ পর দোকানদার কাকে যেন বলল__

” আরে ভাবিসাব যে!

আসসালামু আলাইকুম।”

না তাকিয়েও বুঝে গেলাম কোনো মহিলা আসছে বোধ হয় সওদা করতে। মহিলাটি আমার পাশে এসে বসল বুঝতে পারলাম।

আমার চোখ দিয়ে তখনও অঝরে অশ্রু গড়িয়ে পরছিল বিপদের কথা ভেবে। আতংকে কলিজা শুকিয়ে আসছিল। মহিলাটি আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তারপর কি মনে করে যেন ফিরে আসল।

মহিলাটি আমার পাশে এসে পুনরায় বসল।

আমায় মাথায় হাত রেখে বলল__

” কোন মায়ের নাড়িছেঁড়া ধনরে তুই এখানে এভাবে অনাথের মত বসে কাঁদছিস। বাসা কোথায় তোর মা?”

বহুদিন পর নারী কন্ঠে ‘মা’ ডাক শুনে চোখ দুটো জলে ছলছল করে উঠল। অশ্রুভেঁজা নয়নে সামনের দিকে তাকালাম। এক অতিকায় সুন্দরী মধ্যবয়স্কা নারী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে চশমা, গায়ে চাদর। আমি ভদ্রমহিলার দিকে ঢ্যাব ঢ্যাব করে তাকিয়ে আছি। কিছু বলতে যাব তখন’ই দেখি বাঁধন। বাইকে করে একটা মেয়েকে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। বাঁধনকে দেখে আমার মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠল…….

দোকানের সামনে এসে বাঁধন বাইক রাখে। বাইকের পিছনে বসা মেয়েটি আচমকা ভদ্রমহিলাটিকে জড়িয়ে ধরে।

নালিশ করে বাঁধনের নামে। মহিলা ব্যস্তভাব নিয়ে বললেন,

পাজিটার বিচার বাসায় গিয়ে করব।

আগে দেখি তো আমার আরেক মা কেন কাঁদছে? কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা আমার দিকে এগিয়ে আসেন।

গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলেন,

বললে না তো মা তুই এখানে এভাবে বসে কাঁদছিস কেন???

আ…..মি…..

মুখ খুলতে যাওয়ার আগেই দোকানদার আমার মুখ থেকে কথা নেয়। ওনি বলা শুরু করেন,

” ভাবিসাব! এ আমার এক মা!

গ্রাম থেকে এসেছে চাকরীর খুঁজে।

চাকুরী ঠিক পেয়ে গেলেও কোনো বাসার সন্ধান পাইনি ও। আমি’ই ওকে এখানে বসিয়ে রেখেছি। ভেবেছিলাম দোকানপাট বন্ধ করে আপনার কাছে নিয়ে যাব ওকে। কিন্তু তার আগে’ই আপনি এসে গেছেন। এখন আপনি যদি আমার এই মা’টার জন্য কিছু করেন তাহলে বড় উপকার হতো। আপনি তো ভাড়াও দেন বাসা। যদি ওকে একটা রুম দিতেন.. ..?!!!”

দোকানি থেমে গেল এটুকু বলে।

মহিলাটি মিষ্টি হেসে বলল__

এভাবে বলবেন না ভাইজান! আপনার মা তো আমারও মা। আর ও ভাড়া কেন থাকবে? কোনো মেয়ে কি তার মা’কে নিজ বাসায় ভাড়া রাখবে???

ও আজ থেকে আমার এখানে’ই থাকবে। আমরা যা খায় তাই ও খাবে।

কি পারবি মা?

যাবি এই মায়ের সাথে???

কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম আমি। অজস্র জলরাশি চোখ থেকে গড়িয়ে পরছিল।

নাহ, এ জল বেদনার নয়!

এ জল আনন্দের।

এ আনন্দের জল। বহুদিন পর অচেনা কারো মাঝে মায়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তাই চোখ থেকে অজান্তেই সুখের দু’ফোঁটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পরছে……

কি হলো মা? যাবি না এ মায়ের সাথে?

মহিলাটির কথা শুনে চোখের অশ্রু মুছে নিলাম। মৃদু হাসি দিয়ে বললাম__

” যাব আন্টি….”

হুম, এবার তাহলে চল। রাত’তো অনেক হয়েছে। (ভদ্র মহিলা)

দোকানদারের থেকে বিদায় নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম।

এই হতচ্ছারা! এখানে দাঁড়িয়ে ফোন টিপবি নাকি বাসায় যাবি???(মহিলা)

ওহ, মা! লাগছে বলে পিছনে ফিরে তাকালো বাঁধন। আমায় দেখে চোখ বড় বড় করে বলল, আপনি???(বাঁধন)

জি, ও আজ থেকে আমাদের সাথে আমাদের বাসায় থাকবে। কেন? তুই চিনিস নাকি ওকে???(মহিলা)

না’তো…

আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল বাঁধন। পিছন থেকে ওকে অনুসরন করে অচেনা মা-মেয়ের সাথে এক অচেনা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম আমি।

অধ্যায় 2 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!