আমি ফট করে চোখ দুটো বড় বড় করে জোরে চেচিয়ে বলে উঠলাম,
— ভাই ওরে মাইরা ফালান নয়তো কাইট্টা ফালান। কিংবা বেইচা দেন।তাতে আমার কিচ্ছু আসে-যায় না।কিন্তু দয়া করে ওর কিডনি দুটোর যাতে কিছু না হয়।ঐ দুটো আমাকে দিয়ে দিয়েন।আমার বহুদিনের শখ ওর কিডনি দুটো বেঁচে আইফোন কিনবো।আপনারা প্লিজ আমার এই অনুরোধটা রাইখেন।আমার আইফোন কেনার শখটারে মাটি কইরেন না।আমি তায়াং ভাইয়ার কিডনি বেঁচে আইফোন কিনতে চাই।
আমার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আমিও তাদের সাথে তাল মিলালাম।কিন্তু বেশি সময় দাঁত কেলানো হলো না।তায়াং ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দমে গেলাম।সে যে দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু হজম করে নিচ্ছে,তা আমি ভালো করে জানি। তবে পরে যে এর অবস্থা কি হবে তা একমাত্র আল্লাহ মালুম।আমার সাধের চুলগুলো আস্ত থাকলেই হয়।এর তো আবার আমার চুল টানাটানির অভ্যাস আছে। তায়াং ভাইয়ার সব ফ্রেন্ডরা এসেছে। একজন আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো,
—তায়াং,এই মেয়েটাকে তো ঠিক চিনলাম না।
তায়াং ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে উত্তর দিলো,
—শাঁকচুন্নিকে চিনে কি করবি?এ আমাদের বাসার পাশের ড্রেনের সামনে কাগজ কুড়ায়।আমরা আবার দয়ালু মানুষ তো।তাই তিনবেলা খাবার দেই।আজ অনুষ্ঠান আছে জেনে গতকাল থেকে বায়না ধরেছে এখানে আসবে।তাই অসহায় মেয়েটাকে নিয়ে এলাম।
আমি চেচিয়ে বলে উঠলাম,
—তায়াং ভাইয়া ভালো হবে না কিন্তু 😤।
এতে সবাই আরেকদফা হেসে নিলো।তায়াং ভাইয়া
আমার দিকে এগিয়ে এসে কিছুটা ঝুঁকে নিচুস্বরে বললো,
—তোকে শুধু একবার হাতের নাগালে পাই। তারপর মজা দেখাবো।খুব বেড়েছিস তুই। সকাল থেকে কিছু বলছি না বলে পার পেয়ে গেছিস তা ভাবিস না।আমি সব জমিয়ে রাখছি।একসাথে ফেরত দিবো।বন্ধুদের সামনে আমি কোন সিনক্রিয়েট করতে চাই না।তাই এখন বেঁচে গেলি।
ভাইয়ার এই ঠান্ডা স্বরের ধমকি অন্য সময় হলে আমি ভয় পেতাম।কিন্তু এখন যেহেতু এত মানুষের মাঝে আমাকে কিছু বলবে না তাই আমি একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে ভেংচি কাটলাম।তাতে যেনো ভাইয়া আরো চটে গেলো।আমার সামনে থেকে সরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—আরে কনসার্ট শুরু হয়ে যাবে জলদী চল।এখন না গেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশা মারতে হবে।
সবাই কনসার্টের স্টেজের দিকে ছুটলো।ভাইয়া যে খুব শান্তপর্ণে আমার পরিচয়টা লুকালো তা আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝে গেছি। কিন্তু কেন তার উত্তর আমার ছোট মাথায় খুঁজেও পেলাম না।প্রায় ১০/১২ সারি পর আমরা বসলাম।আমার সাথে এনাজ আর তায়াং ভাইয়ার সাথে তন্বী বসেছে।এনাজ মহোদয় বসে বসে মোবাইল চালাচ্ছে। আমি কিছুটা উঁকি মেরে তার মোবাইলের দিকে তাকালাম।এতে সে সাথে সাথে মাথা উঠিয়ে আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।আমি দাঁতগুলো দেখিয়ে মিনমিন করে বললাম,
—কিছু না।
উনি কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার মোবাইলে মনোযোগ দিলেন।উনি এতো মনোযোগ সহকারে গেম খেলছে যে আশেপাশের আর কিছুতে তার মনোযোগ নেই। কনসার্ট এখনো শুরু হয়নি।যাদেরকে গান গাইতে আনবে তারা এখনো এসে পৌছায়নি। আমার আবার চুপচাপ বসে থাকতে একটুও ভালো লাগে না।কি করা যায় তাই ভাবছিলাম।তায়াং ভাইয়াকে এখন জ্বালানো যাবে না। সারাদিন যেই ডোজ দিয়েছি তাতে আমি সবার সামনে দু-চার ঘা খেতে পারি।তখুনি আমার এনাজের কথা মাথায় এলো।আমি এনাজকে জ্বালানোর উদ্দেশ্য বলে উঠলাম,
—কি খেলেন ভাইয়া?
আমার কথা শুনে এনাজ এমন করে তাকালো মনে হয় আমি না জানি কতবড় অপরাধ করে ফেলেছি।আমি বুঝতে না পেরে আবারো জিজ্ঞেস করলাম।
—কি হয়েছে ভাইয়া?এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?
এবার যেনো সে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। একে আসার পর থেকে প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে বেশি একটা কথা বলতে দেখিনি।বেশ গম্ভীর টাইপের ছেলে।তাকে এভাবে রাগতে দেখে আমিও মনে মনে ভয় পেয়ে গেলাম।সে কিছুটা রাগ মিশ্রিত কন্ঠ উত্তর দিলো।
—কে ভাইয়া?আমি কারো ভাইয়া নই।ভাইয়া বললে তোমার বাপের সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে। আর আমার ভাগ আমি আদায় করে নিতে পারি। তাই পরেরবার ভাইয়া বললে সোজা তোমার বাবার কাছে গিয়ে সম্পত্তির ভাগ নিবো।সো বি কেয়ারফুল। আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবে না।
—তাহলে কি আঙ্কেল বলবো নাকি মামা🤔?
—এই মেয়ে আমাকে দেখে কি তোমার আঙ্কেল কিংবা মামার বয়সী মনে হয়?
—আপনিই তো বললেন ভাইয়া বলতে না।আপনাকে ডাকতে হলে তো আমাকে কোনকিছু সম্বোধন করতে হবে। নাম ধরে তো ডাকতে পারি না আমি।তাই আঙ্কেল বা মামা বেটার।
—তোমাকে কিছুই বলতে হবে না। আমার নাম ধরে ডেকো।
—তোওবা তোওবা কি বলেন?আপনি আমার বড়।আপনাকে কি আমি নাম ধরে ডাকতে পারি। এতে আপনাকে অসম্মান করা হয়।
—তুমি আবার সম্মান-অসম্মানও বুঝো নাকি?
—দেখুন আমি শুধুমাত্র তায়াং ভাইয়ার সাথেই মজা করি।এছাড়া বাকি সবাইকে যথাসাধ্য সম্মান করার চেষ্টা করি।তাই তায়াং ভাইয়া আর আমার বন্ডিং দেখে কখনো আমাকে বিবেচনা করবেন না।
—হু বুঝতে পারছি। তবে তুমিও আমায় কোন ভাইয়া,মামা, আঙ্কেল এসব নামে ডাকতে পারবে না। মন চাইলে নাম ধরে ডাকবে। নয়তো কোনকিছু বলে ডাকতে হবে না।
—আপনার পুরো নাম কি?
—কেন?
—আরে বলুন না।
—এনাজ আহমেদ।
—এনাজ নামটা কি A দিয়ে নাকি E দিয়ে?
—A দিয়ে।
—কিন্তু এনাজ লিখতে তো E হয়।
—হ্যাঁ হয়।কিন্তু আমার বাবা-মা ছোট বেলায় A দিয়ে রেখেছে। তাই আমার নাম হলো Anaj। অনেক সময়
আমরা একেক নামের উচ্চারণ একেকভাবে করি।তার ক্ষেত্রে একেক অক্ষর ব্যবহার করি।আমার এক ফ্রেন্ডের নাম অনন্যা।ওর নামটা কিন্তু O দিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু ওর নামটা A দিয়ে লিখতে হয়।এটা যার যার ইচ্ছা। যে যেভাবে তাদের সন্তানের নাম লিখে।তাই বলে কোনটা ভুল নয়।আমার নামও তাই Anaj নট Enaj. বুঝতে পেরেছো।আরেকটা উদাহরণ দেই তোমাকে, তোমার বোনের নাম তো ইভা।ইভা লিখতে “I” হওয়ার কথা কিন্তু E দিয়ে কেন লিখো? তাহলে তো এভা হয়ে যাবে।এখানে E শব্দটা বাংলার ই শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। তাই বলে কি ওর নাম ভুল নাকি?
— না ভুল নয়।কিন্তু আমার বোনের নাম আপনি জানলেন কি করে?
—তায়াং বলেছে।
— A দিয়ে আপনার নাম।তাইতো?
—হ্যাঁ।
— এনাজ আহমেদ লিখতে তাহলে দুটো A ব্যাবহৃত হয়।তাই আমি আপনাকে A2 বলে ডাকবো।তাহলে আপনাকে নাম ধরেও ডাকতে হলো না। আর ভাইয়া, মামা,চাচাও বলতে হলো না।
—এজ ইউর উইশ।
—নাহ্ এটা অনেক ভালো নাম হয়ে যায়।আমি বরং আপনাকে এনজিও সংস্থা বলে ডাকবো।আর রাগ উঠলে আনাইজ্জা কলা।
—কি বললে?
—নাহ কিছু না।আপনি গেমে হেরে যাচ্ছেন।সেদিকে নজর দিন।
এনাজ কিছু সময় কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আবার খেলায় নজর দিলো।আমরা যেদিকে বসেছি সেখানকার ঘাসগুলো অনেক বড় বড়।হঠাৎ আমার পায়ের কাছে কিছু একটার সুরসুরি পেতেই আমি “ও মাগো”বলে লাফিয়ে উঠলাম।এতে আশেপাশের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।তায়াং ভাইয়া, এনাজ দুজনেই একসাথে বলে উঠলো,
—কি হয়েছে?
—পায়ের কাছে কি জানি লাগলো?
আশেপাশের সবাই জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে, কি হয়েছে? তায়াং ভাইয়া বললো,
—কিছু হয়নি।আপনারা আপনাদের কাজে মনোযোগ দিন।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে রাগী কন্ঠে বললো,
—এতো জোরে চেচিয়ে ছাগলের মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করছিস কেন?
—আমার পায়ে কি জানি লাগলো।আমি এখানে বসবো না।কুটুস করে একটা কামড়ও দিয়েছে।
এনাজ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—কোথায় কামড় দিয়েছে? অনেক জ্বালা করছে? বরফ ধরতে হবে নাকি?
আমি মুখ ফুলিয়ে উত্তর দিলাম, ” কিছুই করতে হবে না। ” তারপর ধপ করে চেয়ারে বসে পরলাম।এবার ঘটলো আরেক বিপত্তি। একজন চেয়ার রাখতে গিয়ে আমার পায়ের ওপর রেখে বসে পরলো।চায়েরের এক পায়া আমার পায়ের ওপর রাখা।আবারো চেচিয়ে উঠলাম।পেছন থেকে চিৎকারের শব্দ পেয়ে লোকটা জলদী তার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো।ততক্ষণে আমার পায়ে ভালো ব্যাথা পেয়ে গেছি।তায়াং ভাইয়া ও এনাজ দুজনে একসাথে লোকটাকে ইচ্ছে মতো ধুলো।আমি পা ধরে চেয়ারে বসে আছি। প্রচুর জ্বলছে।এনাজ সেখান থেকে কোথায় জানি চলে গেল।কিছু সময় পর কতগুলো বরফের টুকরো আর চারটা কোণ আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো।আমার হাতে একটা কোণ আইসক্রিম ধরিয়ে দিয়ে বললো,
—নাও এটা খেতে থাকো।ততক্ষণে আমি তোমার পায়ে বরফ ডলে দেই।আশেপাশে কোন ফার্মেসীর দোকান পেলাম না।
—আরে আপনি আমার পায়ে হাত দিবেন নাকি? তার দরকার নেই। এভাবেই চলে যাবে।
আমাকে এক ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখলো।তারপর নিজে সেই জায়গায় আলতো হাতে বরফ ডলে দিতে লাগলো।বরফ ডলায় ব্যাথা অনেকটা কমলো।সাথে ফোলাটাও।তন্বী এতক্ষণ দুই কানে এয়ারফোন গুঁজে হাই ভলিউমে গান শুনছিলো।আর মোবাইলে কারো সাথে চ্যাটিং করছিলো।তাই এসবের কিছুই জানে না। আইসক্রিম নিতে ওকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই ওর হুশ ফিরলো। কানের থেকে এয়ারফোন খুলে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
—তোমার পায়ে কি হয়েছে নোভাপু?এনাজ ভাইয়া তোমার পা ধরে কি করছে? মাফ চাচ্ছে নাকি সালাম করছে।
আমি ওর পিঠে দুম করে এক কিল বসিয়ে দিয়ে বললাম,
—কিছু করছে না।তুই বরং তোর কাজ কর।
কিছু সময়ের মধ্যে কনসার্ট শুরু হয়ে গেলো।কয়েকটা পারফরমেন্সের পর এখন একটু বিরতি দিয়েছে।কিন্তু আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। দুপুরে কিছু খাইনি।ভেবেছিলাম কনসার্টে আসার আগে খেয়ে নিবো।কিন্তু তাড়াহুড়োয় সব লন্ডভন্ড।পেটের ভেতর আমার ইঁদুরে ড্রাম পেটাচ্ছে।আমি তায়াং ভাইয়াকে জোরে চেচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—ভাইয়া কনসার্ট শেষ হলে কি আমাদের বিরিয়ানি দিবে না?আমি কিন্তু বিরিয়ানি না নিয়ে বাসায় যাবো না।