প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | অপমান ও রাতের গান
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ৩১
ইমা আপুর রুমে আমাকে থাকতে দিয়েছেন আমি বেলকুনিতে বসে ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে যাচ্ছি।খাবার টেবিলে জানতে পারে আব্বু আম্মু এসে ছিল কিন্তু চাচাজান তাদের কে অপমান করে বের করে দিছে। এসব শুনে আর আমি খাবার গিলতে পারিনি। খাবার না খেয়েই চলে এসেছি আর নিচে যায় নি। সবাই হয়তো সন্দেহ করেছে আমার এমন রিয়েক্টে কিন্তু আমি তা পাত্তা দেয়নি। আমার খুব কষ্ট হয়েছে। আব্বু আম্মু আবার ও কষ্ট পেলো আর আমি সেখানে উপস্থিত ই ছিলাম না। যারা আমার আব্বুকে সহ্যই করতে পারেনা আমি সেই বাড়িতে খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি। এসব ভেবে খাওয়ার ইচ্ছা টা আরো মরে গেছে।
জেরিন কে আসতে দেখে চোখ মুছে স্বাভাবিক করলাম নিজেকে। জেরিন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
‘না খেয়ে ওমন করে চলে আসলে কেন?’
আমি বললাম, ‘ টায়ার্ড লাগছিল খুব। খেতে ভালো লাগছিলো না।’
‘ তোমার নাক মুখ লাল হয়ে আছে যেন কান্না করেছো?’
‘ মাথা ধরেছে তাই এমন লাগছে।’
‘ ওহ আমার আগের বিহেভিয়ার জন্য সরি। আমরা কি ফ্রেন্ড হতে পারি?’
‘ অবশ্যই!’
মুখে হাসি টেনে বললাম। জেরিন গল্প করলো কিছু সময়। ওর মা ডাকতেই ছুটে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এর আবার কি হলো এত ভালো বিহেভ করল আমার সাথে।
কিন্তু মন খারাপ কিছুটা কমেছে। আমি রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পরলাম। মনটা আবার খারাপ লাগছে আমি ওইভাবে চলে আসলাম আর ইহান একবার আমার খোঁজ নিলোনা। একটু আমার জন্য চিন্তা করে না। এই উনার ভালোবাসা।
চোখ ভিজে উঠলো আবার। আমি উঠে দাঁড়ালাম। অনেকেই আগেই শুয়ে পরেছে কিন্তু কয়েকজন ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। জেরিন আছে সেখানেই। আমি উঁকি মেরে ইহানকে খুঁজলাম নাই। আমি তার রুমের দিকে যাওয়া ধরালাম চোরের মত কেউ আবার দেখে নেবে না তো? কাছাকাছি আসতেই সেদিনের অপমানের কথা মনে পরলো। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আজ নিশ্চয়ই বকবে না। আজ আর সেদিন তো আলাদা ছিলো। আমি খুশিমনে ভেতরে চলে গেলাম।
সম্পন্ন রুম ঘুরেও তাকে খুঁজে পেলাম না। তার মানে তিনি রুমে নাই। গেছেন কোথায়? মন খারাপ করে ছোট টেবিলের উপর ইহানের ছবির দিকে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইলাম।কোথায় আমার কাছে আসবে আমার মন ভালো করার চেষ্টা করবে তা না আমি তাকে উল্টা খুজছি আর তিনি লাপাত্তা হয়ে আছেন। অভিমানী চোখে তাকে কিছুক্ষণ অভিযোগ করে উঠে দাড়াতেই,
জেরিনের আগমন ঘটলো, জেরিন ইহান ব্রো বলে ডাকতে ডাকতে এ ঘরে আসছে। আমি লাফিয়ে উঠে এদিকে ওদিকে তাকিচ্ছি কোথায় যাব জেরিন যদি আমাকে দেখে সন্দেহ করে। আমি এঘরে কি করছি? দৌড়ে আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পরলাম। জেরিন খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় চলে গেল আমি দেখছি লুকিয়ে মাথা বের করে। জেনিন ভেতরে আসতে আবার লুকিয়ে পারলাম। জেরিন বেরিয়ে গেল ডাকতে ডাকতেই। আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারাতাড়ি বেরিয়ে এলাম। তখনই দেখা হলো ইলা আপুর সাথে। ফোন হাতে এগিয়ে আসছে। আমাকে ইহানের রুম থেকে বের হতে তিনি দেখে নিয়েছেন মাথা তুলে। আমি এক পলক দেখে ইমা আপুর কথা ভেবে ফেলেছিলাম কিন্তু ইমা আপু তো শ্বশুর বাড়ি ভাবতেই মনে পড়লেই এটা ইলা আপু। উনি প্রশ্ন তোক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল,
আমি ইহানের রুমের দরজার সামনে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের তালু চুলকাচ্ছে। উনি কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি কি উত্তর দেবো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। ভয়ে আমার বুক ধুকপুক করছে। ইলা আপু গলা উঁচিয়ে রুমের ভেতরে তাকিয়ে বলল ইহানকে রুমে আছে?
আমি তোতলানো গলায় বললাম, ‘না আপু!’
‘ ইহানকে দেখলে আমার সাথে দেখা করতে বলো।’
বলেই আমাকে ক্রস করে চলে গেল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি।এমনভাবে আমাকে কথাটা বলল যেন ইহানের সাথে আমি সব সময় থাকি তাই খবর পৌছানোর দায়িত্বটা আমার। কিন্তু উনি এই দায়িত্ব আমাকে কেন দিলো?
ভাবতে ভাবতে তাঁরাতারি চলে এলাম।
ইহানের দেখা মিলিছে রাত সাড়ে দশটায়। আমি তখন বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম।
ইহান কোথা থেকে এলো জানিনা।এসেই আমাকে টেনে নিজের রুমে নিয়ে এলো। আর আমাকে এক প্লেট খাবার দিলো খাওয়ার জন্য।
‘ দুঘন্টা পর আসছে দরদ দেখাতে। লাগবে না এমন আদিখ্যেতা।’
ইহান জ্যাকেট খুলে আমার সামনেই শার্ট খুলে ফেলল আমি তা দেখে চিত্কার করে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে ইহান বিরক্তকর চাহনি দিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার মেন্টালের মত চিৎকার করলে কেন? তুমি যে আমার রুমে আছো তা সারা দুনিয়াকে না জানালে তোমার চলছে না?’
আমি তারাতাড়ি মুখ চেপে বললাম, ‘ আপনি নির্লজ্জের মত আমার সামনে শার্ট খুললেন কেন? লজ্জা করল না একটা মেয়ের সামনে শার্ট খুলতে!’
‘আশ্চার্য! শার্ট খুলেছি তো কি হয়েছে? আমি কি তোমার সামনে খালি গায়ে বসে থাকব নাকি। আমি চেঞ্জ করছি দেখো না ঘেমে একাকার হয়ে গেছি। আর নির্লজ্জের কি হলো এখানে আমি কি প্যান্ট খুলেছি যে তুমি এমন করে চিৎকার করলে অদ্ভুত।’
ইহান ওয়াশরুমে চলে গেল টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে। হাত মুখ ধুয়ে আমার অপর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর আমার দিকে তাকিয়ে বলল খাবারটা খেয়ে প্লেট টেবিলের উপর রেখে চলে যেতে দরজা চাপিয়ে।
আমি বললাম, ‘ আপনি কোথায় গিয়েছিলেন সত্যি করে বলুন।’
‘শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলাম হ্যাপি এবার খাবারটা শেষ করো!’
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কিহ! শশুর বাড়ি গিয়েছিলেন মানে। আপনি বিয়ে করলেন কবে?’
‘ এতো কথা বলো কেন দেখছো না আমি ক্লান্ত তাও আমাকে ডিস্টার্ব না করলে তোমার শান্তি হচ্ছে না তাই না!’
‘ আপনি উত্তর দিচ্ছেন না কেন উত্তরটা দিলে তো আথ আমি জিজ্ঞেস করি না।’
‘খাবার শেষ করা ততক্ষণ আমি জিরিয়ে নেই তারপরে সব বলবো!’
আমি তারাতাড়ি খাওয়া শেষ করলাম।
‘ খাওয়া শেষ এবার বলুন সব।’
ইহানের কোন রেসপন্স পেলাম না। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম মনে হচ্ছে গভীর ঘুম। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। ঘুমন্ত অবস্থায় অন্য রকম লাগছে আমি আলতো হাত বাড়িয়ে ইহানের নাক চেপে ধরলাম। সাথে সাথে ইহান ধরফরিয়ে উঠে বসলো। আর আমার দিকে রাগী চোখে তাকালো। আমি মুখ টিপে হাসছে।
‘ আর ইউ ম্যাড। তুমি আমার নাক চেপে ধরেছে কেন ইডিয়েট।’
‘ বেশ করেছি। এবার বলুন কোথায় গেছিলেন।’
‘ বললাম তো শশুর বাড়ি।’
‘ আবার মিথ্যা বলছেন সত্যি বলেন’
‘চাচুর সাথে দেখা করতে। আমি তাকে কায়দা করে আনলাম কিন্তু সঠিক সময় তার পাশে থাকতে পারলাম না। এবারও তিনি অপমানিত হয়ে গেছেন নিজেকে খুব অপরাধী লাগছিল তাই আমি গেছিলাম সেখানে আর চাচুর সাথে কিছুটা সময় কাটালাম।
আমি আর কিছু বললাম না। ইহান আমার দিকে তাকিয়ে বললো,’ তোমার মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বাবা চাচুকে মেনে নেবে আর বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে।’
আমি বললাম, ‘ সত্যি?’
” হুম!’
‘তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল! চাচাজান আব্বু কে নিয়ে কতোটা খারাপ মন্তব্য করেছিল। আমি খাবার টেবিলে আর এক সেকেন্ড থাকলে কেঁদে দিতাম!’
ইহান আমার হাত আলতো করে ধরে বললো, ‘ গান শুনবে?’
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘ হুম। শুনাবেন?’
ইহান হাসলো কিছু বললো না। গিটার হাতে বেলকনিতে যেতে লাগলো। আমিও পেছনে গেলাম। ইহান বসে আমাকেও বসতে বললো। আমিও বসে পড়লাম।
ইহান গান ধরলো,
তোমার এলোমেলো চুলে আমার সাদা মনে,
হারিয়ে যেতে চাই কোন হুটতলা রিকশায়,
এক মুঠো প্রেমে নিয়ে আমার শূন্য পকেটে হারাতে দ্বিধা নাই অচেনা গলিতে, এক শহর ভালবাসা দিতে চাই….
গান শুনতে শুনতে আমি ইহানের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরছি। ইহান তা দেখে গান থামিয়ে চাঁদের আলোয় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, ”খুব ভালোবাসি ঊষারানী”
