এয়ারপোর্টে বসে ঘুমু ঘুমু চোখে হাই তুলছি আর তায়াং ভাইয়াকে বিরবির করে বকছি।এই সাত-সকালে কার ভালো লাগে ঘুম ছেড়ে এখানে বসে থাকতে।তায়াং ভাইয়ার কোন জানে জিগার দোস্ত নাকি আজকে আসবে।তার জন্য ভাইয়া আমাকে সকালে ফজরের নামাজ পরে আর ঘুমাতেই দেইনি।আমার লাগছে বিরক্ত। কোথাকার কোন লাট সাহেব আসবে তার জন্য আমাকে কেন আসতে হবে? তোর বন্ধু আসবে তাই তুই আসবি।তা না করে আমাকে ও বাজিয়ে নিয়ে আসছে।আমি একা আসবো কেন?তাই সাথে তন্বীকেও নিয়ে এসেছি।আমি এয়ারপোর্টে বসে ঝিমাবো আর তন্বী বাসায় ঘুমাবে, তাতো হতে দিতে পারি না আমি।তাই তায়াং ভাইয়াকে বলে জোর করে ওকেও নিয়ে এসেছি।
পৃথিবীতে তিনটা কাজে আমি অনেক বেশি এক্সপার্ট। ১.ত্যাড়ামি করায় ২. ব্লকমেইল করায় ৩. ঘুমাতে।এই তিনটার মধ্যে ঘুম আমার ভীষণ পছন্দ। বাকি সব গোল্লায় যাক ঘুম আমার সবার আগে। সেই ঘুম ভাঙিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। একবার ডিপলি চিন্তা করেন তো, এসব কি মানা যায়? তন্বীও আমার সাথে বসে ঝিমোচ্ছে। ওকে ধাক্কা মেরে বললাম,
—- কোথাকার কোন নবাবজাদা আসবে রে তন্বী?আমার কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না। তায়াং ভাইয়া পাইছেটা কি? কখনো কোন বন্ধুর সামনে আমাদেরকে যেতে দেয় না। আজ নিজে আমাদেরকে নিয়ে এসেছে। এখানে নিশ্চয়ই কোন ঘাপলা আছে।
তন্বী আমার দিকে রাগী লুকে তাকিয়ে বললো,
— তুমি আর কথা বলো না নোভাপু।তোমাকে ভাইয়া নিয়ে আসবে তার সাথে আমাকে কেন জড়ালে?কাল রাতে এমনি ফেসবুক চালিয়ে একটার পর ঘুমিয়েছি।ভাবছি সকালে বেশি সময় ঘুমাবো।তা আর হলো কই?নিজে আসবে বলে আমাকেও নিয়ে এলে।আমি তোমার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি গো?যার জন্য আমার সাথে এই শত্রুতা।
—তুই আমার কোন পাকা ধানে মই দিসনি।মই তো দিয়েছে তোর বিটকেল ভাই। এই বেডার তো আমার ভালো সহ্যই হয় না।কোথায় ভাবছি একটু আরাম করে ঘুমাবো তা আর হলো কোথায়?কড়া গলায় তোর ভাই বলে দিলো যদি আমি এখন না যাই তাহলে রাতের পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠানের কনসার্টে আনবে না।আমাকে ব্লকামেইল করে।ভেবে দেখেছিস কি খবিশ?
—তোমাদের মধ্যে আমারে কেন টানলা বোইন?
আমি একটা ক্রুর হাসি দিয়ে বললাম,
— আমি এয়ারপোর্টে বসে মশা মারবো আর তুই বাসায় আরমচে ঘুমবি তাতো আমি হতে দিবো না।
—দিনটায় খারাপ আমার।কার মুখ দেখে যে সকাল বেলা উঠছি আমি?
— তোর ভাইয়ের🤭।
আমি মুখ টিপে হেসে কথাটা বললাম।তন্বী কিছু বললো না।তবে একটা খাইয়া ফালামু লুক দিলো।যেটাকে আমি তোয়াক্কা করে ভেংচি কেটে,চুপ হয়ে বসে আশেপাশের পরিবেশ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম।সময় এখন সকাল ছয়টা বেজে ৫৫ মিনিট। সাতটায় বিমান এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে।
শীত বুড়ি এখনো বাংলাদেশে আসেনি।তারপরেও চারদিকে একটা শীত শীত ভাব।এসির নিচে বসে থেকে কিছু সময় পরপর কেঁপে উঠছি।এবার ঠান্ডা না লাগলেই রক্ষা।তায়াং ভাইয়া ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে একটু ভেতর দিকে গিয়েছে। যে আসবে তাকে রিসিভ করতে।আর আমরা চেয়ারে বসে এসির তোড়জোড়ে কাঁপছি। আমার সাধের ঘুমটা নষ্ট করায় আরো কয়েকবার তায়াং ভাইয়া ও তার লাট সাহেব বন্ধুকে মনে মনে আরেকদফা বকলাম।হঠাৎ তন্বী আমাকে ডেকে বললো,
— এই আপু, শুনো না।
— হুম বল।
—আমার না অনেক শীত করছে।এসির পাওয়ারটা একটু কমিয়ে দিতে বলবে।প্লিজ একটু বলো না।
—বলতে পারি তবে এক শর্তে।
—আবার কিসের শর্ত?
—তুই তো জানিস কে আসবে,তার নামটা বল।
— কে আসবে সত্যি আমি জানি না।
—সত্যি??
—হ্যাঁ গো আপু।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হতাশ হলাম।কারণ ওর চোখ বলছে ও মিথ্যে বলছে না।কিন্তু কে আসতে পারে তার ধারণা আমারও নেই। আর যেখানে তায়াং ভাইয়া নিজে আমাদেরকে তার কোন বন্ধুর সামনে যেতে দেয় না সেখানে আমাদের নিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই কোন বড় কারণ আছে। তাই আমি সেই ব্যক্তির নাম জানার জন্য উসখুস করছি।হঠাৎ একটা কথা খেয়াল হতেই আমি কিছুটা নড়েচড়ে বসে তন্বীকে জিজ্ঞেস করলাম।
— তন্বী!!!
—আবার কি হলো?
—তায়াং ভাইয়ার কোন কোন বন্ধু বিদেশে থাকে তাতো তুই জানিস তাই না?
—হ্যা তাতো জানি।ভাইয়ার দুইটা বন্ধু প্রবাসে থাকে।
–তার মধ্যে বেশি ক্লোজ কে?
—দুই বন্ধুই ক্লোজ।তবে তাদের আসার সম্ভবনা একদম নেই। কারণ কয়েক বছর হলে মাত্র গেলো।
— এছাড়া অন্য কেউ নেই?
—আর তো মনে পরছে না।
—একটু মনে করার চেষ্টা কর।
তন্বী কিছু সময় নিজের ব্রেণের ওপর চাপ দিলো।তারপর হুট করে বললো,
— ও আমার আল্লাহ!! আমি তার কথা ভুলে গেলাম কি করে? আমি সিউর আজকে সেই ভাইয়া আসছে।
—কে??
—এনাজ ভাইয়া।
—এই এনাজটা কে?তাকে তো কখনো দেখিনি।
—তুমি দেখবে কি করে?তুমি আমাদের বাসায় আসার আগের সপ্তাহে ভাইয়া তার কাজের ট্রেনিংয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। বলছে এক বছর পর ফিরে আসবে।আজ এনাজ ভাইয়া আসবে।সাথে নিশ্চয়ই তার ছোট ভাই এনামও আসবে।এনাজ ভাইয়া আর তায়াং ভাইয়া একে অপরের কলিজার টুকরো।কলেজে তো তাদেরকে মানিকজোড় নামে সবাই চিনতো।
—ওহ আচ্ছা। কিন্তু তার জন্য আমাদের আনার কি দরকার ছিলো?
—আমিও জানি না।
আমাদের কথা বলার মাঝে তন্বী পেছনে তাকিয়ে অনেকটা জোরে চেচিয়ে বললো,
—ঐ তো ভাইয়ারা চলে এসেছে।
আমি তন্বীর দিকে ঘুরে ছিলাম।তন্বীর চিৎকারে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম।তায়াং ভাইয়ার হাতে লাগেজ।আর তার সাথে ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির শ্যাম বর্ণের একটা ছেলে।আমার মনে হলো এটাই এনাজ হবে।গায়ের কোর্ট খুলে একহাতে ভাজ করে ফেলে রাখছে।ডিপ ব্লু শার্টের ওপর এ্যাশ কালারের কটি, সেম কালারের প্যান্ট।পায়ে সু জুতা।পুরো ফরমাল ড্রেসআপ। শুধু চুলগুলো এলোমেলো। এক মুহুর্তের জন্য তার চুল দেখে আমার মনে হলো বিমানের পাখা ধরে ঝুলে এসেছে। তবে সে যাই হোক।আমি কিন্তু পুরো ফিদা😌।ছেলে দেখতে মাশাআল্লাহ। আমার পছন্দ হয়েছে।সাথে ক্রাশও খাইছি।এবার হাতে বাঁশ না ধরাইলেই হয়।
তায়াং ভাইয়া আমাদের সামনে এসে বললো,
— কিরে চল, আজকে কি এখানেই থাকবি নাকি?
কথাটা আমার কান দিয়ে ঢুকলো না।আমি তো হা করে ঐ এনাজকে গিলছি।এত সুন্দরও কোন বাঙালি ছেলে হয়।বোইন তোরা কিসের কোরিয়ান ছেলের কথা বলিস।আমি তো বাঙালি ছেলে দেখেই ফিদা হয়ে গেছি।তন্বীর কনুইয়ের গুঁতায় আমার হুশ ফিরলো।কানের কাছে বিরবির করে বললো,
—আপু,এবার মুখটা বন্ধ করো।
—হ্যাঁ রে তন্বী এটাই কি এনাজ?
—জ্বি হ্যাঁ।
—মাশাআল্লাহ, আমি তো ক্রাশ খাইছি।
আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে এনাজ গলা খাকরি দিয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে তায়াং ভাইয়াকে বললো,
—তায়াং মুখটা বন্ধ কর।মশা ঢুকবে তো।
কথাটা যে আমাকে বলছে তা ভেবে আমি মুখ বন্ধ করে ফেললাম।তা দেখে সবাই মিটমিট করে হেসে উঠলো। আমাকে অপমান এর শোধ তুলে রাখবো।ইস,কি ভাব! একবার আমার দিকে তাকায়ওনি।বাপরে কি ভাব!!! হুহ😏,ভাবে লাভ নাই টাকায় সব।তার পিছনে আরেকটা ছেলেকে সেম গেটআপে দেখলাম।শুধু ড্রেসের কালার চেঞ্জ। এনাজের সাথে চেহারার অনেকটা মিল।মেবি এটাই এনাজের ভাই এনাম।আমার সাথে একটা কথাও বললো না।হঠাৎ এনাজ আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।আমি তো হেব্বি খুশি।
যেই হাত মিলানোর জন্য আমিও হাত বাড়ালাম তখুনি এনাজ বললো,
— কেমন আছো তন্বী?
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন?
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
তন্বীর সাথে হাত মিলিয়ে নিজের পকেটে হাত গুঁজে রাখলো।আবার অপমান।আর তো সহ্য করা হচ্ছে না।গটগট পায়ে একাই এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আগ থেকে গাড়িতে গিয়ে বসে পরলাম।একটু পর সবাই চলে এলো।গাড়িতে আমি ভুলেও ঐ আনাইজ্জার দিকে তাকাইনি।রাগে,অপমানে আমার সারা শরীর জ্বলছে। পইপই করে আমি সব হিসেব রাখছি।সময়মতো সুদ শুদ্দ উসুল করবো।
বাসায় এসে রাগে কারো সাথে কথা বললাম না।নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।এনাজ,এনামও আমাদের সাথে এসেছে। খালামণি নয়তো কুরক্ষেত্র করে ফেলবে।এনাজ,এনামকে খালানণি নিজের ছেলের চোখে দেখে।সকালের নাস্তা এই বাসায় করবে।ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হতেই দেখি খালামণি এসে হাজির। হাতের শরবতের ট্রে দিয়ে আমাকে বললো,
— নোভা,এই শরবতের ট্রে-টা একটু তায়াং-এর রুমে দিয়ে আয়।আমার চুলোয় রান্না আছে।ছেলেগুলো এতদূর থেকে এলো নয়টার মধ্যে যদি ওদের খাবার না দিতে পারি বিষয়টা কিরকম দেখায় তুই বল?
—কিন্তু তায়াং ভাইয়াতো বকবে আমায়।তুমি তো জানো ভাইয়া তার কোন বন্ধুর সামনে যাওয়া পছন্দ করে না।
—তন্বী তো ওয়াশরুমে।নয়তো ওকেই বলতাম।তুই একটু যা না রে মা।
—আচ্ছা যাচ্ছি। তবে ভাইয়া বকা দিলে সব দোষ তোমার।
খালামণি মুচকি হেসে আমার হাতে ট্রে দিয়ে চলে গেল।আমি ওড়না দিয়ে ঘোমটা টেনে তায়াং ভাইয়ার রুমের দিকে গেলাম।ইতিমধ্যে এনাজের আাসার খবর শুনে তাদের সকল বন্ধু চলে এসেছে। দরজার সামনে আসতেই শুনতে পেলাম তায়াং ভাইয়া কিসের জানি অনুষ্ঠানের কথা বলছে।শুধু এতটুকু শুনতে পেয়েছি কার সুন্নতে খাৎনার কথা বলছে।
কথায় আছে না অতিরক্ত এক্সাইটিং জন্মের খারাপ।আমি অতিরিক্ত এক্সাইটিং ঠেলায় শেষ অব্দি উল্টো পাল্টা কথাই বলে দিলাম।আমি পুরো কথা না শুনে পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বলে উঠলাম,
—তায়াং ভাইয়া তোর মুসলমানি😳!!! অনুষ্ঠান কবে?
#চলবে
শেষের কথা পড়ে কেউ আমাকে বকেন না🥺।আমি আজকে এক্সাইটিং-এর ঠেলায় সবার সামনে আমার এক বছরের ছোট চাচাতো ভাইকে উপরোক্ত কথাটা বলে লজ্জায় ফেলে দিছিলাম😵।তাই গল্পেও আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম🤭।