কথায় আছে না অতিরক্ত এক্সাইটিং জন্মের খারাপ।আমি অতিরিক্ত এক্সাইটিং ঠেলায় শেষ অব্দি উল্টো পাল্টা কথাই বলে দিলাম।আমি পুরো কথা না শুনে পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বলে উঠলাম,
—তায়াং ভাইয়া তোর মুসলমানি😳!!! অনুষ্ঠান কবে?
এক মুহুর্তের জন্য সব স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আর তায়াং ভাইয়া পারলে তখুনি আমায় কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।সবাইকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার হুশ ফিরলো। আমি আসলে কি বলছি।
২৮ বছর এক ছেলের সুন্নতে খাৎনা!!তোওবা তোওবা। জিহ্বায় কামড় দিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।বাকি সবাই মিটমিট করে হাসছে। তায়াং ভাইয়া দাঁতে দাঁত চেপে ধমকের সুরে বললো,
—এদিকে আয়,তোকে বলছি অনুষ্ঠান কবে!এত শখ তোর? শখ এবার জন্মের মতো ঘুচাবো।আর তুই এখানে কি করিস?তোকে না বলছি আমার রুমে কেউ থাকলে পারমিশন ছাড়া আসবি না।তাহলে এখানে কি তোর?
—হে হে হে আমি কিছু বলিনি ভাইয়া।এই যে তোদের শরবত।আমি এখন আসছি।টা টা বাই বাই।
শরবতের ট্রে-টা টি-টেবিলে রেখেই আমি দিলাম দৌড়। এখানে থাকলে আজকে আমি শেষ। আজকে আমি পলাতক আসামী হয়ে থাকবো।নয়তো আমি মার্ডার হতে পারি।তখন আগামীকাল নিউজপেপারে বড় বড় অক্ষরে ছাপা হবে “খালাতো ভাইয়ের হাতে এক অবলা শিশুর মৃত্যু”।আসার আগে ভাইয়ার রুম থেকে উচ্চস্বরে হাসির শব্দ পেলাম।এখন নিশ্চয়ই তার হারামী বন্ধুগুলো এই কথার ভিত্তিতে তায়াং ভাইয়াকে পচানি দিবে।রুমে এসে ছিটকিনি আটকে হাঁপাতে লাগলাম। আরেকটু হলে আমার প্রাণপাখিটা উড়াল দিতো।আমাকে হাঁপাতে দেখে তন্বী বললো,
—আপু তুমি এমন হাঁপাচ্ছো কেন? পাগলা কুকুর ধাওয়া করেছে নাকি?
—তোর ভাই কি পাগলা কুকুরের থেকে কম নাকি?
—আমার ভাইয়া আবার কি করলো?
—কি করেনি তাই বল?
—তুমি কি তার বন্ধুদের সামনে গিয়েছিলে?
—হ্যাঁ গিয়েছিলাম।খালামণি জোর করে পাঠালো।বিশাল বড় এক ঘোমটা টেনে গিয়েছিলাম।
—যত বড় ঘোমটাই টানো কোন লাভ নেই। ভাইয়ার পারমিশন ছাড়া তার বন্ধুদের সামনে গেছো তোমাকে আর আম্মুকে দুজনকেই ইচ্ছে মতো হুইল পাউডার দিয়ে ধুবে।তুমি দেখে নিও।
— বোইন আর ভয় দেখাইস না।একটু আগে যা করে আসছি তার জন্য আমি তোর ভাইয়ের হাতে মার্ডারও হতে পারি।
—ঐখানে গিয়েও ভেজাল করে আসছো?
আমি তন্বীকে টেনে নিয়ে খাটে বসলাম।তারপর প্রথম থেকে সবকিছু খুলে বললাম।পুরো ঘটনা শুনে তন্বী চোখ দুটো রসগোল্লা করে আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো।ওর চোখের পলক পরছে না বলে আমি জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—এই তন্বী কি হয়েছে? কথা বলিস না কেন?
—আমার কিছু হয়নি নোভাপু।হবে তো তোমার? পিঠে ছালা বেঁধে রেখো।আমি বাবা এই ভেজালে নেই। তোমারটা তুমি সামলাও।আমি এমনি ভয়ে আছি আজ কলেজে গেলে রওনক ভাইয়া কি করবে?সে তো তোমার সাথে সাথে আমাকেও চিনে রাখছে।একা পেলে নিশ্চয়ই তোমার শোধ আমার ওপর দিয়েও উঠাতে পারে।আপাতত সেসব চিন্তা বাদ।আমি এখন একটু ঘুমাবো।তুমি বেঁচে থাকলে আমায় ১২ টার দিকে উঠিয়ে দিয়ো।
কথাগুলো বলে তন্বী ধপ করে খাটে শুয়ে হাত-পা মেলে দিলো।আমি লাফ দিয়ে ওর সামনে গিয়ে ওর কান টেনে ধরে বললাম,
—এই ছেমরি, বেঁচে থাকলে মানে কি হ্যাঁ?
—আহ্ আপু ছাড়ো!!ব্যাথা পাচ্ছি তো।
—তুই চাইছিস আমি তোর ভাইয়ের হাতে শহীদ হয়ে যাই।আমি ভালো করে বুঝতে পারছি।
—তুমি যা উল্টো পাল্টা কাজ শুরু করছো।তাতে তোমার ভাইয়ার হাতে উত্তমমধ্যম খাওয়া উচিত।
—আবার ভাইয়ের হয়ে ওকালতি করছিস।
—কানটা ছাড়ো নোভাপু।
আমি কান ছেড়ে খাটের ওপর চুপ করে বসে রইলাম।ইদানীং সত্যি আমি উল্টো পাল্টা কাজ বেশি করছি।এর জন্য না আবার বিপদে পরতে হয়।
সারাটাদিন শুয়ে-বসে কাটলো।দিনের বেলা আমাদেরকে কলেজে যেতে মানা করছে তায়াং ভাইয়া। শাসিয়ে বলে গেছে যদি দিনের বেলা কলেজে যাই তাহলে রাতের কনসার্টে নিবে না।সেই ভয়ে দিনে কলেজে যাওয়ার নামও নেইনি।সারাদিনে তায়াং ভাইয়ার সামনেও পরিনি।নয়তো বাহাতে এমন চটকনা দিতো যে আমি আর কানে শুনতাম না।ভাইয়া বন্ধুদের নিয়ে দুপুরের পর বের হয়েছে এখনো আসার নাম নেই। সন্ধ্যা হতেই আমরা তৈরি হতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম।রাতের কনসার্টের জন্য একটা এ্যাশ কালারের কুর্তি পরবো।সাথে সেম রঙের হিজাব বাঁধবো। মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখি তন্বী বিশাল বড় একটা নীল রেপারে পেঁচানো গিফট বক্স হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলাম,
— এটা কি?
—তোমার জন্য নোভাপু।
—কে দিলো?
—তায়াং ভাইয়া মানুষ দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। এটা নাকি তোমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী তোমাকে গিফট করেছে।
—আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আবার কে?
—তাতো তুমি ভালো বলতে পারবে।
—আমি তো জানি না।
—নাও ধরো।তোমার জন্যও পাঠিয়েছে। আর সকালে আমাকে এনাজ ভাইয়া একটা হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি গিফট করেছে। আমি ভাবছি আজ সেটাই পরে যাবো।তুমি খুলে দেখো ভেতরে কি আছে?
তন্বী আমার হাতে গিফট বক্সটা হাতে ধরিয়ে ও তৈরি হতে চলে গেলো।এনাজ ওকে যে শাড়িটা দিয়েছে সেটা আমাকে দেখিয়ে খালামণির কাছে পরতে চলে গেলো।আমি বোকার মতো গিফট বক্স হাতে বসে রইলাম।আমাকে কে গিফট করতে পারে? আমি তো সেই মানুষটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।গিফট বক্সটা খুলতেই
সেখানে আকাশি রঙের একটা শাড়ি দেখতে পেলাম। সাথে সিম্পল কিছু জুয়েলারি।ব্লাউজ,পেটিকোট, হিজাবও আছে।সাথে একটা হলুদ রঙের চিরকুট।সেটাকে হাতে নিলাম।জিনিসপত্রগুলো পাশে রেখে চিরকুট খুললাম।চিরকুটে লেখা ছিলো,
ডিয়ার মাই লাভ ,
তোমার লাজুক চোখ দেখে ভালোবেসেছি। তোমার ঐ লুকানো হাসি ভালোবেসেছি। তোমার মায়া লতানো মায়া ভালোবেসেছি। শুধু তোমাকে নই তোমার সব কিছু কেই ভালোবেসেছি। এতটাই ভালোবাসি যে যখন তেমার এলোমেলো চুলগুলো লুটেপুটে খায় তোমার অধরে,আমার খুব হিংসে হই।এতটা হিংসে হয় যে ইচ্ছে করে ওকে সরিয়ে বলতে এটা শুধু আমার অধিকার।এখানে ছুঁয়ে দেওয়ার অধিকার আর কারো নেই। আমি তোমাকে শুনাবো সে সব কথা।চলো আমরা একটি গল্পের আসর জমিয়ে ফেলি। কারণ আমি হ্রদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল।হবে কি আমার মনের রাজ্যের রাণী?কথা দিচ্ছি সারাজীবন আগলে রাখবো।সুযোগটা কি দিবে প্রেয়সী?আমি তোমার উত্তরের আশায় থাকবো।শাড়িটা কিন্তু পরে আসবে।কতদিন যে তোমাকে মন ভরে দেখি না।আজ মন ভরে তোমাকে দেখবো।দেখবো আমার প্রেয়সীকে আমার প্রিয় রঙের শাড়িতে ঠিক কতটা সুন্দর লাগে!!জলদী চলে এসো।আমি অপেক্ষা করছি তো।আমার কিন্তু আর তর সইছে না।আর হ্যাঁ শুনো,ভালোবাসি প্রিয়তমা।
ইতি তোমার
ভালোবাসার কাঙাল
চিরকুটটা পড়ে থুম মেরে বসে রইলাম।কে হতে পারে এই মানুষটা?আমার কাছের কেউ, নাকি দূরের।বেশি কিছু ভাবতে পারলাম না।তার আগেই তন্বী রেডি হয়ে এসে আমাকে তাড়া দিতে লাগলো।শাড়িটা পরতে চাইছিলাম না।কিন্তু তন্বীর জোড়াজুড়িতে পরতে হলো।তৈরি হতে হতে রাত আটটার বেশি বেজে গেলো।আমাদের নিতে তায়াং ভাইয়া এনাজকে পাঠিয়েছে। শাড়ি পরে হিজাব বেঁধে বাইরে যেতেই দেখি এনাজ বাইকের ওপর বসে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।তন্বী মৃদুস্বরে ডাক দিলো।
—এনাজ ভাইয়া।
—আরে তোমরা এসে…..
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগে আমার দিকে তাকালো।তাকিয়ে হা করে রইলো।তার চোখের পাপড়িগুলো যে কেঁপে কেঁপে উঠছে তা আলো না থাকলে বুঝতেই পারতাম না।তাকে আজ কম সুপুরুষ লাগছে না। নতুন করে আরেকবার ক্রাশ খাইছি। সাদা পাঞ্জাবীর সাথে আকাশি রঙের কটি।সাদা পায়জামা,সাদা জুতো।চোখে কালো সানগ্লাস। চুলগুলো এখনো এলোমেলো। এই ছেলের বোধহয় এলোমেলো চুল ভীষণ পছন্দ। আমার মনে হচ্ছে চুল ও সানগ্লাস সাদা হলে আরো বেশি সুন্দর লাগতো😁।
তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমিও একটা ভাব নিলাম।হুহ, আমিও এখন সকালের মতো ভাব নিবো।একটুও পাত্তা দিবো না।এনাজকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তন্বী মুচকি হেসে এনাজের চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো,
—ভাইয়া, কলেজে কি যাবেন?নাকি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কনসার্ট দেখবেন।
—হ্যাঁ,হ্যাঁ চলো।
অবশেষে আমরা কলেজে এসে পৌঁছালাম।চারিদিকে আলোকসজ্জায় ভরপুর।দিনের থেকে রাতে যেনো পুরো কলেজটা আকর্ষণীয় লাগছে।চারিদিকে মানুষ গিজগিজ করছে।এনাজ বাইকের চাবিটা একজনের হাতে তুলে দিয়ে বাইক রেখে আসতে বললো।ছেলেটা চলে গেল।আশেপাশে তাকিয়ে ধীর গতিতে হাঁটতে লাগলাম।এনাজ আমাদের থেকে কিছুটা সামনে।পেছনে ঘুরে আমাদেরকে দেখলো।তারপর হুট করে আমাদের সামনে এসে এক হাত ধরে টেনে সামনে নিয়ে যেতে লাগলো।সে আমার হাতটা ধরতেই আমার সারা শরীরের ৪৪০ ডিগ্রি ভোল্টেজে শক খেলাম।আমি একবার এনাজের দিকে আরেকবার ওর হাতের দিকে তাকাতে লাগলাম।আরেকহাতে তন্বীকে ধরে নিয়ে আসছি।তায়াং ভাইয়ার সামনে এসে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে দাঁড়ালো। তায়াং ভাইয়া আমার দিকে একবার চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকালো।আমি তন্বীর পেছনে লুকালাম।তন্বী কয়েকজনের সাথে কুশলাদি বিনিময় করলো।আমি তেমন কাউকে চিনি বলে চুপ করে সাইডে দাঁড়িয়ে রইলাম।তারা সবাই খোশগল্প করছে।সাথে চলছে ঠাট্টা-তামাশা, বিটকেল মার্কা হাসি।আমি ও তন্বী নীরব দর্শকের মতো তা দেখছি।কথায় কথায় তায়াং ভাইয়ার এক বন্ধু তায়াং ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—দোস্ত তোরে কিন্তু আমি মাইরাই ফালামু।তুই কিন্তু এখনো ঐ বিষয়টা ক্লিয়ার করিসনি।
আমি ফট করে চোখ দুটো বড় বড় করে জোরে চেচিয়ে বলে উঠলাম,
— ভাই ওরে মাইরা ফালান নয়তো কাইট্টা ফালান। কিংবা বেইচা দেন।তাতে আমার কিচ্ছু আসে-যায় না।কিন্তু দয়া করে ওর কিডনি দুটোর যাতে কিছু না হয়।ঐ দুটো আমাকে দিয়ে দিয়েন।আমার বহুদিনের শখ ওর কিডনি দুটো বেঁচে আইফোন কিনবো।আপনারা প্লিজ আমার এই অনুরোধটা রাইখেন।আমার আইফোন কেনার শখটারে মাটি কইরেন না।আমি তায়াং ভাইয়ার কিডনি বেঁচে আইফোন কিনতে চাই।