সকালের নামাজ পরে আর ঘুমায়নি। আজ বাসায় চলে যাবো। আর কখনো খালামণিদের বাসায় আসা হবে না। ঝগড়া করা হবে না তায়াং ভাইয়ার সাথে। তন্বীর সাথে মশারী টানানো নিয়ে মন খারাপ করতে হবে না। অর্ধেকের বেশি গুছিয়ে নিবো। বাকিগুলো বিয়ের পর এসে নিয়ে যাবো। তায়াং ভাইয়া, তন্বী, খালামণির মনটা ভার। সবার চোখ লাল হয়ে আছে। নিশ্চয়ই কান্না করেছে। আমারও ভীষণ খারাপ লাগছে। তবে তাদের সামনে কান্না করা যাবে না। তাহলে তারা আরো ভেঙে পরবে। একটা বছরে মনে হচ্ছে কত যুগ ধরে তাদের সাথে আছি। ওয়াশরুম থেকে একদফা কান্না করে বের হলাম। এনাজকে তন্বীর শিয়রের কাছে বসে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
— কি করছেন এখানে?
এনাজ আমার কন্ঠস্বর পেয়ে চমকে উঠলো।হাতে থাকা ছোট কাগজাও লুকিয়ে ফেললো। একবার আমার দিকে তাকিয়ে আরেকবার কম্বল মুড়ি দিয়ে খাটে শুয়ে থাকা তন্বীর দিকে তাকালো। তারপর বিস্মিত চোখে বললো,
— তুমি এখানে তাহলে এটা কি তন্বী?
— জ্বি হ্যাঁ।
এনাজ জিহ্বায় কামড় দিয়ে অপরাধী গলায় বললো,
— আমি ভেবেছিলাম এটা তুমি। ভাগ্যিস কিছু করিনি। তাহলে কি একটা বাজে পরিস্থিতি হয়ে যেতো। আল্লাহ তুমি বাচিয়েছো।
এনাজের কথা শুনে আমি মুচকি হেসে বললাম,
— হঠাৎ এখানে কেন?
— সপ্তাহখানেক তোমাকে দেখতে পাবো না। তাই দেখা করতে চলে এলাম।
— কফির মগের সাথে কি রাখলেন?
— কোথায়?
— আমি কিন্তু দেখেছি। জলদী দেন।
— দেখেই যখন ফেলেছেন তাহলে আর লুকিয়ে কি লাভ। এই নাও।
গোলাপি রঙের একটা ছোট চিরকুট আমাকে এগিয়ে দিলো। সেখানে নিম্নোক্ত লেখাগুলো ছিলো।
❝ভোরের শিশির মন ছুঁয়ে যায়,
আদরে মেখেছে সবুজ ঘাস।
ভোরের স্নিগ্ধতা মুগ্ধ করেছে,
রোদ্দুরে ছুঁয়েছে নীল আকাশ।❞
আমি লেখাগুলো পড়ে কাগজ হাতে এনাজের দিকে খুশিমনে তাকালাম। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— এতদিন চিরকুটগুলো আপনি দিয়েছেন তাই না?
— এই রে ধরা পরে গেলাম।
— আপনাকে আমি বহু আগেই ধরে ফেলেছি। শুধু হাতেনাতে ধরার অপেক্ষায় ছিলাম। আপনি যেদিন বাসায় আসতেন সেদিনই আমার রুমে কফির মগ ও ছোট চিরকুট পেতাম। তাই আমার প্রথমে আপনাকেই সন্দেহ হয়েছে। তাছাড়া মিলনায়তনের দিন আকাশি রঙের শাড়িটাও আপনি দিয়েছেন তাও আমি জানি।
— কি করে জানলে?
— দ্যাটস সিক্রেট।
— তুমি অনেক রহস্য রেখে কথা বলো।
— ভালো লাগে।
— কখন রওনা দিবে?
— সাড়ে সাতটার দিকে।
— আমার কাছে মনে হচ্ছে সাত বছর তোমাকে দেখতে পারবো না।
— সবুর করুন এনজিও সংস্থা। সাতদিন পর আপনার ঘরে থাকবো। তখন যত ইচ্ছে দেখে নিয়েন।
— নো প্রবলেম। ভিডিও কল আছে কি করতে?
— হ্যাঁ, তাও ঠিক।
— চলুন ছাদে যাই।
— হুম চলো।
দুজন কফির মগ হাতে নিয়ে ছাদে চলে গেলাম। কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বাইরের ব্যস্ত কোলাহলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এনাজ নিচুস্বরে বললো
— আজ গ্রামে থাকলে শিশির ভেজা রোদ্দুর উপভোগ করা যেতো।
— হুম।
— মন খারাপ?
— না তো।
— আমার তো মনে হচ্ছে।
— এক বছরে সবকিছু কতটা আপন হয়ে গিয়েছিল। আজ সব ছেড়ে চলে যাবো তাই একটু খারাপ লাগছে।
— কি বলে সান্ত্বনা দিবো তা আমার জানা নেই। তাই কিছু বললাম না।
আমি বিশাল এক দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কফির মগে চুমুক দিলাম। এনাজ ইচ্ছে করে আমার সাথে দাঁড়িয়ে সুরৎ করে কফিতে চুমুক দিলো। আমি চোখ গোল করে তার দিকে তাকাতেই দুজন ফিক করে হেসে উঠলাম। তারপর আবার নীরবতা। এনাজ জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ছাদের রেলিঙের সাথে দাঁড়িয়ে আমার দিক ফিরে হেলান দিলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
— তুমি একবার আমাকে ভালোবাসার সঙ্গা দিয়েছিলে। মনে আছে তোমার? সেদিন ছিলো বৃষ্টির দিন। আমি তোমাকে আনতে গিয়েছিলাম।
— হ্যাঁ, মনে আছে।
— তুমি ভালোবাসাকে তুলনা করেছিলে একটা রাবার ব্যান্ডের সাথে। “ভালোবাসা হলো একটা রাবার ব্যান্ডের মতো।যার দুপাশে দুজন ধরে থাকে।যদি কেউ একজন একপাশ থেকে ছেড়ে দেয় তাহলে অবশ্যই অপরপাশের জন আঘাত পাবে।যাকে আপনি ভালোবেসেছেন তাকে আঘাত দেয়া আর নিজের সাথে প্রতারণা করা দুটোই সমান।” এটাই তো ছিলো তাই না?
— হুম এটাই ছিলো।হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
— এমনি মনে হলো। আমি প্রথমে তোমার এই কথাটা শুনে হেসেছিলাম।
— হ্যাঁ, আমি কারণ জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন কিছু না। তারপর আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
— তখন কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তাই হেসেছিলাম। কিন্তু তায়াং-এর সাথে যখন তোমার বিয়ে প্রায় হয়ে যাবে, যাবে ভাব। তখন তোমার ভালোবাসার সঙ্গাটা আমি বাস্তবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। কারণ তখন আমি সেই পরিস্থিতিতে পরেছিলাম। এর আগে কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসার উদাহরণ অন্য ভাবে ছিলো।
— ভালোবাসার বিবরণ অনেকভাবে দেওয়া যায়। তা আপনারটা কি ছিলো।
—❝ভালোবাসা হচ্ছে এক ধরনের পাগলামি। এখানে ঢুকে গেলে হারাতে চাইলেও হারানো যায় না।ফিরাতে চাইলেও ফিরানো যায় না।❞
— একদম ঠিক।খুব সুন্দর কথা।
— এখনও আমি এটা মানি। কিন্তু তোমার ভালোবাসার সঙ্গাটাও আমি উপলব্ধি করে বুঝতে পেরেছি।
আমি তার চোখের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেললাম। উনি এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ পেছন থেকে ইফাতের গলা পেয়ে সামনের দিকে ঘুরলাম।
— নুবা, তোমার বলে বিয়ে🥺?
ওকে আজকাল দেখা যায় না।মাস খানিক আগে ওর একটা বোন হয়েছে। অবসর সময়ে দুই ভাই বোনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমাকে কোন বিরক্ত করে না।ইফাত প্রশ্নবোধক চিহ্ন কপালে একে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ বুঝালাম। ইফাত সামনে এগিয়ে এসে ছলছল নয়নে বললো,
— তুমি আমারে একটুও ভালোবাসো না। তুমি আমাকে ভালোবাসলে এই বিয়েটা করতে পারতা না।
— এদিকে আয় আমার কথা শোন।
আমি হাত বাড়িয়ে ইফাতকে ডাকলাম। ইফাত নাক টেনে চোখের পানি মুছে বললো,
— কোন কথা শুনবো না তোমার। তুমি এই ভাইয়াকে বিয়ে করছো। কারণ তুমি এই ভাইয়াকে ভালোবাসো। আমাকে কারো ভালোবাসতে হবে না।
দৌড়ে ছাদের থেকে চলে গেলো। আমি ও এনাজ একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। ইস, ওদের সাথে কত সময় কাটিয়েছি। এদেরও খুব মিস করবো। চোখ দুটো টলমল করে উঠলো। এনাজ এগিয়ে এসে চোখের পানি মুছে দিতেই তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরলাম আমি।
💖💖💖
ম্যাসেজের টুং শব্দে অতীতের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলাম।এতখন সপ্তাহখানেক আগের ভাবনায় বিভোর ছিলাম।সারা বাড়িতে হৈ-হুল্লোড়। কিন্তু আমার মনটা বিষাদে ভরে আছে। দেখতে দেখতে দেড় মাস কেটে গেলো। আজ আমার হলুদ সন্ধ্যা। অথচ আমার মাঝে কোন আনন্দ নেই। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। বিয়েটা তো আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে হচ্ছে। তাহলে এতো খারাপ লাগছে কেন? সবাইকে ছেড়ে চলে যাবো বলে কি? ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছি। পূর্ব দিগন্তে সূর্য মামা তার লাল আভা নিয়ে উদিত হচ্ছে। গায়ে একটা শাল জড়ানো থাকা সত্বেও ভালোই শীত করছে।ঘাসের মধ্যে শিশির বিন্দুগুলো মুক্ত দানার মতো চিকচিক করছে। আজকের সকালটাকেও শিশির ভেজা রোদ্দুর বলা যায়। কথাটা মাথায় আসতেই ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। এতখন ডুবে ছিলাম সপ্তাহখানেক আগের অতীতে। যেদিন বাসায় আসবো সেদিনের ঘটনা এগুলো। সেই রেশ কাটলো ম্যাসেজের শব্দে।
মোবাইল ওপেন করতেই দেখলাম এনাজ দুই মিনিটের একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। ভিডিও ওপেন করতেই আমার চোখ ছানাবড়া। এই ভিডিও সে পেলো কোথা থেকে? নিশ্চয়ই তায়াং ভাইয়ার কাজ। একদিন জামার ভেদ করে পিঠের মধ্যে কিভাবে জানি একটা টিডি পোকা ঢুকে পরেছিলো। আমি সেটা বের করার জন্য লাফাচ্ছিলাম আর বলছিলাম টিডি পোকা, টিডি পোকা। সেটা সুযোগ বুঝে তায়াং ভাইয়া ভিডিও করে নিয়েছিলো। টিডি পোকা হলো ছোট কালো চ্যাপ্টা জাতীয় এক ধরণের পোকা। যেটা অনেক লাফায়। এই পোকার কাজই হলো সারাক্ষণ লাফানো।আমি কতগুলো এংরি রিয়েক্ট দিয়ে তাকে ম্যাসেজে জিজ্ঞেস করলাম,
— এটা কোথা থেকে পেয়েছেন?
— বলবো না।
—জলদী বলুন।
— মোবাইলের প্রাইভেট ফাইল ঘাটছিলাম। তখন সামনে এটা পেলাম। তাই তোমাকে পাঠিয়ে দিলাম।
— তায়াং ভাইয়া দিয়েছে তাই না?
— হুম।
— কবে দিয়েছে?
— বছর খানিক আগে।
— ডিলিট করেন।
— করবো না।
— ভালো হবে না কিন্তু।
— না হোক।
— এবার কিন্তু বেশি হচ্ছে।
অপরপাশ থেকে ম্যাসেজ এখনো সিন হয়নি। তায়াং ভাইয়াকে আগে আলুভর্তা করবো। আমি পিঠে হাত দিয়ে লাফাচ্ছিলাম সেটা ওকে দেওয়ার কি দরকার ছিলো। অবশ্য এখন আর রাগারাগি করার কি দরকার? সে তো আমার জামাই।তার কাছে থাকলে কোন সমস্যা নেই। সে ম্যাসেজ সিন করলো। টাইপিং- এ আছে। সে লিখলো,
— এই ভিডিওটার দেখেই তোমার নাম আমি টিডি পোকা রেখেছি।
— আমাকে উদ্ধার করে ফেলছেন।
— তুমি তো বাস্তবেও টিডি পোকার মতো লাফাও।
— কে বলছে আপনাকে?
— আমি তো দেখছি।
— আমাকে রাগানোর ধান্দায় আছেন?
— হুম অনেক।
— কথা নেই আপনার সাথে।
— কথা না বলে যাবে কোথায়?
— হু কালকে নিতে আসলে যাবো না তো আমি।
— কোলে করে নিয়ে যাবো।
— আমি গেলে তো নিয়ে যাবেন।
— তোমাকে জাপ্টে ধরে কোলে নিয়ে দৌড় দিবো। তারপর দেখবো তুমি কিভাবে আমার থেকে পালাও।
— ওয়েট তায়াং ভাইয়া কল দিচ্ছে। তার সাথে একটু কথা বলে নেই।
— ওকে।
এনাজের ম্যাসেজ সিন করে তায়াং ভাইয়ার কল রিসিভ করলাম। ভাইয়াকে বড় করে একটা সালাম দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম। তায়াং ভাইয়া আক্ষেপের সুরে বললো,
— আমি আসতে পারবো না বলে মন খারাপ করিস না। এনাজের দিকও তো আমাকে দেখতে হবে। যেহেতু তোদের বিয়ের রিস্ক আমি। আম্মুও আসবে না। সে তো ছেলের মা হিসেবে আছে। এখানে না থাকলে বিষয়টা খারাপ দেখায়। তুই মন খারাপ করিস না। আগামীকাল তোর জামাইয়ের সাথে বরযাত্রী হিসেবে চলে আসবো। হাতের কব্জি ডুবিয়ে খেতে হবে তো।
— থাক, সমস্যা নেই। তবে হলুদে তুই এলে খুব খুশি হতাম। আমার তো আর আপন ভাই নেই। তুই থাকলে মনে হতো আমার নিজের ভাই আছে।
— দুইপক্ষের মানুষ হলে এই একটা জ্বালা। এইদিকে গেলে ঐদিকের মানুষ মন খারাপ করে। ঐদিকে গেলে এদিকের মানুষ মন খারাপ করে। আমি কোন দিকে যাবো বল তো?
ভাইয়া আফসোস করে কথাগুলো বললো। তায়াং ভাইয়া ও খালামণি বর্তমানে ছেলেপক্ষের লোক। তন্বীকে পাঠিয়ে দিয়েছে আমাদের বাড়িতে। ভাইয়া, খালামণি আমার হলুদে থাকবে না তাতে আমারও খারাপ লাগছে। কিন্তু এনাজের দিকটাও আমার বিবেচনা করতে হবে। তাই আমি ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
— তুই ঐদিকে থাক। এদিক সামলানোর জন্য অনেক মানুষ আছে। কিন্তু ঐদিকটা সামলানোর জন্য তোর থাকা প্রয়োজন। আর শোন, তওহিদ ভাইয়াকে বলিস বিকালের মধ্যে শারমিনকে যেন দিয়ে যায়। আর শাহেদ ভাইয়াকে বলিস বিয়ের দিন মোহনাকে নিয়ে আসতে।
—আচ্ছা, আমি বলে দিবো। তন্বী কোথায়?
— ঘুমে দেখেছিলাম। এখন কি করছে জানি না। রওনক কি তোদের সাথে?
— হু সব একসাথে আমরা। বিকেলে এনাম,তওহিদ ওরা আসবে।
— কেন?
— তোর হলুদের জিনিসপত্র দিয়ে যেতে। সাথে বিয়ের জিনিসপত্রও দিয়ে যাবে। যাতে আগামীকাল কোন দেরী না হয়। অনেক সময় তো দেখা যায় বরপক্ষ আসতে দেরী হওয়ায় শাড়ি,গহনার কারণে মেয়ের সাজ কমপ্লিট হয় না তাই আরকি।
— আগামীকাল শুক্রবার। কোন সমস্যা হওয়ার তো কথা নয়।
— সাবধানের মার নেই। তাই আগে আগে জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিবো।
— আচ্ছা তাহলে তাদের সাথে শারমিনকে পাঠিয়ে দিস। মোহনাকে তো আনতে পারবি না। তাই ওর কথা বললাম না। তবে আগামীকাল মোহনাকে আনতেই হবে।
— ওকে এখন বেরুতে হবে। শাহবাগ যাবো ফুল কিনতে। আমরা বন্ধুরা মিলে ছাদে স্টেজ করে এনাজকে হলুদ ছোঁয়াবো।
— ভিডিও কল দিয়ে দেখাস।
— এত শখ কেন? যা ভাগ।
— আমার জামাইয়ের হলুদ ছোঁয়ানো আমি দেখবো তোর কি?
— তোকে দেখতে দিবো না। আগামীকাল মন ভরে দেখে নিস। ওকে ফোন রাখ।
— আল্লাহ হাফেজ।
শারমিন ও তওহিদ ভাইয়ার বিয়ে ঠিক। জানুয়ারিতে ভাইয়ার এক মামা আসবে। তখন বড় করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শারমিনকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। রওনক ও তন্বীর বিয়ের কথা চলছে। এখনো পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে আশা করা যাচ্ছে মাস দুইয়ের মধ্যে এদের বিয়েও হয়ে যাবে। আমি কল কেটে দূরের আলু খেতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কচি সবুজ রঙের আলুপাতায় সারা খেত ভরপুর। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ।
— বোইনে আম্মু তোমাকে ডাকে।
আলু খেত থেকে চোখ সরিয়ে ইভার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ গলায় বললাম,
— তুই যা, আমি আসছি।
ইভা দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। আমি একবার সবুজ খেতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে নিচে চলে গেলাম। বারবার কানে একটা কথা বারি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলছে, “আজ তোর হলুদ সন্ধ্যা নোভা। আগামীকাল তোর এই বাড়িতে শেষ দিন। তুই সবকিছু ছেড়ে নতুন জীবনে পা রাখবি।” হ্যাঁ, সত্যি তো তাই। আমি সিঁড়ি বেয়ে যেতে যেতে কয়েক লাইন মনে মনে আওড়ালাম,
“মেয়ে হয়ে জন্মেছি যখন,
পরের ঘর তো করতে হবে এখন।
মন যে কিছুই মানছে না,
ইচ্ছে করছে, ছেড়ে যেতে না।
তবু,মানতে না চাইলেও মানতে হবে,
সব ছেড়ে আমায় যেতেই হবে।”
সবুজ পাড়ের কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ির সাথে কাঁচা ফুলের গহনায় আমাকে বউ, বউ লাগছে। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেই অবাক। মেকআপের কি জাদু ভাভা গো ভাভা🥵! নিজেকে নিজেই চিনতে পারছি না। পার্লারের মেয়েটাকে এতো করে বললাম হলুদে একটু কম সাজাবেন। কিন্তু উনি আমাকে কালো পেত্নী থেকে সাদা পরী বানিয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস হাত-পায়েও একটু মেকআপ করে সাদা করে দিয়েছে। নয়তো মুখে লাইট জ্বলতো আর সারা শরীর লোডশেডিং হয়ে থাকতো।
— নোভাপু তোমার হইছে? পার্লারের মেয়ে তো সেই কবে তোমাকে সাজিয়ে বেড়িয়েছে। তাহলে এখনো বের হচ্ছে না কেন?
তন্বী ঝাঁঝালো গলায় চেচিয়ে কথাগুলো বললো। ওর সাথে গলা মিলালো আমার বড় ভাগ্নি অনন্যা। শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করতে করতে অনন্যা আমাকে বললো,
— খালামণি গো চলো এবার। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। এতো আয়না দেখতে হবে না। আঙ্কেল তো আজকে তোমাকে নিতে আসবে না।
অর্থি দুই হাত কোমড়ে রেখে শাসনের সুরে বললো,
— ঐদিকে সব ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু তোমারি হয় না।নানাভাই চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিবে।
আমি সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। ওদের সবার পরনে সবুজ রঙের শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ। মাথায়,কানে,গলায় হলুদ রঙের প্লাস্টিকের ফুলের সেট। খোপায় গাজরা। একেকজন মেকআপের জাদুতে পরী হয়ে আছে। ছেলেদের হলুদ পাঞ্জাবী সাথে সবুজ রঙের কোটি। আমাকে হাসতে দেখে তন্বী চেচিয়ে বললো,
— দাঁত পরে কেলিয়ো। এখন দয়া করে রুম থেকে বের হও। সবাই চেচানো শুরু করবে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফুলের গহনা ঠিক করতে করতে বললাম,
— সব ঠিক তো। গিয়ে কিন্তু বসে থাকতে পারবো না। এমনি আমার শীত করছে। তারপর আজকে চলবে আমার ওপর খাওয়ার অত্যাচার। নূর আপি, ইভা কোথায়? আমার তিন চাচাতো ভাইয়ের বউ কি রেডি হইছে?
অর্থি আমার হাত ধরে রুম থেকে টেনে নিতে নিতে বললো,
— চলো এখন।সবাই রেডি হয়ে গেছে। কিন্তু তুমিই বের হও না। অনেক দেরী হয়ে গেছে খালামণি।
আমি ওর থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,
— একটু দাঁড়াও তোরা। তোর আঙ্কেল ভিডিও কল দিবে। তাকে দেখিয়ে তারপর বের হবো। এর জন্য দেরী হচ্ছে।
তন্বী,অনন্যা, অর্থি একসাথে চেচিয়ে উঠলো। অনন্যা কাছে এসে আমার গাল টেনে দিয়ে বললো,
— তাহলে এই ঘটনা। তুমি আঙ্কেলের সাথে কথা বলবে বলে এতো দেরী করছো।
আমি লাজুক হাসি দিয়ে মোবাইল নিলাম। আমি ভিডিও কল দেওয়ার আগে এনাজ দিয়ে ফেলছে। আমি রিসিভ করতেই এক হাত মাথায় দিয়ে হা করে রইলো। তাকে এভাবে দেখে আমি মুখ টিপে হেসে উঠলাম। মাথার থেকে হাত সরিয়ে মুখের সামনে দিয়ে চোখ দুটো রসগোল্লা করে বললো,
— মা শা আল্লাহ! আমার বউটাকে তো পরীর মতো লাগছে। আমার তো চোখ সরানো দায় হয়ে পরছে। কাজলের টিপ পরে নিয়ো। কারো নজর লেগে গেলে আমি শেষ।
— আপনার পাঞ্জাবী কোথায়? শুধু পাতলা গেঞ্জি পরে বসে আছেন যে?
— তোমার দেবর আমার আগে তোমাকে হলুদ ছোঁয়াতে গিয়েছে। ওকে ছাড়া কি আমি কিছু করতে পারি।
— তায়াং ভাইয়া কোথায়? ওকে একটু মোবাইলটা দিন তো। ওর সাথে একটু কথা বলি।
— তায়াং তো এখানে নেই।
— কোথায়?
— আমি বলতে পারবো না।
— ইমরান হাশমি ভাইয়া, শাহেদ ভাইয়া, রায়হান, তওহিদ ভাইয়ার বাবা-মা আসার কথা শুনছিলাম। তারা কি আসছে?
— হ্যাঁ, সবাই আসছে।
— তায়াং ভাইয়াকে বলেন ওকে আমাদের বাসার কুকুর তাড়ানোর দায়িত্ব রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও তো এলোই না। আগেই ভয় পেয়ে গেছে।
— তায়াং শুনলে দিবো নে মাইর।
— কিছু করতে পারবো না।
— জানো, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আগামীকাল আমাদের বিয়ে। আজ হলুদ। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি।
— আমারও মনে হচ্ছে।
আমরা কথা বলছি অর্থি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্যা, তন্বী বাইরে চলে গেছে। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরাম্যান চেচিয়ে বললো,
— বউ কই? এবার বের হোন। ভিডিও তো শুরু করতে হবে। মাথায় ওড়না ধরার লোকরা তৈরি থাকেন। বউয়ের মা-বাবা রেডি তো।
ইভা দৌড়ে এসে রুমে ঢুকে বিরক্তি নিয়ে বললো,
— বোইনে তোমার কি হলুদের অনুষ্ঠান করার ইচ্ছে আছে? থাকলে বের হও। ঐদিকে সামাদ ভাইয়া, আব্বু, কাক্কুরা আমারে বকতাছে। আমি আর নূর আপি ডিসপ্লের খাবার সাজাইতে গিয়ে দেরী করে ফেলছি। রেডী হয়ে দেখি তোমার হয় নাই। এবার রুম থেকে বের হও।
আমি মোবাইলের থেকে চোখ সরিয়ে ইভার দিকে তাকিয়ে বললাম,
— এখুনি বের হবো। নূর আপির হইছে?
— সবার সবকিছু হইছে। শুধু তোমার ছাড়া।
— আমি তো রেডি।
— তাহলে বের হও না কেন?
— তোর ভাইয়ার সাথে কথা বলতাছি।
— পরে মন ভরে বলো। এখন ভালোই ভালোই অনুষ্ঠান শেষ করতে দাও।
ইভা একদফা ঝেড়ে বের হয়ে গেলো। আমি অর্থিকে ডেকে বললাম,
— অর্থি শুনে যাও তো খালামণি।
— হ্যাঁ, খালামণি বলো।
— তোমার আঙ্কেল ভিডিও কলে সব দেখবো। তুমি ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে মোবাইল ধরে রেখে সব দেখাবা।
— আচ্ছা খালামণি। মোবাইল দাও।
আমি এনাজের থেকে বিদায় নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম। সামাদ ভাইয়া ধমক দিয়ে বললো,
— তোর কি হয় না? কত সাজিস? এখন শুরু করলে বেশি রাত হয়ে যাবে। তখন আরেক ঝামেলা। শীতের রাতে কি এত দেরী করতে হয়।
— সব মিলে আবার আমাকে বকা শুরু করছিস তোরা। আজকে যে আমার গায়ে হলুদ তাও ভুলে গেছিস। কালকে তো চলে যাবো। এখন একটু রেহাই দে। কোথায় ক্যামেরাম্যান? তাকে এখন আসতে বল।
— এখানেই তো ছিলো। কোথায় গেলো আবার?
— তোর বউ, ভাবীদের সাজ কমপ্লিট তো?
— তুই বের হো। বাকিসব চুলোয় যাক। কাকায় যখন রেগে বলবো কিছু করতে হবে না তখন ভালো হবে।
— কিচ্ছু বলবে না। অনন্যা,ইভা, তন্বী কোথায়? ওদের একটু ডেকে দিস তো।
— তুই এখানে দাঁড়া, আমি দেখছি।
সামাদ ভাইয়া চলে গেল। এই মাসের ১৮ তারিখে ওর প্রবাস যাওয়ার ফ্লাইট ছিলো। আমার বিয়ে উপলক্ষে এক মাস সময় বাড়িয়েছে। সব রেডি হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। ঐশী, আশা, নাবিলা সব মিলে হুলস্থুল করছে। নূর আপি আমার সামনে এসে বললো,
— দেখ তো কানের দুলটা ঠিক আছে কিনা। ব্যাথা পাচ্ছি কেন?
— দাও আমি ঠিক করে দেই।
— তোর দেবররা কতদূর আছে?
— আমি জানি না। এনাজকে তো এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। ওড়না ধরবে কে কে? আমি কিন্তু নাচতে নাচতে স্টেজে উঠবো। আমার সাথে সাথে তোমরাও নাচবা।
— কেন রে আমরা নাচবো কেন? বিয়ে তো তোর। তোর বিয়ে তুই নাচবি।
আমি নূর আপির কানের দুলটা ঠিক করে দিয়ে সোফায় পা ছড়িয়ে বসে রইলাম। এতখন সব মিলে আমাকে বকে এখন হাওয়া। আমার জামাইটার সাথে ভালো করে কথাও বলতে দিলো না। অর্থি মোবাইল নিয়ে স্টেজের দিকে চলে গেছে। আমার বর মহাদোয় হলুদের স্টেজ দেখবে।
💖💖💖
অবশেষে তাদের সবার খেয়াল হলো বউ বেচারি হাত-পা ছড়িয়ে সোফায় বসে আছে।এগিয়ে এসে বাকি কাজগুলো সমাধান করতে লাগলো। আব্বু-আম্মুর সাথে রুমে ভিডিও করলো। তারপর মাথায় ওড়না ধরে স্টেজে নিয়ে যাওয়া হলো। ইভা,তন্বী,অনন্যা,অর্থি এই চারজন ওড়না ধরছে। আমি নাচতে নাচতে স্টেজে উঠছি। সব আমার কান্ড দেখে হাসছে। আমার সাথে ওরা চারজনও নাচছে। একেকজন তো বিয়ে পাগলী খেতাবও দিয়ে দিয়েছে। যে যা খুশি বলুক। আমার কি? প্রিয় মানুষটার সাথে বিয়ে হওয়ার আনন্দ তারা কি বুঝবে। স্টেজের সোফায় বসার আগেও একচোট নাচলাম। পাশে ছোট একটা সাউন্ডবক্সে বলিউডের হিট গান ছাড়া হয়েছে। অনেক কষ্ট করে বক্স ম্যানেজ করতে পেরেছি। আব্বুতো কিছুতেই গান বাজাতে দিবে না। সবাই আব্বুকে অনেকটা ধরে-বেধে রাজী করছে। সামাদ ভাইয়ার বিয়েতে বক্স বাজেনি। তাই আব্বু আরো রাজী হয়নি। অনেক কষ্টে যখন রাজী করালো তখন ছোট বক্স আনার অনুমতি দিলো। যাতে গানের শব্দ আমাদের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোন বাড়িতে না যায়। এতেই সব খুশি। গান বাজাতে দিবে এটাই অনেক।
আমার ওপর খাবারের অত্যাচার শুরু হয়ে গেছে। আব্বু-আম্মুর পর একে একে দুই চাচা-চাচী এসেছে। তারপর শাহীনুর আপু ও দুলাভাই। এরপরে তিন চাচাতো ভাই তাদের বউ নিয়ে স্টেজে উঠলো। সবাই খাইয়ে খাইয়ে আমাকে আজ ঢোল বানিয়ে দিবে। সামাদ ভাইয়া এক পিস মিষ্টি বাড়িয়ে দিতেই আমি নাক,মুখ সিটকে বললাম,
— ভাইয়া মিষ্টি খাবো না। অন্য কিছু দে।
— পায়েস খাবি?
— না অন্য কিছু।
— তুই মিষ্টিই খাবি। আমাকেও হলুদের দিন ইচ্ছে মতো খাইয়ে গেছিস।
— প্লেটে পাঁচশত টাকা রেখে যাস।
— তোকে খাইয়ে দিবো আবার টাকাও দিবো। এত শখ নাকি।
— কিপ্টা টাকা দিয়ে যাবি।
— ময়দা মেখে তো ময়দা সুন্দরী হয়ে গেছিস। একেকটা কয়েক কেজি আটা-ময়দা মাখছিস তোরা?
— তোর হলুদে সাজতে পারি নাই। সেই দুঃখে আমি শেষ। তাই নিজের হলুদে সাজছি। ও মারিয়া ভাবি দেখছো কিভাবে অপমান করলো আমাদের? আমরা বলে ময়দা সুন্দরী।
মারিয়া ভাবি চোখ পাকিয়ে সামাদ ভাইয়াকে বললো,
— কি বললেন আপনি?
আমি আস্তে করে সামাদ ভাইয়ার সামনে মুখ নিয়ে বললাম,
— দিয়েছি তোর বউকে রাগিয়ে। এবার সামলা গিয়ে।
মারিয়া ভাবি মুখ ঝামটা মেরে গটগট পায়ে স্টেজ থেকে নেমে গেলো। যাওয়ার আগে আমি ভাবীকে একটা চোখ মারলাম। ভাবী খিলখিল করে হেসে উঠলো। সামাদ ভাইয়া দ্রুত পায়ে তার বউয়ের পেছনে ছুটলো। একে একে বাসার সবাই হলুদের ছোঁয়া দিয়ে গেলো। সাথে খাবারের অত্যাচার। পাক্কা দুই ঘন্টা পর সবার হলুদ দেয়া শেষ হলো।
চুপচাপ স্টেজে বসে আছি। নূর আপির দিকে তাকিয়ে দেখলাম বিষন্ন মনে একটা খালি প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তায়াং ভাইয়া নেই বলে নিশ্চয়ই মন খারাপ তার। সবাই যার যার স্বামীর সাথে এসে আমাকে হলুদ ছুঁয়ে যাচ্ছে। এতে হয়তো তারও খারাপ লাগছে। তার মন ভালো করার জন্যও আমি তাকে ডেকে বললাম,
— ও নূর আপি বিরিয়ানি তো এখনো হয়নি। তুমি প্লেট নিয়ে এখুনি দাঁড়ায় আছো। মাত্র মাংস কষাইতেছে। বিরিয়ানি হতে দেরী আছে। বেশি খুদা লাগলে এদিকে আসো আমার সামনে বহুত খাবার আছে। এগুলোর থেকে খেয়ে আমার ওপর খাবারের অত্যাচার কমিয়ে দাও।
নূর আপি চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বললো,
— আসতোছি আমি। বিরিয়ানির জন্য দাঁড়ায় আছি তোকে কে বললো?শাহিনুর আপু এটা ধরায় দিলো। তোর মাথায় এই প্লেট ভাঙবো আমি।
— আরে রেগো না। এক প্লেট বিরিয়ানিই তো। তুমি যেভাবে এক দৃষ্টিতে বিরিয়ানির ডেকচির দিকে তাকিয়ে আছো। তাতে তো আমার ভয় করছে। তোমার নজরে আবার বাকি সবার পেট ব্যাথা না করে।
নূর আপি স্টেজে উঠে দুম করে আমার পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিলো। আমি পিঠ বাঁকিয়ে আহ করে চিৎকার করে উঠলাম। হাসতে হাসতে বললো,
— আমি বিরিয়ানির ডেকচির দিকে তাকিয়ে আছি?
— তাই তো দেখলাম। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই বরাবরি বিরিয়ানির ডেকচিতে বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। কে জানে তাকিয়ে তাকিয়ে লালা ফেলছো কিনা। আমি তো দেখি নাই।
নূর আপি আমার কান টেনে ধরে বললো,
— তোকে এখন কিন্তু ইচ্ছে মতো মারবো।
— আহ্, নূর আপি ছাড়ো। ব্যাথা পাচ্ছি তো।
নূর আপি কান ছেড়ে দিয়ে শাসানো গলায় বললো,
— হলুদের স্টেজে বসেও দুষ্টমী করছিস?
— কি করবো গো নূর আপি! বিয়েটা আমার এনজিও সংস্থার সাথে হচ্ছে তাই আমি অনেক খুশি। কিন্তু সবাইকে ছেড়ে যাবো এই কথাটা যখুনি মনে হচ্ছে বুক ফেটে কান্না আসছে। সেগুলো কে দমাতে এখন আমাকে দুষ্টুমিতেই মেতে থাকতে হবে। আব্বু-আম্মুর মুখের দিকে তাকালে আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়।
মুহুর্তে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। চোখের কোণে আসা পানিকে নিচে পরতে দিলাম না। টিস্যু দিয়ে মুছে ফেললাম। ক্যামেরাম্যান জিজ্ঞেস করলো
— আপু, আরো কেউ বাকি আছে?
এদিকে শারমিন আসেনি। আরো মানুষ আছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে তাকে বললাম,
— ভাইয়া আরো মানুষ আছে। আমার একমাত্র দেবর আসছে। সাথে বরের বন্ধুরা।
— আচ্ছা আপু সমস্যা নেই।
ওদের জন্য অপেক্ষা করতে বলে আবারও চুপ করে বসলাম। আব্বু রান্নার তদারকি করছে। আম্মু রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পরছে। সাউন্ড বক্সে অক্ষয় কুমার ও ক্যাটরিনার নতুন মুভির নাযা গানটা বাজছে। সাউন্ড বক্সে গান বাজানোর দায়িত্বে আছে মুহিন।
— আমাকে ছাড়া হলুদের অনুষ্ঠান শেষ।
তায়াং ভাইয়ার কন্ঠ শুনে চমকে উঠলাম। সামনে তাকিয়ে অবাক। ভাইয়া দুই হাত কোমড়ে রেখে আমার দিকে প্রশ্নবোধক চাহনিতে তাকিয়ে আছে। ভাইয়াকে দেখে ঠিক কতটা খুশি হয়েছি তা বলে বোঝাতে পারবো না। নূর আপির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তারও আমার মতো রিয়েকশন। আমি দৌড়ে গিয়ে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম। ভাইয়া আমাকে আশ্বস্ত গলায় বললো,
— আরে কাঁদছিস কেন? আমি তো এসে পরছি তাই না। বেশি কাঁদলে সব মেকআপ নষ্ট হয়ে রিয়েল শাঁকচুন্নিতে পরিণত হবে।
তবুও আমি ওকে ছাড়লাম না। নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
— আমি ভাবছি তুই আসবি না।
— আমার বোনের গায়ে হলুদে আমি থাকবো না। তা কি হয় বল? তাই তো না এসে পারলাম না। এখন কান্না বন্ধ কর।
— আমি অনেক খুশি হইছি ভাইয়া।
— তোর খুশির জন্যই আসছি আমি।
— আয় আমাকে হলুদ দিবি।
— না তোর বিয়ের কুকুর তাড়াতে আসছি আমি।তোকে হলুদ দিয়ে কি করবো বল? যেই কাজে আসছি তাই করি তাহলে।
আমি ভাইয়াকে ছেড়ে ওর বাহুতে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বললাম,
— এনাজ এই কথাও বলে দিয়েছে।
— হুম। এবার একটু দূরে সর তো। আমাকে একটু হাওয়া-বাতাস খেতে দে। এতখন বিশাল এক হাতি আমাকে জাপ্টে ধরে ছিলো। নড়তে-চড়তেও পারিনি।
আমি চোখ দুটো ছোট ছোট করে চেচিয়ে বললাম,
— তায়াং ভাইয়া।
— হু অনেক ভয় পাইছি। এবার বোন জলদী গিয়ে স্টেজে বস। তোকে হলুদ দিয়ে আবার যেতে হবে আমাদের।
— বাকি সবাই কোথায়?
— আসতেছে।
— তোর জন্য নূর আপিও আমায় হলুদ দেয়নি।
— তাই নাকি। তাহলে আমরা জামাই-বউ একসাথে হলুদ ছোঁয়াই।কোথায় আমার বউ?
— দেখ এদিকেই আছে।ক্যামেরাম্যান কোথায়?
তায়াং ভাইয়া নূর আপির সাথে কথা বলতে চলে গেল। আমি ক্যামেরাম্যানকে ডাকতেই সে হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে এসে বললো,
— জ্বি আপু। কিছু বলবেন?
— মানুষ চলে আসছে। ভিডিও শুরু করেন।
— ওকে আপু।
শারমিন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে।আকস্মিকতায় আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। শারমিনকে ছাড়িয়ে বললাম,
— এই তোদের আসার সময় হলো। দশটা বেজে গেছে প্রায়।
শারমিন ঠোঁট উল্টে বললো,
— আমার কোন দোষ নেই। এরাই দেরী করে বের হয়েছে। বৃহস্পতিবার কি যাম থাকে জানিসই তো।ভাগ্য ভালো আমি পুরো রেডি হয়ে এসেছি। নয়তো আজকে আমার আর শাড়ি পরতে হতো না।
— একটু জিরিয়ে নে।
শারমিনকে চেয়ার টেনে বসিয়ে দিলাম।তওহিদ ভাইয়া, এনাম,রওনক সাথে কুশলাদি বিনিময় করলাম। এনাম চোখ দুটো গোল গোল করে বললো,
— মা শা আল্লাহ। ভাবী আপনাকে আজ যা লাগছে না। ভাইয়া সরাসরি দেখলে সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যেতো।
— শুকরিয়া ভাইয়া। দাঁড়ায় আছেন কেন? বসেন আপনারা। এই অনন্যা,অর্থি এদিকে একটু আসিস।
রওনকের চোখ দুটো এদিক সেদিক চলমান। বোঝাই যাচ্ছে তন্বীকে খুঁজছে। আমি তাকে বললাম,
— তন্বী, এদিকেই আছে। ভালো করে খুঁজে দেখেন।
— না মানে আমি এমনি দেখছিলাম।
— কাউকে খুঁজছিলেন তা আমি জানি। এত ভনিতা করতে হবে না।
এনাম আমার হাতে বিয়ের শাড়ি,গহনার প্যাকেট তুলে দিয়ে বললো,
— ভাবী, যা করার একটু তাড়াতাড়ি করেন। আমাদের আবার ফিরতে হবে। ঢাকায় গিয়ে আবার ভাইয়াকে হলুদ ছোঁয়াবো।
— তাই বলে আপ্যায়ন করবো না? এটা কোন কথা হলো নাকি। আপনারা বসেন।
আমি ইভাকে ডেকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে বলে দিলাম। এর ফাঁকে তারা সবাই হলুদ ছোঁয়াবে।প্রথমে তায়াং ভাইয়া ও নূর আপি তারপর তওহিদ ভাইয়া ও শারমিন। তন্বী রওনকের সাথে আরেকবার হলুদ ছোঁয়াতে এলো। এনাম একা উঠে আমার সাথে বসে আফসোসের সুরে বললো,
— আমার তো কেউ নেই তাই আমি একাই দিয়ে গেলাম। সবাই জোড়া, জোড়া। এদের মাঝখানে নিজেকে অসহায় শিশু মনে হচ্ছে।
আমি ফিক করে হেসে উঠলাম। হলুদের পর্ব অবশেষে শেষ হলো। এখন মেহেদী দেওয়ার পালা। ইভা, তন্বী দুজনে মেহেদী নিয়ে দুই পাশে বসলো। ক্যামেরাম্যান ভিডিও শুরু করছে। তায়াং ভাইয়ারা বিদায় নিয়ে চলে গেল। আধা ঘণ্টার বেশি থাকেনি। ওদের ফিরতে হবে বলে কেউ জোরও করেনি। বসে থাকতে থাকতে পিঠ ধরে গেছে। পেট পুরো ভর্তি। নড়তে-চড়তেও পারছি না। নিজেকে এখন মোটাসোটা হাতি মনে হচ্ছে। এখন আবার মেহেদী নিয়ে বসে থাকতে হবে। বিয়ে তো নয় আমার ওপর অত্যাচার। তার মধ্যে সারারাত জেগে থাকতে হবে। এই কথা মনে আসতেই আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আমি জানি একটুর জন্যও চোখ লাগাতে পারবো না। এভাবে আমাকে না জ্বালালেও পারতো😖।