প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | বিদেশ যাত্রার সংবাদ
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ৩৮
দুইদিন পর শুভ্র কে দেখলাম হাতে ভাঙা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। আমি তাকে দেখে এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। শুভ্র আমার দিকে তাকালো ও না কথা ও বলল না। আমি তাতে অবাক হলাম। কলেজে চলে এলাম। সেইদিন ইহানকে ফোনে বললাম,
‘ শুভ্র আজ আমার সাথে কথা বলেনি এমন কি তাকায় ও নি।’
আমার কথা শুনে ইহান বললো, ‘ যে টাইট দিয়েছি তার পর আর ওর পক্ষে তোমার দিকে তাকানোর সাহস করবে না!’
‘ উনাকে আপনি মেরেছেন। ‘
‘ সব কিছু এতো তোমাকে জানতে হবে না।’
‘ আপনি আসবেন?’
‘ কেন?’
‘ এমনি কতোদিন দেখি না। আসেন না।’
” আমার সময় নাই এখন।’
‘ ওহ্।’ মন খারাপ করে বললাম।
.
ইহানের রেজাল্ট দিলো। ইহান টপ হয়েছে। ইহান যে এতো ভালো স্টুডেন্ট আমার ধারনার বাইরে ছিল। আমি তো হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছিল আমাদের বাসায় ইহান। আব্বু আম্মু ও খুব খুশি ইহানের জন্য। আমার এতো গর্ব হচ্ছিল কা বলবো। আমি নিজে হাতে ইহানকে মিষ্টি খাইয়েছি। ইহান ও। শুভ্র আর আমাকে জ্বালাতন করে না। তাই ওর ব্যাপারটা একদম ভুলে গেছি। আগের মতোই আমাদের প্রেম চলছে। কথা বলা হুটহাট দেখা করা ঘুরতে যাওয়া।
দাদুকে এক সপ্তাহ পর নিয়ে গেছে আব্বু।নিজে দিয়ে এসেছে। চাচা কথা না বললেও খারাপ ব্যবহার করে না।
ইহানের রেজাল্টের তিনদিন পর ইহান মাস্টার্স করতে অস্ট্রেলিয়া যাবে। দুই বছরের জন্য । আমি খবর শুনে থমকে গেছি। ইহান আমাকে রেখে চলে যাবে! এটা আমি মানতে পারছি না। খুব কষ্টে নিজেকে সবার সামনে কন্ট্রোল করছি। ভেতরে ভেতরে আমি কষ্টে আছি।
ইহান চলে যাওয়ার আগে একটা পার্টির আয়োজন করেছে। চাচা জানের বিজনেস আব্বুর বিজনেসের সাথে যুক্ত করেছে যার জন্য উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে আছে। চাচা জান বোধহয় এই জন্য ই ভাইকে আর কিছু বলতে পারে না। কিন্তু আব্বু নিজের ভাইকে সাহায্য করার জন্য নিজের ক্ষমা চায়নি। এটা তিনি নিজের দায়িত্ব ভেবে পালন করেছে। চাচা জান দ্বিমত পোষণ করে নি।
দুইদিন আগেই আমরা ওই বাসায় চলে গেলাম। সবাই আমাদের নিতে এসেছিল। শুধু চাচা জান বাদে। সবাইকে উপেক্ষা করেননি আববু। দাদুকে কথা দিয়েছে আর কারো সাথে অভিমান করে বাড়ি যাওয়া অফ করবেন না। তাই আমরা সবাই দুইদিন আগেই চলে এলাম।
ইমা আপু ও এবাসায় ই। আব্বুর রুমে গোছানো সেখানেই তারা থাকবে আমার জন্য রুম প্রয়োজন আমাকে ইলা আপুর সাথে থাকার কথা বলল।
আমি খালি ইহানকে একা পাওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছি। আর লুকিয়ে চুরিয়ে চোখের পানি ছাড়ছি।
অবশেষে জানতে পারলাম ইহান কোন রুমে আছে। সে ছাদের চিলেকোঠায় আছেন। আমি তাই সবার চোখের আড়ালে ছাদের সেই রুমে যেতে লাগলাম। সাথে সাথে পেছনে থেকে একটা হাত আমার হাত চেপে ধরে টেনে আনলো দরজার সামনে থেকে। আমি চমকে উঠলাম। দেখি ইহান।
ইহান কে দেখে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না। কেঁদে উঠলাম। ইহান আমার দুগালে হাত রেখে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
‘ হোয়াট হ্যাপেন্ড। এমন মরা কান্না শুরু করছো কেন?’
‘ আমি মরা কান্না শুরু করেছি এটা বলতে পারলেন?’
ইহান নিশ্চুপ।
আমি আবার বললাম, ‘ আপনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন। একটু ও কষ্ট হবে না আপনার। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না আবার প্রমাণ করলেন।’
‘ ফালতু কথা বাদ দিবে! আমি তোমাকে ভালোবাসি না এই ফালতু কথাটা কিছু হলেই কেন তোমার মাথায় আসে? ‘
‘ আসার যথেষ্ট কারণ আছে। আপনি আমাকে ভালোবাসলে এভাবে ছেড়ে যাওয়ার কাজ করতে পারতেন। বিদেশে গিয়ে পরতে হবে কেন দেখে কা লেখাপড়া নাই নাকি।’
‘ দূরে গেলেই কি আমি তোমায় ভুলে যাব নাকি। তুমি তো সব সময় আমার এই অন্তরে থাকবে। আর দুই বছর খুব দ্রুত চলে যাবে। আমার ইচ্ছা ছিল বিদেশে গিয়ে কিন্তু অনার্সের আগেই আমি যেতে পারিনি। এখন নিজের স্বপ্ন টা পূরণ করতে তুমি আমার পাশে থাকবে না বলো। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ফিরে এসেই আমার এই বাচ্চা বউকে মিসেস ইহান করে ফেলব।’
‘ আমার খুব কষ্ট হবে। খুব বেশি মিস করবো। আপনাকে একদিন না দেখলেই আমি পাগল হয়ে যায়। আর দুই বছর না দেখে আমি কি করে থাকবো। আপনিই বা থাকবেন কি করে বলুন কষ্ট হবে না।’
‘ হবে কিন্তু মানিয়ে নিবো। তোমার কাছে থাকলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না ঊষা। খালি আজেবাজে চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। যা তোমার জন্য বিপদজনক। আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না বলেই বিদেশে যাওয়ার কথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম চাচু এখনি তোমার বিয়ে দিবে না কম পক্ষে দুই বছর পর এই দুই বছর না হয় দূরে থাকি। কাছে থাকলে কবে জানি জোর করে ধরে বিয়ে করে ফেলবো। আমার এই বাচ্চা বউকে ছেড়ে থাকা যে আমার জন্য কষ্টকর খুব। দূরে গেলে আমাদের ভালোবাসা আরো গাঢ় হবে।
আর দেখা না হওয়া বলছো সেটা তো প্রতিদিনই হবে। ভিডিও কল আছে না। সেখানে দেখবে আমাকে আমি দেখবো আমার এই বাচ্চা বউকে। দুজনে দুই প্রান্তে অপেক্ষা করবো দুজনের জন্য। আর একদিন হুট করেই সামনে এসে দাড়িয়ে আমার এই বাচ্চা বউকে চমকে দেবো। আর তুমি রাগ করছ আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরবে কাঁদতে কাঁদতে।’
ইহান আমাকে অনেক ভাবেই বুঝানোর চেষ্টা করছে এই দূরে যাওয়াটা নাকি আমাদের জন্য ভালো হবে। ভালোবাসা বাড়বে। আমি মানছি না। ইহান আমার কপালে একটা গভীর ভাবে ভালোবাসার পরশ দিল। আর এই সব কিছু একজন মানুষ দেখে নিল সে আর কেউ না আমার মা জননী। যা আমরা কেউ জানতে পারলাম না। আমি তখন ইহানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছি। আর ইহান আমার মাথায় হাত বুলিয়ে এটা ওটা বুঝাচ্ছে।
পরদিন বড় করে আয়োজন করা হলো পার্টির। বিজনেসের লোকজনের সমাগম বেশি। একা একটা বিজনেস পার্টিই।আববু ও চাচাজানের বিজনেস এক করার জন্য। আমি খুব একটা সাজলাম না। শুধু ব্লো কলারের গাউন পরেছিলাম। পুরোটা সময় আমি গাল ফুলিয়ে ছিলাম। আজকেই দিনটাই আছেন ইহান কাল চলে যাবে ভাবলেই আমার কান্না পায়। ইমা আপু আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু আমার কেন জান মনে হচ্ছে ইহান আমার থেকে দূরে গেলেই হারিয়ে যাবে। আমি এক কোনে চুপ করে বসে ছিলাম ইহান এসে পাশে দাঁড়ালো। আমি এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম।
‘ এখনো মন খারাপ করে আছো।’
‘ আমি জানি আপনি আমাকে ভুলে যাবেন। বিদেশে কতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে তাদের দেখে আমাকে ভুলে যাবেন। এমন না হয় আবার সুন্দরীর একজন কে বিয়ে করে আমার ভাবি করে এনে বলবেন,
‘ ঊষা এটা তোমার ভাবি। দেখো সুন্দর না। কতো ফর্সা স্মার্ট। তুমি আমার বোনই ঠিক আছো। বউ হওয়ার যোগ্য না।’
ইহান রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘ এক থাপ্পর দিয়ে গাল লাল করে ফেলবো ইডিয়েট। এমন উদ্ভট কথা যেন আর না শুনি।’
‘ আপনার সাথে ওই ফারিয়া ও বলে যাবে।’
‘ হ্যা।’
‘ আপনি আমাকে আগে কেন বললেন না। আপনার আর ফারিয়ার মধ্যে কিছু চলছে বলুন তো। আমাকে রেখে দুজন দূরে গিয়ে প্রেম করার ধান্দায় আছেন নাকি!’
‘ তোমাকে আগেও বলছি ফারিয়া জাস্ট মাই ফ্রেন্ডস। এর বাইরে আর কোন সম্পর্ক নাই আর হবে ও না কোনদিন। তাই এসব কথা বলে আমার মেজাজ টা খারাপ করো না। আর একটা দিন আছি তাই সময় গুলো ইমপর্টেন্ট করো। রাগারাগী বাজে বলা অফ করে সুন্দর কিছু মুহূর্ত বানাও। ‘
‘আমার ভয় তো যাচ্ছে না। আপনাকে হারানোর ভয়ে আমি ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছি।’
‘ আমার কথা তুমি বিশ্বাস করছো না কেন! তারমানে কি তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না? তাহলে তো আমি বলবো তুমি আমাকে ভালোই বাসো না। কারণ যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে ভালোবাসা থাকতে পারে না।’
