সকালে নিজের উপর তরল কিছু অনুভব করতেই জেগে উঠে বসে আমি। তারপর চারপাশে তাকিয়ে খালি রক্ত আর রক্ত। নিজের শরীরে থাকা জামাও রক্তে পরিপূর্ণ।
এইবার আমি “রক্ত, রক্ত” বলে চেঁচিয়ে উঠি। জোরে জোরে চেঁচাতে শুরু করি।
তখনই আরিশা আর রিংকি এসে আমায় জড়িয়ে ধরে।
.
— রিয়ানু শান্ত হো!! শান্ত হো!! এইটা রক্ত না। এইটা লাল রঙের পানি। (আরিশা)
.
— দেখ এইটা রক্ত না, লাল গুলালের সাথে মিশ্রিত পানি!!
.
আমি এইবার আস্তে আস্তে চোখ খুলতে শুরু করি। তারপর চারদিকে ভালো মতো চোখ বুলিয়ে দেখি সত্যি এইটা রক্ত নয়। খাটের পাশেই এক বালতির মধ্যে লাল পানি রাখা। এইবার আমার পরানে পরান ফিরে আসে। স্বস্তির এক নিশ্বাস নেই। কিন্তু তখনও হাত পা কাঁপা স্থির হয় নি আমার। মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। তা দেখে আরশি বলে,
.
— আমরা তো মজা করে এমন করেছিলাম! আমরা বুঝি নি রে তুই এত ভয় পেয়ে যাবি। সরি রেএ!! (আরশি)
.
— আ’ম রেইলি সরি রিয়ানু!! এইটা আমরা আইডিয়া ছিল যে তোকে রঙের পানি দিয়ে জাগিয়ে তুলবো। কিন্তু তুই যে এত ভয় পেয়ে যাবি তা বুঝি নি। (রিংকি)
.
— ইট ইজ ওকে গাইস। তোরা তো আর ইচ্ছে করে এইটা করিস নি, তাই না!! হুট করে এমন হওয়া ভয় পেয়ে গেছিলাম শুধু।
বাট তোরা ভিতরে কিভাবে আসলি??
.
তারা এইবার আমার কাছ থেকে সরে এসে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকায়। আর বলে,
.
— আর ইউ সিরিয়াস রিয়ানু?? তোর বাসার এক্সট্রা চাবি যে আমার কাছে তা কি ভুলে গেছিস? (আরিশা)
.
— উপস! সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম। জানি না কি হয়েছে আমার, আগের অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি আমি। খেয়াল থাকছে না অনেক কিছু!
.
— এখন যে কত কিছু ভুলবি!! তোর মাথায় তো এখন শুধু বিয়ে আর বিয়েই ঘুরছে। এখন তো তোর মনে শুধু ড. রিয়ান আর ড. রিয়ানই ঘুরবে শুধু। বাকি দুনিয়া দাড়ির কথা কি তোর মনে থাকবে। দুষ্টুমির সুরে। (রিংকি)
.
রিয়ান এর নাম শুনতেই আমার খেয়াল আসে যে তিনি কোথায়?? রাতে তিনি আমার সাথেই ছিলেন। তিনি কোথায় গেলেন? আরিশা আর রিংকি যদি তাকে এইখানে দেখে তাহলে তো কেলাঙ্কারি লেগে যাবে।
আমি চারপাশে আবার ভালো ভাবে চোখ বুলাতে থাকি। না তিনি তো কথাও নেই। গেল কই তাহলে!!
আমি যখন এইসব ভাবছি তখন রিংকি আমায় ঢাক্কা দিয়ে বলে।
.
— কিরে এখনো তার খেয়ালেই ডুবে আছিস!! আরেহ বইন আমাদের দিকেও একটু মন দে। কয়েকদিন পর তো এমনেই তুই তোর মেরিড লাইফে বিজি হয়ে যাবি এখন তো একটু আমাদের টাইম দে!! ( রিংকি)
.
— এই প্রথম তোর কথার সাথে সহমত আমি। (আরিশা)
.
— হুম বুঝলাম। যা এখন থেকে আর কিছু ভাববো না। আমার পুরো সময় এখন তোদের যা।
.
দুইজনেই একসাথে “ইয়েএএএ” বলে উঠে। তারপর আবার আমায় জরিয়ে ধরে। আমি এইবার বলি,
— আরেহ বাবা ছাড়!! পুরো ভিজা আমি। চেঞ্জ তো করতে দে!!
.
ওরা আমায় ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দিকে তাকায়। তারপর আরিশা বলে।
— ইসস পুরো ভিজে গিয়েছি!! এখন চেঞ্জ করতে হবে। (আরিশা)
.
— আমারও রে দোস্ত।( রিংকি)
.
— আচ্ছা তোরা যা পাশের রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আয়। ততোক্ষনে আমিও ফ্রেশ হয়ে আসছি।
.
দুইজনেই আচ্ছা বলে আমার রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আমিও ফ্রেশ হতে চলে যাই। ফ্রেশ হতে নিলে ডান হাতে দেখি কিছুটা রক্তের দাগ। পড়ে ভাবি রঙের দাগই মনে হয়। শুকিয়ে গেছে তাই এমন লাগছে।
ফ্রেশ হয়ে এসে হাতে মোবাইল নিতেই মোবাইল টুং করে শব্দ করে উঠে।
মোবাইল অন করে দেখি রিয়ানের মেসেজ। মেসেজ অপেন করে পড়তে শুরু করি।
.
” ❤আসব রাতে স্বপ্ন হয়ে
থাকব আমি কাছে।
চোঁখ খুলতেই চলে যাব
ভোরের আলোর দেশে।
মাঝে শুধু রয়ে যাবে
তুমি আর আমি।❤”
.
এইটা পড়া শেষে আরেকটি এসএমএস চলে আসে।
.
“আমায় খুঁজচ্ছো বুঝি!! চিন্তা করো না ঠিক আছি। আসলে আজকে সকালে একটা অপারেশন ছিল তাই ভোর বেলায় বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। তোমায় একবার জাগাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার সেই স্নিগ্ধ শীতল চেহেরা দেখে আর জাগাতে ইচ্ছা করে নি। তাই না বলেই এসে পড়েছি।
টাইমলি নাস্তাটা করে নিও। লাভ ইউ❤ ”
.
মেসেজটি পড়ে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে। লোকটি যে আমায় অনেক বেশি ভালবাসে তার প্রতি আমার কোন সন্দেহ নেই।
হুট করেই উপরে মেসেজের দিকে নজর যায়। রিয়ান যে এমন ছন্দও বলতে পারে তা আমার জানা ছিল না। কিন্তু ছন্দটা থেকেই আমার সেই ফুল পেরকের কথা মনে পড়তে থাকে।
তখনই রিংকি আর আরিশা রুমে চলে আর আমার এই ভাবনার ইতি সেখানেই ঘটে যায়। তারা এসেই নাস্তার জন্য তাড়া দিতে থাকে। তারা নাকি নাস্তা নিয়ে এসেছে একসাথে খাবে বলে। আমাকে প্রায় এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেল তারা।
.
.
??
.
নিজের কেবিনে বসে আছে রিয়ান। তার চক্ষু দৃষ্টি এতক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনে চলা সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে থাকা তার রিয়ুপাখির উপর ছিল। কিন্তু এখন সে তার চক্ষু দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে নিজের বা হাতে থাকা “রিয়ানার” নামটির দিকে নিক্ষেপ করে।
নামটি একদম রক্তবর্ন হয়ে আছে। কোনায় কোনায় এখনো রক্ত জমাট বেঁধে আছে। যা ভাবছেন ঠিক তাই। রিয়ান কালকেও নামটি আবার ছুড়ি দিয়ে নতুন ভাবে লিখেছে।
[রিয়ানা ডান হাতে তখন রিয়ানের এই রক্ত লেগেছিল। কিন্তু ও তা রঙ মনে করে যার জন্য সে ততোটা গুরুত্ব দেয় না। ]
.
রিয়ান তার বাম হাতে ঠোঁট ছুঁয়ে বাঁকা হাসে।৷ তারপর বলে,
— যা দেখবে তা শুধুই ধোঁয়াশা। যা বুঝবে তা শুধুই মিথ্যে। মিথ্যে আর ধোঁয়াশার এই সংগমনে তৈরি হবে এক গোলক ধাঁধা। যার তীর সীমানায় থাকবো শুধু আমি আর আমি।
এই আমি নামক পিঞ্জারাতে খুব জলদি বন্দী হতে চলেছ তুমি রিয়ুপাখি। দ্যা গেম ইজ জাস্ট বিগেন। বাঁকা হেসে।
.
[ রিয়ানের এই রুপটাকে কে কে মিস করছিলেন হাত তুলেন। লেখিকা ম্যাম ( আমি কিন্তু অন্য কাউকে আবার মনে কইরেন না) তাদের দেখতে চায়।?]
.
.
??
.
দুপুরের খাবার শেষে রিংকি আর আরিশার সাথে মার্কেটে আসি, বিয়ের জন্য টুকটাক জিনিস কিনা কাটার জন্য। রিংকি আর আরিশা একের পর এক দোকানে ঘুরেই চলছে। তাদের নাকি এইসব কোন কিছুই ভালো লাগছে না। তাদের একদম ইউনিক কিছু চাই।
বুঝেন এই তো বিয়েতে নিজের চেয়ে বেস্টফ্রেন্ডদের শখ বেশি থাকে। একেক জনের একেক প্লেন।
কিনা কাটা করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। যেই না মার্কেট থেকে বের হতে নিব তখনই রিংকির মনে পড়ে যে সে লিপস্টিক কিনতে ভুলে গেছে।
কথাটা শুনে মেজাজ চটে গেল। আমি বলে উঠি,
.
— ওই বান্দরনী!! তোর কি লিপস্টিকের অভাব পড়সে? মাসে ৪০ টা লিপস্টিক কিনস তাও মন ভরে না তোর??
.
— বইন তোর এই প্রথম বিয়া, বুঝিতাসোস কতটি ফাংশন!! আমি মোটেও একটা লিপস্টিক সেকেন্ড টাইম কোন ফাংশনে পড়তে চাই না। একেক ফাংশনে একেক কালার পড়বো আমি। আর তাই আমার লিপস্টিক কম পইড়া যাইবো। যদি শেষ হয়ে যায়? তাই ব্যাকআপ কিনে রাখছি। (রিংকি)
.
— আচ্ছা সবই বুঝলাম কিন্তু আমার প্রথম বিয়া মানে কি?? তুই কি আমার বহুবিবাহ করাবি নি। ভ্র কুচকিয়ে।
.
— আসতাগফিরুল্লা!! কি বলস এইটি!! তোবা তোবা!!
তুই কেমনে পারলি এমন দোষ আমার উপর লাগাইতে। লজ্জা করলো না তোর একবারও? ভাবলিও না এই কথাটা আমারে কতটা হার্ট করবো?? নেকা কান্না শুরু করে। (রিংকি,)
.
— রিয়ানু কারে কি বলস তুই?? এই স্টার জলসার দোকানরে কিছু বলাই মানে লাইভ স্টার জলসা দেখা। ওর কথা ছাড় তো। (আরিশা)
.
— হুহ!!
.
— তুই লিপস্টিক কিনবি তো আয় আমার সাথে আয়!! তোর লিপস্টিক চুস করতে হেল্প করুম নে। ( আরিশা)
.
— তুই আমার জান্টুস। আমার পরান জিগারেএ দোস্ত। লাভ ইউ উম্মাহ। (রিংকি)
.
— দুরে থাক। তেল দিতে হইবো না। ওই রিয়ানু তুই যাবি নাকি দাড়াবি?? (আরিশা)
.
— একা দাড়িয়ে আর কি করবো চল।
.
অতঃপর একটা দোকানে গিয়ে দাড়াই আমরা। রিংকি একের পর এক লিপস্টিক দেখেই চলেছে। আমি পাশে দাড়িয়েই তা দেখছি।
এক সময় আমার প্রচন্ড পিপাসা পেতে শুরু করে। পানির বোতল বের করে দেখি খালি। তাই আমি ওদেরকে বলে পানি নেওয়ার জন্য বেরিয়ে আসি।
পানি কিনে তা খুলার চেষ্টা করতে করতে হাটতে শুরু করি। হুট করেই কাউরো সাথে ধাক্কা খাই। হাতে থাকা পানির বোতল আর ব্যাগটা পড়ে যায়। আমি “সরি” বলে দ্রুত নিচে বসে সে গুলো তুলতে শুরু করি। সেই ব্যক্তিটিও নিচু হয়ে কয়েকটা ব্যাগ উঠিয়ে দেয়।
সব উঠিয়ে মাথাটা উঁচু করে যেই না তাকে থেংক ইউ বলতে যাব তখনই তার চেহারা দেখে আমি থমকে যাই।
তাকে দেখে ভয়ে শরীর হাত-পা সমানে কাঁপতে শুরু করে। গলা শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে যায়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়। সেই ব্যক্তিটি আমায় দেখে বিদঘুটে হাসি হাসছে। যা আমার শরীরে কাটার মত বিদছে। নড়ার শক্তি পর্যন্ত পাচ্ছি না।
আমি কোনমতে একটু পিছিয়ে এক দৌড়ে সেখান থেকে চলে আসি। সেই ব্যক্তিটি এখনো সেই একই জায়গায় দাড়িয়ে বিদঘুটে হাসি হেসেই চলেছে।