কলেজের পাঠ চুকলো বেশ কিছুক্ষণ।চার বন্ধু-বান্ধবী কলেজের মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে মন প্রাণ উজাড় করে।মেঘলা আবহাওয়ায় চলমান তীব্র পবনের ঝটকায় আড্ডা চালিয়ে যেতে বেশ লাগছে তাদের।আগামীকাল দুআ এবং রামিসা ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবে।তাই কয়েকদিনের যেই আড্ডা বাদ যাবে,সেটা আগে থেকে যেনো পুষিয়ে নিচ্ছে তারা।কলেজ ইতিমধ্যে জনশূন্যে পরিণত হচ্ছে।অনার্সের শিক্ষার্থীগণ তাদের শ্রেণী কার্যকলাপের জন্য ভবনের ভেতরে।তাই কলেজের চারিদিকের পরিবেশ বেশ শান্ত।
মনের খোরাক মিটিয়ে আড্ডা দেওয়া শেষ হলে চারজন বেরিয়ে পড়লো কলেজের আয়তন থেকে। সামনের দিকে কিছুটা এগোতেই দুআ সবার উদ্দেশ্যে বললো,
–“ফুচকা চলবে নাকি?”
–“চলবে মানে,দৌড়াবে আজব!”
মাহির কথায় হাসলো সবাই।কলেজের থেকে অল্প দূরত্বের সেই ছোট দোকানে ভিড় জমালো চারজন।ফুচকা আসা অব্দি আবারও তারা আলোচনায় ব্যস্ত হলো।মাহি টেবিলে একহাতে ভর চেপে দুআকে প্রশ্ন করলো,
–“তুই আমার আগেই ইয়াদুকে দেখে ফেলবি। তাই না?”
–“উনি আমার দেখা পাওয়ার জন্যে বাসায় বসে থাকবে?উনার খেলা নেই বুঝি?তাছাড়া উনার সাথে দেখা করার আমার কোনো তলব নেই।আমার যতো তলব হলো,ঢাকায় ঘুরাঘুরি করা।”
দুআ নেত্রযুগলের আয়তন ছোট করে জবাব দিলো।
–“ইসস,চাঁদের বাচ্চা! তুই কি জানিস,ইয়াদ ভাই এখন ছুটি কাটাচ্ছেন? তার বাসায় গেলে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ৮০%।আর আমি ভাইকে বলেই রেখেছি,আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।ভাই কি জবাব দিলো জানিস?”
দুআ মাথা নাড়ালো রামিসার কথায়,
–“আমি কিভাবে জানবো?আমি কি মনোবিজ্ঞানী?”
–“ইয়াদ ভাই বললো,ভাই অবশ্যই বাসায় থাকবে।কতো মাস পর আমার ভাইকে দেখবো!”
রামিসা দুই হাত এক করে আকাশের পানে তাকালো।মুখে তার মিষ্টি হাসি।
–“তুই কেনো এত খুশি হচ্ছিস,রামিসা?এমন ভাব করছিস ইয়াদের সাথে তোর দেখা হয় না?একটা মানুষ কিভাবে এতো নাট্যকার হয়?”
সঞ্জয় মুখ ভেংচি দিলো রামিসার পানে চেয়ে।
–“ঐ চুপ সবাই! বর্তমানে আমি জেলাসিত।দুআর উপর আমার হিংসা হচ্ছে।”
মাহি দাঁতে দাঁত চাপলো।
দুআ তার সরু ভ্রুযুগল নিলো কুঁচকে।মাহির কথা তার বোধগম্য হলো না,
–“আমি কি করলাম?”
–“আমার পূর্বে তুই কেনো দেখবি ইয়াদুকে?”
মাহির এমন প্রশ্নে দুআ মুখ ফসকে সেদিনকার ঘটনার কথা বলেই দিচ্ছিলো,এর পূর্বে নিজেকে সংযত করলো সে,
–“ইয়াদ কোন ক্ষেতের মূলা আবার?উনার সাথে দেখা করলে কি আমাকে পরীক্ষায় এ’প্লাস দিবে?নাকি আমাকে বড় কোনো পদে চাকরি দিবে?কিসব কাপজাব মার্কা কথা বলিস মাঝে মাঝে এটাই আমি বুঝিনা।”
দুআ নিজের দৃষ্টি লুকালো সবার অগোচরে।মনে মনে যে জপলো,
–“দেখা তো অনেক আগেই হয়েছে তোর ইয়াদের সাথে।কিন্তু আফসোস,আমরা দুইজনই দুইজনের কাছে আগুন্তক ছিলাম।দেখা হলে,একটা সুযোগ থাকবে কৃতজ্ঞতা জানানোর।”
কিন্তু আবারও সে পরক্ষণে ভাবলো,
–“উনি আমাকে চিনবেনই না।আর আগ বাড়িয়ে কথা বলা আমার রুচিতে নেই।এতো ব্যস্ত মানুষের কি সেই ঘটনার কথা মনে থাকবে?উহু,একদমই না।দেখা যাবে,আগ বাড়িয়ে কিছু বললে আমারই দুর্নাম হবে।আর দুআ কখনো নিজের দুর্নাম করাতে চাই না।মরে গেলেও না।ইয়াদ এর ব্যাপারটা চেপে যাওয়া ভালো।উনার সাথে দেখা হলেও আমার কিছু যায় আসে না।”
দুআ অন্যমনস্ক।এর মধ্যেই সঞ্জয়ের চেঁচামেচিতে কেঁপে উঠলো সে।
–“শালা,এতো কি ভাবিস?তোর তো প্রেমের কোনো তৃষ্ণা নেই।অর্থাৎ, তুই কোনো ছেলে নিয়ে ভাবছিস না।তাহলে ভাবছিস কি নিয়ে?”
–“ঐ,তোর জন্যে কি ও কিছু ভাবতে পারবে না?সঞ্জয়ের বাচ্চা তোর সমস্যা কি?”
রামিসা ক্ষেপলো।
–“আজব,সমস্যা কি তোদের?”
মাহির পাল্টা প্রশ্ন।
দুআ নিজের কানে হাত রেখে সজোরে বলে উঠলো,
–“ফুচকা গিল চুপ করে।নাহলে সব আমি সাবাড় করছি!”
–“আফা,মেজাজ ঠান্ডা গরো।”
রামিসা দুআর মাথায় হাত রেখে চাটগাঁ ভাষার ব্যবহার করলো।আর এই শুনে “হি হি” করে হাসির রোল পড়লো সকলের মাঝে।দুআর বেজার মুখখানাও অট্টহাসিতে রাঙা হলো।
ফুচকা খাওয়া শেষে সবাই বেরিয়ে পড়লে,দুআর নজরে এলো তার গাড়ি।রামিসা তার সমেত যাবে আজ তারই বাসায়।কিন্তু, দুআ দু কদম সামনে দিতেই তার সম্মুখে এক পুরুষ এসে হাজির হলো।দুআ চমকে আগানো দু কদম আবারও পেছালো,অতঃপর সে গিয়ে ঠেকলো মাহির সাথে।
–“আপনি কে?”
সঞ্জয় প্রশ্ন ছুঁড়লে লোকটা হাসিমুখে বলে উঠলো,
–“আমি ইশফাক।তোমরা এই কলেজে পড়ো?”
মাহি নিজের এপ্রোনের একপাশে কলেজের লোগো দেখিয়ে জবাব দিল,
–“সেটাই তো মনে হচ্ছে।আপনি বোধ হয় অন্ধ!”
ইশফাক হচঁকিয়ে উঠলো।এমন কথার জবাব সে আশা করেনি,
–“অন্ধ না।অন্ধ হলে, এতো মোহনীয় মেয়ের সন্ধান পেতাম কিভাবে?”
দুআর দিকে ইশফাক এর নজর।দুআ সেই নজর লক্ষ্য করে একটু নোংরামির আভাস পেলো।ছেলেটার নজর দুআর পছন্দ হয়নি বৈকি।
–“এইসব বলে লাভ নেই।এই দুআ চল তো।”
রামিসা তাড়া দিয়ে বললো।
–“মিস,দুআ।আমার কথাটা যদি একটু শুনতে!”
দুআ বন্ধুদের বা পরিবারের সামনে যতো প্রাণবন্ত,
বাহিরের মানুষের সামনে ততোই বেশি ভীত এবং চুপচাপ প্রকৃতির রূপ ধারণ করে।তাও কাহিনী আগে যেনো না গড়িয়ে যায়,সেই ভেবে দুআ স্ফীত স্বরে বললো,
–“আমি বাহিরের লোকের কথা শুনতে চাই না।”
–“তুমি চাইলে আমি বাড়ির লোক হতে…”
ইশফাকের কথা শেষ হওয়ার পূর্বে মাহি চেঁচিয়ে উঠলো,
–“আস্ত লুচ্চা লোক তো আপনি!”
দুআ মাহির হাত চেপে ইশারা করলো,চুপ থাকতে।এর মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে এলো দুআর বাবার এক কর্মচারী,
–“ছোট আম্মাজান,কোনো সমস্যা হইসেনি?অনেক্ষণ ধইরা দেখি এই লোক এইহানে।প্রথমে স্যার ভাইবা নামলাম না।এহন দেহি!”
লোকটা এক ভ্রু কুঁচকে ইশফাকের দিকে তাকালে ইশফাক ভয় পায়।কৃষ্ণ বর্ণের লোকটাকে তার হিংস্র মনে হলো।নিজের মান সম্মান এবং প্রাণ বাঁচাতে ইশফাক মনে করলো, এইখান থেকে কেটে পড়াই উত্তম!দুআর দিকে আবারও তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে সে দ্রুত পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো।
–“ঐ বেডা!”
–“থামো চাচা।আমি ঠিক আছি।চলো যায়!”
দুআ সেই কর্মচারিকে থামিয়ে দিলো।বাড়তি ঝামেলা দুআর সর্বকালের অপ্রিয়।মাহি আর সঞ্জয়কে পুনরায় বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো দুআ এবং রামিসা।
দুআ বেশ ধীর গলায় কয়েক শব্দ রামিসার উদ্দেশ্যে ব্যক্ত করলো,
–“এইসব কথা মাইশা আপুকে একদম বলবি না।আপু জানলে ভাইয়ার কানে যাবে আর ভাইয়া ঠিকই এই ছেলের খোঁজ করে কথাটা আরো বেশি বিগড়ে ফেলবে।আর বাবা জানলে তো কথায় নেই।”
–“চাপ নিস না।আমি কিছুই বলবো না।”
দুআর বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো নিঃশ্বাস।
রামিসা দুআকে সাহায্য করলো ব্যাগ গোছাতে।তারা পাঁচদিনের সফরে যাচ্ছে ঢাকায়। রিজোয়ান এবং তার মামা হোটেলে অবস্থান করলেও,দুআ; রামিসা এবং তার মায়ের সাথে আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করবে।এই বিষয়ে দুআর মা এবং বাবাকে রাজি করাতে স্বয়ং রামিসার মা এসেছিল তাদের বাসায়।রামিসার পরিবারের প্রতি অগাধ বিশ্বাস তাদের।এছাড়াও রিজোয়ান তার ভরসায় দুআকে ছাড়ার অনুমতি দিতে বললো তার চাচাকে।সবকিছুর ঊর্ধ্বে মেয়ের খুশির কথা বিবেচনা করে জমিদার তার মতামত পরিবর্তন করেনি।মেয়েকে সবার ভরসায় ছাড়ার সাহস দেখালেন উনি।অবশ্য,সকলেই জানে;দুআর কিছু হলে জমিদার কাউকেই ছেড়ে দিবে না।
সকালে উঠে তৈরি হলো দুআ।সব সময়ের মতো লম্বা হাতার কামিজ পরিধান করলো সে।সুন্দর এই গোলাপী রঙের কামিজে দুআকে চমৎকার লাগছে। গত বছর ইদে এই জামা সে শহর থেকে কিনেছিলো।এমন অনেক কামিজ সে ব্যাগে নিয়েছে নানাদিক ঘোরার পরিকল্পনা করে।মাথার তালুতে ওড়না আটকে দুআ তার মাকে ডাকলো।আহেলি মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলো মেয়ের রূপের বর্ণনা দিয়ে।দুআ নিজের মায়ের কথায় মুচকি হাসছে।তার মায়ের চোখে সে যেনো সবচেয়ে সুন্দরী নারী!কাজের মেয়েকে ডেকে দুআর ব্যাগ নিচে নেওয়ার নির্দেশ দিলো আহেলি।দুআ মায়ের হাত চেপে নিচে নামছে।
সকলকে বিদায় জানিয়ে রিজোয়ান এবং দুআ গাড়িতে উঠে পড়লো।অসুস্থ দুআর কাকিমা দুইতলা থেকেই হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়েছে তাদের। রিজোয়ানের এই বড় গাড়ি করে সবাই ঢাকায় পাড়ি জমাবে।এই মুহুর্তে তারা যাচ্ছে রামিসার বাসায়।সেখানে তার মা এবং রামিসা উঠে পড়বে রিজোয়ানের গাড়িতে।
গাড়ি থেমে রইলো গেইটের সামনে।দুআ পেছনের সিটে বসে দৃষ্টি জ্ঞাপন করে আছে রামিসার বাসার পানে।
আকাশটা মেঘলা আজও।বর্ষাকালের আগমন যে হতে চলেছে!এই গুমোট আকাশ যেনো একমুঠো বর্ষণের অপেক্ষায় আছে!হালকা পবনের ঝটকায় দুলে যাচ্ছে গাছের পাতা,রাস্তার কাগজ এবং ময়লা। রামিসা দুআর দৃষ্টিতে এলে দুআর হাসি চওড়া হয়।কিন্তু হাসিটার ক্ষণকাল, বেশিক্ষণ হলো না।রামিসার মায়ের পিছনে তার কাকী তথা তাসনিমকে দেখে দুআর মনটা বিষাদে পূর্ণ হলো।এই মহিলাকে দুআ প্রচণ্ড ভয় পায়।এই বাড়িতে আসলে মহিলাটা সকলের আড়ালে দুআকে নানান ভাবে হেনস্তা করে।এতমাস যাবত এই মহিলা তার বাপের বাড়ি ছিলো, বিধায় নির্দ্বিধায় দুআ রামিসার বাড়ি আসতো।
এই মহিলা কবে ফিরেছে এটা কেনো রামিসা তাকে জানায়নি, এটাই দুআ ভেবে কুল পাচ্ছে না।অত্র মহিলার খারাপ ব্যবহারের কথা দুআ শুধু রামিসাকে জানিয়েছে। যার দরুণ,এই বাড়িতে দুআ এলে রামিসা সর্বদা তাকে রক্ষা করে।তারপরও কিভাবে যেনো সুযোগ বুঝে এই মহিলা দুআকে কটু কথা শুনিয়ে দেয়! এইদিকে রামিসার পরিবারের মান-সম্মান খোয়ানোর ভয়ে ব্যাপারটা সে তার পরিবারকে কখনো জানায়নি।
সকলে গাড়িতে উঠে পড়লে গাড়ি চলতে আরম্ভ করলো।
–“তাসনিম কাকী কবে ফিরলো?”
–“আজ ভোরেই।দেখি ব্যাগ নিয়ে হাজির।অদ্ভুত মহিলা।তুই ভাবিস না।আমি তোর সাথে সাথেই থাকবো।”
দুআর কথার জবাবে রামিসা উত্তর দিলো।
–“ওহ।দজ্জাল মহিলাকে খুবই ভয় করে আমার।তোর আত্মীয়ের বাসায় আমায় হেনস্তা করলে আমি তো শেষ,রামিসা।”
দুআর ভীত কণ্ঠ।
–“আরে,রিজোয়ান ভাই আছে।উনি আত্মীয়ের বাসায় তোর দিকে ভয়ে চোখ তুলেই দেখবে না আমার দুলাভাইয়ের জন্যে।দুলাভাই কেমন সেটা কাকী ভালো জানে।”
দুআ নিঃশ্বাস ছাড়লো।কেমন যেনো শূন্য শূন্য লাগছে তার এই তাসনিম নামের মহিলার আগমনে।
কিছুদূর পথ যেতেই দুআ নিদ্রায় শায়িত হলো।রামিসা খুবই যতনে দুআকে নিজের কোলে শায়িত রেখেছে।রাস্তাভর এই মেয়ের দেখভাল করে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো রামিসা।এর একটাই কারণ,গতবারের দুআর ঢাকায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা!
মধ্যরাতের অন্তিম কালে ঢাকায় পৌঁছে তারা রামিসার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলো।তাদের নামিয়ে দিয়ে রিজোয়ান তার মামার সমেত চলে গেলো হোটেলে।
যাওয়ার পূর্বে সে বারংবার রামিসার মা এবং তাসনিমকে দুআর খেয়াল রাখতে বলেছে।তাসনিম হিংসুক মুখে দুআর দেখভাল করার আশ্বাস দিলো রিজোয়ানকে।
মাথায় তীব্র যন্ত্রণা আড়াল করে হাসিমুখে সবার সাথে আলাপ করছে দুআ।তাসনিমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে বাঁচতে অল্প কিছু খাবার খেয়ে রামিসাকে নিয়ে তাদের জন্যে নির্ধারণ করা কামরায় চলে এলো সে।
–“খারাপ লাগছে,চাঁদ?”
–“মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে রে।প্রচুর যন্ত্রণা।”
দুআ অসহায় ভঙ্গিতে বললো।
–“আম্মাকে বলবো?”
–“নাহ।দোহায় লাগে তোর।তাসনিম কাকী জানলে আমাকে সবার সামনে জলিল করবে।একটু মাথা টিপে দে।”
–“আয়।”
রামিসা দুআর মাথায় অল্প পানি দিয়ে আলতো হাতে মাথায় মাসাজ করতে আরম্ভ করলো।ঢাকার পরিবেশটা আজ গুমোট লাগছে দুআর।যেনো আকাশ চিরে এখনই ভয়ংকর কিছুর আগমন হবে! হলোই তা। গুড়ুম করে তীব্র শব্দ হলো বজ্রপাতের।বদ্ধ চোখ জোড়া খুলে ফেললো দুআ।আলোর ঝলকানি তার দৃষ্টিতে এলো।আবারও শব্দ হওয়ার পূর্বে দুআ নিজের কানে হাত রাখলো।মিনিট দু’এক পরেই ঝরঝর করে নামলো গগণ থেকে পানির ধারা।বদ্ধ কাঁচের জানালা দিয়ে দুআ বৃষ্টির পানির আগমন দেখছে।এই মুহূর্তে সে যদি তার বাড়ি থাকতো,তবে রুমের বড় ব্যালকনিতে গিয়ে পা ভেজাতে একটুও দেরী করতো না!দুআর ভাবলেশহীন দৃষ্টি এখনো কাঁচের জানালায় আবদ্ধ।
________________________
ছাদে ক্রিকেট অনুশীলন শেষে ইয়াদ সোজা এলো নিজের রুমে।আজ অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ক্লান্ত সে। কাল রাতে ভারী বর্ষনের কারণে মাঠের অনুশীলন আজ বাদ পড়েছে।অগত্য সকালের নিদ্রা থেকে সজাগ হয়ে এই খবর পেয়ে সে ছাদে চলে গেলো অনুশীলন করতে।ইয়াসির তার সাথে দেখা করবে জানালে,ইয়াদ জানালো তাকে বাসায় আসতে।
গোসল সেরে বেরুতেই ইয়াদ অনুভব করলো তার ব্যালকনিতে অন্য কারো উপস্থিতি। ঘাড়ের উপর থেকে তাওয়াল সরিয়ে ইয়াদ দ্রুত বিছানায় রাখা তার টিশার্ট জড়িয়ে নিলো গায়ে।ব্যালকনিতে গিয়ে ইয়াদের আঁখি বিস্ফোরিত হলো যেনো।অল্পবয়সী এক মেয়ে তার ব্যালকনির পানি পরিষ্কার করছে।ইয়াদ প্রচুর বিরক্ত এমন দৃশ্য দেখে। বিনা অনুমতিতে তার রুমে প্রবেশ করা,সে সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ বলে মনে করে।না চাওয়া সত্ত্বেও সে মেয়েটিকে ধমক দিলো,
–“এই মেয়ে কে তুমি?”
মেয়েটা ভয় পেলো যেনো! চমকে উঠে হাতে থাকা বালতি শব্দ করে নিচে রাখলো।ইয়াদকে এমন সরাসরি দেখে মেয়েটার চোখ চড়কগাছ।ভেবেছিলো ইয়াদের সাথে সে রসিক ভাব জুড়বে।তার সাথে ছবি তুলে বস্তির সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবে।কিন্তু, মেয়েটার স্বপ্ন যে কোনোদিনও পূরণের নয়!মেয়েটাকে চুপ থাকতে দেখে ইয়াদ একহাত বাঁকিয়ে আবার তাকে প্রশ্ন করল,
–“কি?আকাশ থেকে টপকে পড়েছো?”
ইয়াদের গমগম শব্দে মেয়েটা যেনো এখন কেঁদেই দিবে।কোনোভাবে নিজেকে সামলে সে তিন লাইন বলতে সক্ষম হলো,
–“বড় আম্মা কইলো সব রুমের বারান্দা থেকে পানি পরিষ্কার করবার জন্যে।আমি সব রুম ধারাবাহিক ভাবে পরিষ্কার কইরা ফেলাইছি।এটাই শেষ রুম আছিলো।”
–“আমার অনুমতি ছাড়া রুমে এসেছো কিভাবে? আম্মি বলেছে আমার রুমে আসতে? আম্মি, আম্মি?”
ইয়াদ শেষ বাক্য আওড়াতে আওড়াতে রুম থেকে বের হলো। ডালিয়া ছেলের ডাকে নিজের রুম থেকে গমগমে বেরিয়ে,এগিয়ে আসলো ছেলের কামরার দিকে,
–“আব্বা,কি হয়েছে?”
এর মধ্যে অনন্যা ইয়াদের রুম থেকে বালতি হাতে বেরিয়ে এসেছে।ইয়াদ সেদিকে লক্ষ্য করে চোখ বুঁজে নিলো। দাতে দাঁত চাপলো সে,
–“এই মেয়ে আমার রুমে কি করে?তুমি জানো,আমার রুমে কেউ নক করে না আসলে আমার মেজাজ খারাপ হয়।এই মেয়ে..!”
ইয়াদ আর কিছু বলল না।রাগে তার শরীর যেনো তরতর করছে। ডালিয়া ছেলের এমন কান্ডে চুপ করে রইলেন।তিনি জানেন ইয়াদের বানানো নিয়মে ব্যাঘাত ঘটলে ইয়াদের রাগের সীমা থাকে না।তাও ইয়াদকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করে তার মা বললো,
–“মেয়েটা নতুন এসেছে কাজে।আমার অনুমতি নিয়েই সবার ব্যালকনি সাফ করতে গেলো।গত দুইদিনের বৃষ্টিতে ব্যালকনি স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যাচ্ছিল,তাই!”
–“আম্মি,আমার নিয়মটা মেয়েটাকে জানিয়ে দিও।আর প্লিজ,এইসব ব্যাপারে একটু খেয়াল রাখবে।অযথা কেউ আমার রুমে আসুক,এটা আমি চাই না।অন্তত আমি থাকা অবস্থায় না।আমার রুম পরিস্কার করতে হলে আমার অবর্তমানে করতে বলবে।”
ইয়াদ রুমে যাওয়ার জন্যে উদ্যত হলে দেখে,মেয়েটা দরজার সামনে সটান দাঁড়িয়ে রইলো।
–“মুভ!”
ইয়াদের কথা বুঝতে না পেরে অনন্যা ভেলকার মতো চেয়ে রইলো তার দিকে,
–“হো?”
ইয়াদ মুখে “চ” উচ্চারণ করতেই ডালিয়া অনন্যাকে বললো,
–“এইদিকে সরে আয়।”
অনন্যা সরে এলো।ইয়াদ রুমে প্রবেশ করে সশব্দে বন্ধ করলো দরজা। অনন্যা বুকে হাত চেপে জোরে দম ফেললো,
–“মাগো মা।ডরাইছি।”
–“ইয়াদের রুমে যাবে না তুমি।যখন প্রয়োজন আমার নির্দেশে যাবে।ছেলেটা তার নিয়মের ব্যাঘাত একেবারেই পছন্দ করে না।”
–“ওরে মা,আমার বয়েই গেলো আর ইয়াদ সাহেবের সামনে আইবার!আমার সখ মিইটা গেছে এই আগুনের গোল্লার সামনে আইসা।”
ডালিয়া শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে হাসলো অনন্যার কথায়।