আরহাম কাছে এসে ব্যস্তকন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাঁদছেন কেন?কিছু হয়েছে?কেউ কিছু বলেছে আপনাকে?’
আদওয়া মাথা নাড়লো।তিনি আবারও ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘তাহলে?’
আদওয়া উত্তর দিলো না।তিনি ওকে ধরে বসালেন।চোখমুখ মুছে দিয়ে কোমল সুরে বললেন,’কি হয়েছে?আমাকে বলুন প্লিজ?’
‘আপনি আমাকে ডির্ভোস দিয়ে দিন।’
আরহাম অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন?আপনি থাকতে চান না আমার সাথে?’
আদওয়া খুবই অনুতপ্ত সুরে বলল, ‘বিশ্বাস করুন সত্যি বলছি।আমি কখনো ভেবে দেখিনি আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।বিলিভ মি,যদি ভাবতাম আমি পাগলামি করে বিয়ে করতাম না।’
আরহাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সকালের বিষয় নিয়ে এত আপসেট হওয়ার দরকার নেই।’
‘না।আমার কথা বুঝুন।আপনি আমাকে ডির্ভোস দিয়ে দিন
মা-বাবাকে আমি বুঝাবো।আমি চলে গেলে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আগের মতো।সব!কেউ আপনাকে এরকম আঘাত দিয়ে কথা বলবে না।’
‘চুপ।আর একবারও ডির্ভোসের কথা মুখে আনবেন না।’
‘আপনি সময় নিয়ে ভেবে দেখুন।আমি না থাকলে সব আগের মতো হয়ে যাবে।’
‘আমি পারব না আপনাকে ছাড়তে।আমার সাথেই থাকতে হবে।’
******
গত হয়েছে তিনদিন।পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ওই ঘটনার রেশ কারোর মন থেকেই পুরোপুরি মুছলো না।
রাতের খাবারের আধঘন্টা পর হাফসার রুমে ফিরলেন আরহাম।ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে বিছানায় এসেই হাফসার পেটের মধ্যে লাগাতার চুমু খেতে থাকলেন।
হাফসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হলো হঠাৎ?’
‘এ কয়দিন সোনামণি, আর সোনামণির আম্মুকে ঠিকমতো ভালোবাসতে পারি নি।তাই এখন বাসছি।’
হাফসা গোলগাল চোখে চেয়ে উনাকে ঠেলে কাঁথা টেনে নিলো বুকের ওপর।হাই তুলতে তুলতে বলল,’ঘুম আসছে।কালকে ডক্টরে যাওয়ার ডেইট।আপনার মনে আছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে ঘুমান।সকাল উঠতে হবে।’
বলে অন্যপাশ ফিরে ঘুমাতে চাইলে তিনি সুরসুরি দিতেই হাফসা দম ফাটিয়ে হেসে উঠে।
বেশ সময় নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলে, ‘এমন করছেন কেন?’
‘এখন ঘুমানো এলাউ না।’
‘কেন?’
আরহাম ঘোরলাগা কন্ঠে বললেন, ‘ভালোবাসায় বিশাল ঘাটতি পড়েছে।পুষিয়ে দিন।’
হাফসা না শোনার ভান করে আবারও শুতে চাইলে তিনি কোলে নিয়ে হাফসাকে সোফায় রেখে আসেন।দায়সারা ভাবে বললেন, ‘সোফায় ঘুমাতে পারলে ঘুমান।আই ডোন্ট মাইন্ড!’
‘সোফায় কীভাবে ঘুমাবো?অসুস্থ অবস্থায় কষ্ট দিতে চাচ্ছেন আমাকে।’
‘কাঙ্ক্ষিত চাওয়া টা পূরণ করে দিন।তারপর শান্তিতে ঘুমাবেন।’
‘ঠান্ডা লাগলে কফ হবে আমার।’
‘আমি দিন-রাত যত্ন নিবো।’
‘অন্য কারো কাছে যান।’
‘একদম বুকের বা পাশটায় আঘাত দিয়ে কথা বলছেন উমায়ের।’
হাফসা চুপ হয়ে গেলো।উঠে এসে আরহামের প্রশস্ত বুক জড়িয়ে ধরে বললো,’সরি।’
আরহাম মুচকি হেসে গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখে ওর ফুলানো নাকে চুমু খেয়ে বললেন, ‘আই ওয়ান্না কিস উইর চিক!
হাফসার নীরব সম্মতিতে আরহাম অনুভূতির বিনিময় বাড়ালেন।বিনা বাঁধায়, নিদ্বিধায়,প্রেমপূর্ণ আরেকটি সুন্দর রাতের সূচনা হয়ে গেলো!
69★
আরহাম ঘড়ি খুঁজতে রুমে ঢুকে দেখলেন পুরো ড্রেসিং টেবিলে মেকাপ আইটেম এলোমেলো হয়ে আছে,বিছানায় শাড়ি এলোমেলা ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, সে কোথাও নেই।খানিক পর আদওয়া বিরক্তি নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো।চোখমুখ কুঁচকে বলল,’শাড়ি পড়তে পারছি না কি করব?’
‘ড্রেস পড়ে নিন।’
‘নাহ,শাড়ি পড়তেই হবে।’
‘কেন?’
‘মা বলেছে,ফিরানিতে শাড়ি পড়ে যেতে।’
‘ওহ।’
‘কি করব?’
‘উমায়ের তো অসুস্থ। মাইমুনার রুমে আসুন।উনি হেল্প করবেন।’
‘না,উনার কষ্ট হবে।আপনি ঠিক করে দিন’
আরহাম অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।জড়তা নিয়ে বললেন, ‘আ্ আমি কীভাবে দিব?আমি পারি না।’
‘কিছু করতে হবে না।যাস্ট আমি যে কুঁচিগুলো ভাঁজ করে দিব,ওগুলো সমান করে ধরে রাখবেন।এতটুকুই।এলোমেলো হয়ে গেছে তাই।’
আরহাম দ্বিধায় পড়ে গেলেন।আদওয়া বলল, ‘দিবেন?’
‘পারব?’
‘সহজ তো।’
আরহাম নিচু হয়ে কুঁচির ভাঁজগুলো ঠিক করে দিলেন।উঠে দেখলেন সে মুখে হাত চেপে হাসছে।
আরহাম থতমত খেয়ে গেলেন।জিজ্ঞেস করলেন,’কি হলো?’
‘এত নার্ভাস হচ্ছিলেন কেন?’
আরহাম উত্তর দিলেন না।আদওয়াকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন।অতপর মুগ্ধ নজরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘মাশাআল্লাহ।’
উনার স্বল্পবাক্যের প্রশংসাতেই আদওয়া লজ্জায় নেতিয়ে পড়লো।উনি বেরিয়ে গেলে,পুনরায় আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখলো,কোনোকিছুর কমতি হয়নি তো…!আসলেই কি ওকে সুন্দর লাগছে..!
এখুনি তারা বেরোবেন আদওয়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে।আদওয়া সবার থেকে বিদায় নিয়ে আরহামকে এসে বলল,’চলুন রেডি আমি।’
আরহাম ফোনে ব্যস্ত থেকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে এগোতে চেয়েও আটকে গেলেন আবার।ফিরে এসে ওকে আপাদমস্তক পরখ করে বললেন,’আপনি রেডি?’
আদওয়া নিজেকে আবারও স্ক্যান করে বললেন, ‘হ্যাঁ।কেন?’
‘এমনভাবে তো যাওয়া যাবে না।বোরকা নিকাব পড়ে আসুন।’
‘কেন?আমি তো আমার বাবার বাড়িই যাচ্ছি।কোনো বাইরের মেহমান ও নেই বাসায়।আর গাড়ি করেই তো নামবো গিয়ে বাড়িতে।’
‘আই ডোন্ট কেয়ার।বোরকা-নিকাব পড়ে যেতে হবে।’
আদওয়া গাল ফুলিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরহাম আগের কথাটা শক্তস্বরে পুনরায় রিপিট করে বললেন, ‘বোরকা-নিকাব পড়েই যেতে হবে।’
*****
১০৮
নতুন শ্বশুরবাড়িতে এসে দূপুরের খাবার শেষে রুমে আসতেই দেখলেন টেবিলের ওপর আদওয়ার ফোনটা বাজছে।মুখ বাড়িয়ে ডাইনিং এ তাকাতে দেখলেন, সে সায়হানকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে।ফোনটা ওর মতো বেজে বন্ধ হয়ে গেলো।টেবিল পেরিয়ে বেলকনির দিকে এগোতেই চোখের দৃষ্টি চুম্বকের মতো ফোনের ওয়ালপেপারে আটকে গেলো আরহামের।ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অতপর হেসে ফেললেন।মায়ের সাথে নিজের ছবিটা উনার ফোনের ওয়ালপেপার।পর্দা সরিয়ে বেলকনিতে এগিয়ে উমায়েরের নাম্বারে কল দিতেই সাথে সাথেই রিসিভ হলো কলটা।
সালাম কুশলাদি বিনিময় হওয়ার পর বললেন,’খাবার খেয়েছেন?’
‘উহু, আপনি?’
‘কেন?’
‘এখন খাবো।’
‘খেয়েছি আমি।আপনি খেয়ে রেডি হোন।ডক্টরে যাবো।’
‘কেন?কেন?আপনি আজকে চলে আসবেন?’
‘হ্যাঁ, একটু পরেই বেরোব।’
‘আরে না না,থাকুন না।থেকে আসুন গিয়েছেন যখন।’
‘আমি না থাকায় সময় ভালো কাটছে?’
‘এটা বলতে চাইনি।নতুন বর ফিরানিতে তো গিয়ে থাকে,তাই বলছি।’
‘এখনই আসছি।’
বলে ফোন রেখে দিলেন।একটু পরপরই উমায়েরের টেক্সট এসে ডুকলো, ‘সরি।বিকেলে আসিয়েন।গেলেনই তো ঘন্টাদূয়েক আগে।ছোট মন খারাপ করবে
সন্ধ্যার পর যাবো হসপিটাল।’
*******
বিকেলেই ফিরা হলো বাড়িতে।আদওয়ার ইচ্ছে ছিলো থাকার।আরহামের অনুমতিও ছিলো,তবুও উনার সাথেই ফিরে এলো আবার।সারা গাড়িতে মন খারাপ ছিলো।বাড়িতে ডুকার আগে আরহাম বললেন, ‘আমি তো আপনাক না করিনি থাকতে।এমন গাল ফুলিয়ে আছেন কেন?’
‘আমি একা থাকব না বলেছিলাম।’
‘উমায়েরকে নিয়ে হসপিটাল যেতে হবে।’
‘আচ্ছা।’
সে রাগ করে বেরিয়ে গেলো।আরহাম পিছু ডেকে বললেন,’আচ্ছা প্রমিস।কিছুদিন পর গিয়ে থেকে আসবো।’
মুহুর্তেই আদওয়ার সব রাগ আইসক্রিমের মতো গলে গেলো।মুচকি হেসে খুশিতে লাফাতে লাফাতে চলে গেলো বাড়ির ভেতর।
******
উমায়েরকে নিয়ে হসপিটাল থেকে ফিরতে রাত হলো বেশ।আম্মু তখন ডিনার রেডি করছিলেন।রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে দেখলেন, মাইমুনা আসে নি।
আরহাম শার্টের হাত গুটাতে গুটাতে টেবিলে বসার আগে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাইমুনা কোথায়?’
আম্মু উত্তর দিলেন, ‘বললো খিদে নেই।রিকুয়েষ্ট করলাম একটু খেয়ে নেওয়ার জন্য।আসলো না, ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়।’
আরহাম মাইমুনার রুমের দিকে এগোলেন।স্ক্যাচ হাতে বেলকনিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সে।আরহাম হঠাৎ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরায় মাইমুনা চমকে উঠলো।
আরহাম ওর চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে জিগ্গেস করলেন, ‘খাবার খেতে যান নি কেন?’
‘খিদে নেই।’
‘আমার চাঁদের কি মন খারাপ?’
আরহামের এমন সুন্দর সম্বোধনে মাইমুনা হেসে ফেললেন।বললেন, ‘উহু আপনার কথা মনে পড়ছিলো খুব।’
‘এই তো পাশে আছি।’
‘আজকে চাঁদ দেখতে মন চাইছে আপনার সাথে।’
‘ঠিক আছে।দূটো চাঁদ দেখবো একসাথে।বাট আগে খেয়ে নিতে হবে।’
মাইমুনা এমন প্রস্তাব নাকোচ করে বলল, ‘সত্যি খিদে নেই।আপনি খেয়ে আসুন আমি অপেক্ষা করি।’
‘আপনি না আসলে খাবো না।আপনি আসুন।একেবারে অল্প একটু খেয়ে নিবেন।’
মাইমুনা হেসে আরহামের সাথেই ডাইনিং এ ফিরলো।আরহাম ওর প্লেটে খাবার তুলে দিলেন।প্রসঙ্গ চলছিলো, আব্বুর স্পেনে ফিরা নিয়ে।কুরবানির ঈদের পরেই উনি ফিরে যেতে চাইলে আরহাম এমন প্রস্তাবে বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘আপনি আর স্পেন যাবেন না আব্বু।দেশে থাকবেন আমাদের সাথে।’
‘আর বিজনেস?’
‘জানি না।’
‘আমি ছুটিতে আসবো তো।’
‘বিজনেস তো দেশেও ট্রান্সফার করা যায়।আমাদের ফ্যাক্টরি বড় করে নিবো।সো-রুম বানাবো।’
‘এত সহজ হবে না বিষয়টা।’
‘চেষ্টা তো করা যাবে।কিন্তু আপনি পরিবার ছেড়ে দীর্ঘ প্রবাস জীবনকে বেছে নিবেন?
‘তাহলে তুমি যাও।’
‘আচ্ছা।’
আরহামের একেবারেই সহজ উত্তরে তিনজোড়া চক্ষু চুম্বকের মতো স্থির হলো আরহামের মুখাবয়বে।এহেন কান্ডে আব্বু-আম্মু দূজনে হেসে ফেললেন।
‘তুমার তিন স্ত্রী থাকতেই পারবে না তুমাকে ছাড়া।আমার তো একজন।আমাকেই যেতে দাও।’
বাবার এমন সরল কৌতুকে হেসে ফেললেন সবাই।
*******
বেলকনির গ্লাস পেরিয়ে আসা একটুকরো চাঁদের আলোয় ঘরময় হালকা আলোকিত।আরহামের বক্ষবন্ধনে আবদ্ধ থাকা মাইমুনা যেনো আগের দিনে হারিয়ে মাতুর!এখন যেভাবে প্রিয়তমের বক্ষে আহ্লাদিত বন্ধনে নিঘোর রজনী কাটানোর আকুল প্রত্যাশায় থাকতে হয়!তেমনি আগে আগে প্রতিটা দিন এভাবেই আরহাম ভালোবাসায় মুড়িয়ে দিতেন।সময় হারিয়ে গেছে,প্রিয়তমের দায়িত্ব ভাগ হয়েছে।কিন্তু মাইমুনার অবচেতন মন এখনো যেন চায়,সবকিছু আগের মতো হয়ে যাক!
আরহাম মাইমুনার কর্ণে উষ্ণ স্পর্শ মেখে বললেন, ‘ঘুমাবে না হানি?’
‘উহু।’
‘মেডিসিন নেন নি আজকে?’
‘আমি জেগে থাকায় বিরক্ত হচ্ছেন?’
‘অবশ্যই অবশ্যই না।মেডিসিন নিলে তো এগারোটার আগেই ঘুমিয়ে যাওয়ার কথা।এখন দূটো বাজে।’
‘নেইনি।নিলে আপনার সাথে এমন সুন্দর মুহুর্ত উপভোগ করতে পারতাম?’
‘সমস্যা হবে তো।’
মাইমুনা অসন্তুষ্ট সুরে বলল, ‘শুধু ওষুধের ওপর জীবন টা ভালো লাগে না।আমি কেন একটা সাধারণ জীবন উপভোগ করতে পারি না?’
‘ইটস এ্যা ওয়ান কাউন্ড ওব এক্সাম কিউটিপাই।আল্লাহ যাকে বেশি পছন্দ করেন,তাকে বেশি বেশি পরিক্ষায় ফেলেন।হতাশা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।সো,ডোন্ট বি ডিজাপয়েন্টেড।আল্লাহ ইজ অলওয়েজ, ইন এভরি টাইম,ইন এভরি সেকেন্ডস ইজ উইথ আস!’
মাইমুনার হতাশা কেটে গেলো মুহুর্তেই।মুখ উঁচিয়ে আরহামের শার্টের ভাঁজে বুকের বা পাশে চুমু খেয়ে পুনরায় জড়িয়ে ধরলো আবেশে।আরহাম অন্যমনষ্ক হয়ে কিছু ভাবতে ভাবতে বললেন, ‘এই বছরের শেষ দিকে আপনাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাবো।মাএ এক মাসের থেরাপি দিয়ে নিলে আর ওষুধ লাগবে না।প্লিজ এইবার আর মানা করবেন না প্লিজ।’
‘থেরাপি দিয়ে কী হবে?আমি তো আর হাঁটতে পারবো না!’
‘আবারও হতাশা?’
‘সরি।’
মাইমুনা ভাবুক হয়ে বলল,’আচ্ছা শাহ!আপনি আমাদের সাথে আপনি আপনি করে কথা বলেন কেন?’
‘আপনারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান,আর আমানত।তাই আপনাদের আপনি সম্বোধনে সর্বোচ্চ সম্মানে রাখতে চাই।’
মাইমুনা ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল, ‘আপনার কথাগুলো এত ভালো লাগে কেন?ঘুম আসছে।’
‘হু ঘুমান।’
মাইমুনার চোখ দূটো পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত উষ্ণ স্পর্শ পড়তে থাকলো কপালে,গালে,নাকে,চোখের পাতায়!মাইমুনা প্রশান্তির হাসি হাসলো।শত দূ:খ, আফসোস আর হতাশার পর আরহামের একটু উপস্থিতি যেনো মাইমুনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আনন্দ বইয়ে দেয়!
*****
নাস্তা শেষে রুমে ফিরলেন আরহাম।আদওয়া তড়িৎ এসে বসে রইলো যেনো কতটা সময় আরহামকে না দেখে থেকেছে।
‘গতদিনের আগের দিন ছোট আপুর রুমে ঘুমিয়েছেন।গতদিন বড় আপুর রুমে।আজকে আমার রুমে ঘুমাবেন তাই না?’
আরহাম ল্যাপটপে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন, ‘উহু।’
আদওয়ার উৎসুক চেহারা ধপ করে নিভে গেলো।জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন?’
‘আমি রুটিন করে কারো সাথে ঘুমাই না।যখন যেদিন যার ঘরে থাকতে মন চায়।’
আদওয়ার নিজেকে কেমন ছোট ছোট লাগলো।অস্বস্তি ঢাকতে হাতে একটা বই তুলে নিয়ে বারান্দায় গেলো তাতে মনোযোগ দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলো।
আরহাম বেরিয়ে গেলেন ল্যাপটপ নিয়ে।
রুমে গিয়ে রেডি হয়ে এসে হাফসার রুমে ডুকতে দেখলেন বাচ্চাদের মতো হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে আছে সে।আরহাম মুচকি হেসে কাঁথা তুলে দিলেন শরীরে।চোখেমুখে ভালোবাসা এঁকে দিয়ে ফোনে একটা টেক্সট দিলেন।তারপর বেরিয়ে গেলেন।
মাইমুনার রুম থেকে বেরিয়ে আদওয়ার রুমে যেতে দেখলেন, সে বই পড়ছে।
আরহাম এগিয়ে গিয়ে আচমকা চুমু খেয়ে বসলেন তাঁর কপালে।আদওয়া বিদ্যুৎ স্পর্শের মতো লাফিয়ে উঠলো।
এমন ঘটনা বিশ্বাস করতে নেএপল্লব বৃহৎ আকার ধারণ করলো।
‘ক্ ক্ কি করলেন এইমাএ?’
‘কিস করলাম।’
আদওয়া লজ্জায় লাল হয়ে যেতে লাগলো মুহূর্তেই।
আরহাম সামনের সোফায় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলেন,
‘পড়াশোনা করার ইচ্ছা আছে?’
‘কোনোকালেই ছিলো না।’
‘কেন?বিয়ে হয়ে গেছে বলে?’
‘আরে না।পড়াশোনা করে লস ছাড়া লাভ নেই।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ।আমি সাবজেক্টে সাবজেক্টে যতবার ফেইল করেছি, আপনার সারা জীবনের এক্সাম আর ডিগ্রিতে ততবার পাশও মনে হয় করেননি।’
আরহাম হেসে ফেললেন।
‘করতে চাইলে করতে পারেন ইসলামিক সাবজেক্ট নিয়ে।ইসলামিক ইউভার্সিটিতে।’
‘ঘরে আস্ত একটা ইসলামিক ক্যাম্পাস থাকতে ভার্সিটি যাওয়া লাগবে কেন!’
‘আচ্ছা।আপনার ইচ্ছা।আসি।’
‘কখন.. ‘
ফেরার কথা জিজ্ঞেস করতে চেয়ে একটু আগের অবহেলা পাওয়ার কথা মনে পড়তেই থেমে গেলো।মুখে সৌজন্যমূলক হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘সাবধানে যাবেন।’
আরহাম সালাম বিনিময় করে বেরিয়ে গেলেন।
আদওয়া কপালে হাত রেখে বুঝলো, হঠাৎ করে মাথার টেম্পারেচার বেড়ে গেছে ওর।লোকটা কাছে আসলেই হৃদপিণ্ড ধুকপুক ধুকপুক করে।এমন রোগের ওষুধ কি!
******
রুম গুছিয়ে ডাইনিং এ আসতে দেখলো আম্মু রান্না করছেন।উনার কাছে এসে হেল্প করতে চাইলে তিনি বাঁধা দিয়ে বসেন।
‘আমি সত্যি পারি না আম্মু।শিখতে তো হবে।সো আপনি বলে দিন কোন ভেজিটেবল কেটে দিতে হবে।ফটাফট কেটে ধুয়ে দিব।কীভাবে রান্না করবো,আপনি যাস্ট ডিরেকশন দিবেন,আমি রান্না করে ফেলবো।এসব কোনো বিষয় না।’
আম্মু হেসে এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে বললেন, ‘ঠিক তোমার মতোই আমারও একটা তিড়িং বিড়িং মেয়ে আছে।ছোটবেলা বাসায় যতক্ষণ থাকতো কানে ফোন জয়েন্ট।খেতে গেলেও বাবার সাথে কথা বলা লাগতো ঠিক পড়তে বসার আগেও তেমনি।আর আরহাম সারাদিন আমার পিছে পিছে।আমার কাপড় ধুয়ে দিত,চা করে দিত,আমি অসুস্থ হলে দিনরাত আমার সেবা করতো,এখনও আমার মশারি টাঙ্গিয়ে দেয়।’
‘ভেরী ইম্প্রেসিভ!’
‘বাই দা ওয়ে,আরহাম তোমার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করে তো?’
70★
‘বাই দা ওয়ে,আরহাম তোমার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করে তো?’
‘জ্বি কেন?’
‘হুটহাট তোমাদের সম্পর্ক টা হয়েছে।কিন্তু তুমি যখন তাঁর দায়িত্বে পড়ে গেছো,অবহেলা করবে না।সমতা করবে।’
‘আচ্ছা।ছোট আপু কোথায় নিচে নামতে দেখলাম না?’
‘মাথাব্যথা করছে বলছিলো।এখুনি চা করে নিবো।’
‘আপু কি অসুস্থ?’
‘না।’
‘রান্না করার সার্ভেন্ট নেই?’
‘বাপ-ছেলে ঘরের মানুষের রান্না খায়।সার্ভেন্টদের হাতের রান্না খাওয়ার অভ্যেস নেই।’
******
‘আসসালামু আলাইকুম।একটা ভালোবাসা দিতে এসে দেখি,সোণামণি,আর সোনামণির আম্মু গভীর ঘুমে।বাবুর সাথে মিশে থাকতে থাকতে আপনার বিহ্যাবিওর ও বাবু’দের মতো হয়ে যাচ্ছে হোমাপাখি।আই ইনজয়।উঠে অবশ্যই খেয়ে নিবেন।আমি আপনার সুন্দর ভয়েস টা শোনার অপেক্ষায়।ফ্রী হয়ে অবশ্যই কল দিবেন।’
আরহামের টেক্সট পড়ে ভাবুক হয়ে পড়লো সে।রাত-বিরেতে ফ্রিজ থেকে লুকিয়ে আইসক্রিম খাওয়া বা ভাত না খেয়ে একের পর এক চিপসের প্যাকেট সাবাড় করা কি উনার চোখে পড়ে গেলো!
*******
ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতেই আদওয়া ডোর খুলে রুমে চলে গেলো। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা।অফিস শেষে দূরবর্তী অঞ্চলের ফ্যাক্টরিগুলো পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে নানা ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়।আর সেগুলোর সমাধান করতে গিয়ে দেরি হয়েছে।ফ্রেশ হয়ে আসতে দেখলেন হাফসা খাবার বেড়ে দিচ্ছে।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত রাত হয়েছে।ঘুমোন নি?’
‘ঘুম আসছিলো না আপনার জন্য টেনশন হচ্ছিলো খুব।’
‘আপনি খেয়েছেন?সবাই খেয়েছে।’
‘হুম।’
‘আচ্ছা।এখন গিয়ে ঘুমান।আমি নিজে খেয়ে নিতে পারবো।’
‘এদিকে কোথায় যান?’
‘আম্মুর সাথে ঘুমাবো।’
‘কেন?’
‘ইচ্ছে করছে।’
******
খাবার শেষে রুমে যেতে দেখলেন, আদওয়া একপাশ হয়ে শুয়ে আছে।
দরজায় কারো আওয়াজ পেয়ে উঠে লাইট অন করলো আদওয়া।আরহামকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,’আজকে আপনার কার সাথে ঘুমাতে মন চাচ্ছে?’
আরহাম দরজা লক করতে করতে বললেন, ‘এক ফুলটুসির সাথে।আমার ওপর অনেক রাগ তাঁর।গাল ফুলিয়ে ফুলিয়ে কথা বলে।’